ফনেটিক ইউনিজয়
শহুরে মনের ক্ষুধার নিদান

ঢাকায় আছি আজ প্রায় সাতাশ বছর হয়ে গেছে। ১৯৯১ সালের ঢাকার সঙ্গে এখনকার ঢাকার তফাত কতটুকু, সেটা যাঁরা সেই সময়ে কি তারও আগে থেকে বসবাস করে আসছেন, তাঁরা জানেন। আমার চেয়ে বয়সে বড়, বলতে কি একেবারে ছোটবেলা থেকে, সেই ষাটের দশক থেকে যাঁরা ঢাকায় আছেন, তেমন একজনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ঢাকা আপনার চোখে কতটুকু বদলে গেছে। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, প্রথম যেটা বদল সেটা হলো ঢাকার স্কাইলাইন বদলে গেছে। মানে আকাশরেখা। তার ওপর আগে ঢাকায় অনেক জলা, পুকুর খাল ছিল, সেসব হারিয়ে গেছে। নদী ভরাট হয়েছে নানান দিকে। রাস্তাঘাট আগের চেয়ে উন্নত হলেও যানজট অস্বাভাবিক রকমের বেড়েছে। ফলে এত রাস্তা বেড়েও রাস্তা রাস্তার কাজ করছে না। আরও আরও বদল আছে। দোকানপাট, খাবারের জায়গার বিচিত্র বিন্যাস, নিয়ন সাইনের ঝলমলে অনেক পথ। আগের সেই নিরিবিলি ভাবটা স্রেফ গায়েব হয়ে গেছে।
আমি নিজে বড় হয়েছি চট্টগ্রামে। মানে শৈশব-কৈশোরের শুরুটা কেটেছে সেখানে। ঢাকায় আসতাম নানা বাড়ি-দাদা বাড়িতে বেড়াতে। এলেই যেটা চোখে পড়ত বা যেটা খুঁজতাম, সেটা হলো, কোথায় কোথায় সিনেমা হল আছে। সিনেমা হলের প্রতি সেই ছোটবেলা থেকে কেমন একটা নিষিদ্ধ ও রোমাঞ্চকর টান ছিল। এখনো আছে। কিন্তু সিনেমা হল দুমদাম গায়েব হয়ে গেছে। অমন জমজমাট গুলিস্তান সিনেমা হল, বিলকুল গায়েব। হারিয়ে গেছে মল্লিকা। শ্যামলী সিনেমা হল হারিয়ে যেতে যেতে যায়নি। তার বদলে আধুনিক বিন্যাস পেয়েছে। তৈরি হওয়ার মধ্যে আছে পান্থপথে বসুন্ধরা সিটির সিনেপ্লেক্স আর সেই যমুন ফিউচার পার্কের নতুন অত্যাধুনিক কায়দার সিনেমা হল। লোকে বলে, ক্যাবল লাইনে, কম্পিউটারে ছবি দেখে। তার জন্য সিনেমা হলে যাওয়ার কী দরকার!
সিনেমার প্রতি টান কেন এত জানি না। তবে দেখেছি, গণমানুষের বিনোদনের উৎস বলতে দুটো- একটা হলো টেলিভিশন, অন্যটা সিনেমা। দুটোর সঙ্গেই আছে গান। এখন এফএম রেডিওর বদৌলতে সেই গান শোনার সুযোগ বেড়েছে। মোবাইলে নানা ডিভাইস সেটাকে আরও সহজ করেছে। এসবই হলো মানুষের মনে মনে ভালো থাকার, আনন্দে থাকার উপায়।
মানুষ জীবনে কী চায়? সে চায় স্বস্তির সঙ্গে বাঁচতে, যাকে বলে ‘পিজেন্টনেস’। খুব শুনতাম একসময় যে, সুখের চেয়ে শান্তি বড়। এখন মনে হয়, শান্তির চেয়ে স্বস্তি বড়। একজন মানুষ আমেরিকা বা সুইডেন যায়, সে দেশের প্রেমে পড়ে নয়, সেখানে গেলে সে বেঁচে থাকাটাকে স্বস্তিপূর্ণ করতে পারবে বলেই। সন্তানের শিক্ষা, নিজের নিরাপত্তা, গ্যাস পানি বিদ্যুৎ এবং সব রকমের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য বেছে নেন অভিবাসন। অনেক কিছু পান, কেবল একটি জিনিস হারানোর বিনিময়ে। সেটি হলো তার সাংস্কৃতিক জীবন। সেটি হলো নিজের ভাষা, শিল্প-সাহিত্য এবং এর ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ওই গান, নাটক এবং সিনেমার মতো নিজস্ব জীবনের সাংস্কৃতিক উৎস ও উৎসারগুলো থেকে দূরত্ব তৈরি হয় তাদের। বলা হয়, যার ভাষা হারিয়ে যায়, তার সব হারিয়ে যায়। আরও বড় ব্যাপার হলো, যে নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলে, সে কোনোভাবেই অন্য সংস্কৃতির সঙ্গেও যোগ দিতে পারে না। কারণ সাংস্কৃতিক বিনিময় ছাড়া কোনো উন্নত জীবনের কথা ভাবা যায় না।
