ফনেটিক ইউনিজয়
যাত্রীদের জন্যও চাই আদব-কেতার তালিম

বিচিত্র অভিজ্ঞতার জায়গা হলো গণপরিবহন। কী হয় না এতে? ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় গণপরিবহনে নিত্য প্রাণ সঁপে নির্দ্বিধায় উঠছে যাত্রীসাধারণ। গাড়ির টায়ার বসে যাচ্ছে, গ্যাস-তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে, হেডলাইট জ্বলছে না, ব্রেক কাজ করছে নাÑযাত্রাপথে গাড়ি দাঁড় করিয়ে গাড়ি মেরামত করা হচ্ছে। যাত্রীরা ইতস্তত ঘুরছেন বিষণœ মুখে। ঘামে-গরমে চিন্তায় অতিষ্ট। কার কাছে অভিযোগ জানাবেন?
গাড়ির ভেতরেও একই অবস্থা। সিটগুলো এত ঘন করে বসানো হয়েছে যে স্বাভাবিক উচ্চতার মানুষ পা সোজা করে বসতে পারেন না। সিটের অবস্থা খারাপ। প্রায়ই খোঁচা খেতে হয় লুকানো পেরেকের। লাইট জ্বলে না। ফ্যান চলে না। জানালার কাচ সরানো যায় না। অনির্ধারিত স্টপেজে থামা, বেশি ভাড়া আদায় করা, দুর্ব্যবহার ইত্যাদি কী পাওয়া যায় না? গাদা গাদা যাত্রী, বেশি ভাড়া আদায়, ইচ্ছেমতো যাত্রী ওঠানো-নামানো সবই পাওয়া যায় গণপরিবহনে।
যাত্রীরাও কম যান না। সিটে পা তুলে বসা, দুই পা চিতিয়ে বসা, পাশের যাত্রীর পিঠে হাত তুলে দেওয়া, অহেতুক চাপাচাপি করা, চেঁচিয়ে ফোন রিসিভ করা, শিথিলভাবে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে ব্রেক কষলেই অন্য যাত্রীর গায়ে গিয়ে পড়া, ভিড়ের মধ্যে মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়া, অশোভনভাবে মেয়েদের গা ঘেঁষে দাঁড়ানো ইত্যাদি। মেয়েদের নির্ধারিত সিটে বসে থাকা, ভিড়ের মধ্যে মেয়েদের বাসে ওঠা নিয়ে অশোভন মন্তব্য-এসবও নিত্যদিন শোনা যায়। আর ভারত-বাংলাদেশের গাড়িচালকেরা চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণের মতো অপরাধে যুক্ত থাকার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে ইতিমধ্যে।
অতএব, এসব গণপরিবহনে ‘আদব-কেতা’র প্রশ্ন তোলা বাতুলতারই নামান্তর মর্মে ঠেকতে পারে। কিন্তু তা তো ঠিক হবে না। গণপরিবহন, এর যাত্রী আর চালকেরা কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। তাই আদব-কেতা তাঁদের সবার জন্যই প্রযোজ্য। কিছু আচরণ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে অবশ্য লাঠ্যৌষধি (লাঠি প্রয়োগ বা শাস্তিদান) আবশ্যক হয়ে পড়ে। যেমন পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধকরণের আইন বাংলাদেশে বলবৎ থাকলেও অনেক গাড়িচালক (গাড়ির মালিকও) গাড়িতে বসেই ধূমপান করেন। মোবাইল কোর্টের আওতায় এ ক্ষেত্রে শাস্তিদান অপরিহার্য। চলন্ত গাড়ি থেকে যাত্রী নামানোর সময় অসতর্কতা, প্রলম্বিত সময় বিভিন্ন স্টপেজে বা স্টপেজ-বিহীন স্থানে যাত্রীর আশায় অপেক্ষা করা, যাত্রীদের নিরাপত্তা শঙ্কায় রেখে গাড়ি চালানো, অবৈধ বা অনিয়মিত পার্কিং এসব বিষয়ে শৃঙ্খলা আনয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