এ কথা স্পষ্ট করে মনে রাখতে হবে, সংস্কৃতি বিভেদের চামুণ্ডা নয়, বরং ঐক্যের বাহন। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের মতো মানুষ সেই ১৯৫১ সালে কথাটা ধরিয়ে দিয়েছিলেন। চট্টগ্রামের হরিখোলা মাঠে অনুষ্ঠিত সাহিত্য ও সংস্কৃতি-সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে তিনি বলেছিলেন এ কথা : ‘সাম্প্রদায়িকতা মহামারি বীজের মতো শত গ্রাম মানুষদের নীড় ধ্বংস করিয়াছে। তাই এই জাতীয় দুর্দ্দিনে বিভেদ আছে সত্যÑএই বিভেদকে জয় করাই সংস্কৃতির কাজ। সংস্কৃতি ঐক্যের বাহন-বিভেদের চামুণ্ডা নয়।’ (আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের অভিভাষণ সমগ্র, প্রথম প্রকাশ আষাঢ় ১৪১৭/ জুন ২০১০, সংকলন ও সম্পাদনা: ইসরাইল খান, বাংলা একাডেমি ঢাকা, পৃ. ১৩৩) সংস্কৃতির ভেতরেই ‘মিলবে’, ‘মেলাবে’র সূত্রগুলো পোরা আছে। কিন্তু সংস্কৃতির সেই ঝুলি আমরা কি আর খুলেছি? সেটাকে বিভেদের চামুণ্ডাই বানিয়ে রেখেছি।
অন্য দেশের ভাষা-সংস্কৃতি কতটুকু জানি? সেটা জানলে এই রোহিঙ্গা সমস্যা দেখা দিত না। বার্মা বা মিয়ানমার সম্পর্কে কতটুকু জানা আমাদের? কী জানি আমরা থাইল্যান্ড লাওস কম্বোডিয়ার সম্পর্কে? ভারত চীন সম্পর্কেও আমাদের কতটুকু জানা? মঙ্গোলিয়া দক্ষিণ কোরিয়া বা সমগ্র কোরিয়া সম্পর্কে? আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কি ডিপার্টমেন্ট অব আমেরিকান, রাশান, ব্রিটিশ, পর্তুগিজ বা ইরানিয়ান স্টাডিজ আছে? এসব থেকে বোঝা যায়, কোনোভাবেই আমরা নাগরিক মানুষ হতে পারিনি। নাগরিক মানুষ মানেই বৈশ্বিক-মানসের মানুষ। তাই না?
আইনস্টাইন বলেছিলেন, জ্ঞানের চেয়ে কল্পনা বড়। জ্ঞান বাড়তে পারে পড়ার ভেতর দিয়ে, কিন্তু কল্পনা কী করে বাড়াতে হয়? এই প্রশ্ন করি কি আমরা? প্রশ্ন করার তো দূরের কথা, জ্ঞান বা কল্পনার মতো ব্যাপারগুলোর যে দরকার আছে জীবনে, তাই-বা কতটুকু বোধকরি। আমাদের জ্ঞান ছিল পুঁথিগত। এখন তাও তো না। এখন হলো প্রশ্নগত বিদ্যা। সিলেবাসের পুরোটুকু নয়, কোন বছর কী কী প্রশ্ন আসবে ঘুরেফিরে, তাই নিয়ে আমাদের জ্ঞান ও পড়ালেখা। সেখানেই ইতি। আর সে জন্য জীবনজুড়ে নেতি নেতি আর নেতি। হেমিংওয়ের গল্প ‘অ্যা ক্লিন, ওয়েল-লাইটেড প্লেস’তে ছিল ‘নাডা নাডা নাডা’, আমাদের নেতি ভাব তেমনটাও নয়। তিন পৃষ্ঠার মতো সেই গল্পে এক ভয়ংকর শূন্যতার দোলা এসে বুকে ঘাঁই দেয়। ভিন্ন ভাষার, ভিন্ন সংস্কৃতির সেই গল্প পড়ে আমরা তো এখানকার জীবনকেও দেখতে পাই ভিন্ন দিক থেকে যা ওপরে দেখতে নাগরিক, আদতে গ্রাম্য-এই শহুরে মানুষদের কেবল শিশ্নোদরপরায়ণ জীবন ছাড়া আর কোনো সংস্কৃতির দরকার নেই।
ঢাকার কেন্দ্রে ওই শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি ছাড়া আর কোথাও একটি চিত্তবিনোদন বা মনের ক্ষুধা মেটানোর কোনো জায়গা নেই। উত্তরার দিকে, কি বনানী গুলশান থেকে শুরু করে উত্তরার দিকে একটি ভালো বইয়ের দোকান কি আছে? একটি থিয়েটার হল? সিনেমা হল? বা কোনো সাংস্কৃতিক কেন্দ্র? আছে কেবল সারি সারি খাবারের দোকান, হোটেল ইত্যাদি। অথচ প্রায় কুড়ি লক্ষ মানুষ বাস করে সেখানে। সেদিন কামারপাড়ার একটি ব্যাঙ্কের ম্যানেজার মোহাম্মদ হুমায়ূন কবীর বলছিলেন, টঙ্গীতে অনেক স্কুল-কলেজ হওয়ার জন্য সেখানে কিছু বইপত্রের দোকান তৈরি হয়েছে। কিছুদিন আগে পুরোনো বইয়ের প্রায় শ খানেক দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে নতুন একটা রাস্তা করার জন্য। দোকানগুলো তুলে দেওয়ায় তিনি বেদনাবোধ করেছেন। কিন্তু এমন বেদনাবোধ কজন করেন?
কল্পনা ছাড়া মানুষের জীবন একটা ছারপোকার জীবন-এমন করে কথাটা বললে, কেউ কেউ আঁতকে উঠবেন! কারও কারও কথাটা মাথার ওপর দিয়ে যাবে। এ লেখার শুরুতে বলেছি, প্রবাসী অভিবাসী মানুষের সংস্কৃতি হারানোর বেদনার কথা। তারা সেই হারিয়ে যাওয়াটা রোধ করতে ব্যবস্থা যে নিয়েছেন, সেটা কথা বলিনি। ছোট ছোট পরিসরে তারা চর্চা করেন বাঙালির সংস্কৃতিক অনুষঙ্গগুলো। দেশ থেকে প্রায়ই আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণে সারা বিশ্বে যেখানে যেখানে বাঙালি আছে, এ দেশের নামকরা শিল্পী-সাহিত্যিকেরা পরিবেশনা, সেমিনার বইমেলাসহ নানা বাঙালির সাংস্কৃতিক উৎসব-আয়োজনে সেখানে যান। কিন্তু তাতে কতটুকু পূরণ হয় অভিবাসীদের সাংস্কৃতিক ক্ষুধা? কানাডায় থাকা এক প্রবাসীর কাছে শুনেছিলাম, প্রথম প্রথম কোনো লেখক শিল্পীকে খুব সমাদর করেন প্রবাসীরা। কিন্তু ক্রমে সেটা কমতে কমতে শূন্য হয়ে যায়। তার ওপর আছে দলাদলি। মত-পথের নামে, রাজনৈতিক বিশ্বাসের নামে ছিন্নভিন্ন সেখানে প্রায় সব মানুষ।
ফলে বাঙালি সংস্কৃতির দশা, দেশে কি বিদেশে প্রায় সঙিনই বলতে হয়। ফলে ওপর দিকে চকচক করলেও এই ঢাকা শহরের প্রায় সব জায়গাই আদতে ফাঁপা ফোপরা। কোথাও কোনো সংস্কৃতির আলো নেই। তার বদলে আছে নেশা-নৈরাজ্যের নানা বৃত্তবদ্ধ, গোষ্ঠীবদ্ধ চর্চা; সেখানে একসঙ্গে জড়ো হলেও একজনের চেয়ে আরেকজনের মনের দূরত্ব কয়েক আলোকবর্ষ দূরে।
তীব্র প্রতিযোগিতাময় শহুরে জীবনের ভেতরে কোথায় কতটুকু সহযোগিতা কে কে পায়, তার ভেতরে আছে জটিল কুটিল সব হিসাব-নিকাশ। বন্ধুত্বের আলো যতটা জ্বলে, তার বদলে অন্ধকারই বেশি। সুস্থ বন্ধুত্বের বদলে জোড়ায় জোড়ায় দুষ্টচক্র তৈরি করতে বরং ওস্তাদি আছে আমাদের।
অবশ্যই খাওয়া, ঘুম জীবনের প্রধান দুটো ব্যাপার। এ দুটো ছাড়া জীবন চলে না। কিন্তু এটা তো ন্যূনতম আয়োজন। মানুষের পাশবিক, জৈবিক দিকমাত্র। জীবন তো কেবল জৈবিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। এসব প্রয়োজন পার হয়ে জীবন চলে যেতে চায় মহাবিশ্বের মহাজগতের দিকে। সেদিকে যাওয়ার সম্বলও তো থাকা চাই। জীবন এক অভিযাত্রা বা জার্নি বলে যারা মনে করি, তাদের হৃদয়ও ভ্রমণ-হৃদয় নয়। তাই জীবন আমাদের পদ্মপাতার পাশে থাকা ব্যাঙের চেয়ে বেশি কিছু দেয় না। সেটুকু নিয়েই আমাদের দিন কাটে। আর আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতাকেই মনে করি অসীম, এই নিয়ে ভালোমন্দে দিন যাচ্ছে এ শহরে। এই বেশ ভালো আছি! ওই সব সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক চর্চা দিয়ে আমি কী করব? আর যাই হোক, তা দিয়ে তো পেট ভরে না। সেসব নাকি মন ভরে! কিন্তু মনটাই তো হারিয়ে গেছে। ফলে সাংস্কৃতিক ক্ষুধার ব্যাপারটা আসলে কী তাই বোঝার লোক এখন কোটিতে গুটিক। সত্যি, বলিহারি/ চমৎকার আমাদের বেঁচে থাকা!

Disconnect