স্পেনে কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি নির্দেশনা জারি করেছে যে, কোনো যাত্রী সিটে এমনভাবে পা ছড়িয়ে বসতে পারবেন না যেন অন্য যাত্রীর স্থান সংকুচিত হয়। আমাদের দেশে গণপরিবহনে এটি হরহামেশা দেখা যায়। সহযাত্রী নারী হলে তো কথাই নেই। তার শরীরের স্পর্শ নেওয়া, পিঠের পেছনে সিটের ওপর হাত তুলে দেওয়া, পকেট থেকে কিছু বের করা বা পকেটে কিছু ঢোকানোর অছিলায় সহযাত্রীর শরীরে ঘষাঘষি করা এগুলো নিত্যকার অভিযোগ। এ ছাড়া উদ্দেশ্যমূলকভাবে নারীর শরীরের বিভিন্ন স্থান স্পর্শের কসরত তো আছেই। এগুলোর জন্য যাত্রী, চালকদের যেমন আইনের আওতায় আনা দরকার, তেমনি ট্রাফিক পুলিশেরও দায়িত্বভার বুঝে নেওয়ার দরকার রয়েছে।
আমাদের একটি বিশদ মোটরযান আইন রচিত রয়েছে অনেক আগে। অবশ্য তখন এই আইন প্রণয়নের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল ভিন্ন। মূলত গাড়ির মালিক ও চালক, সহকারীরা যেন আইন ভঙ্গ না করেন, সে উদ্দেশ্যেই আইনটি প্রণীত হয়। কয়েক বছর আগে এতে সংশোধনীও আনা হয়েছে। কিন্তু আইনটি সময়ের অনুবর্তী বলা যায় না। গাড়ির যাত্রীদের আচার-আচরণ, যাত্রী-চালক বা সহকারী পারস্পরিক আচরণ এসব বিষয়ও আইনের অন্তর্ভুক্তির দাবি রাখে। ঢাকা মহানগরীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো যানজটের শহরের খেতাব লাভের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এই অবস্থায় রাস্তার ছোটখাটো অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য মোবাইল কোর্টকে দায়িত্ব অর্পণের বিষয়টি ভাবা যেতে পারে।
সেদিন পরিচিত একজন মোটর গাড়ির মালিক অনুযোগ করে বলেন, ঢাকায় মোড় ঘোরার সময় বড় একটি বাস তাঁর গাড়িতে ধাক্কা দেয়। গাড়ির একাংশ চ্যাপ্টা হয়ে যায়। তিনি গাড়ি থামিয়ে দৌড়ে বাসে উঠলেন আর গাড়ির ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বললেন। গাড়িচালক ও সহকারী কিছুটা বাদানুবাদ করেও বিষয়টির সুরাহায় আগ্রহের কথা জানালেন। কিন্তু বাদ সাধলেন কয়েকজন যুবক যাত্রী। তাঁরা বাসচালককে বাস চালিয়ে যেতে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়ে গাড়ির মালিককে বাস থেকে জোর করে নামতে বাধ্য করলেন। যুবকদের ভাষায়, মোটর গাড়িতে চড়ে আরাম করলে এক-আধটু কিল-গুঁতো খেতেই হবে। এ তো রীতিমতো অসভ্যতা। এসব যুবককে আইন হাতে তুলে নেওয়ার জন্য তাৎক্ষণিক দ-দানের ব্যবস্থা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সম্ভব হতে পারে। আমরা প্রতিশ্রুতিশীল সুশৃঙ্খল যৌবন চাই। অন্যায় কাজের সহযোগী  পেশাশক্তির যুবা আমাদের কাম্য নয়। তাদের এ আচরণের পেছনে রয়েছে শহরে সামাজিক শৃঙ্খলহীনতার প্রভাব। উন্নত দেশে এগুলো আইন দিয়ে কঠোর হাতে দমন করা হয়। না হলে এ ধরনের ক্রিমিনাল গ্যাং বড় অপরাধও বাসে বসেই ঘটাতে পারে। অর্থাৎ যাত্রীদের জন্যও চাই আদব-কেতার তালিম। এটি ভঙ্গ করলে তিনিও শাস্তির মুখোমুখি হবেন, এটি স্পষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে।

Disconnect