ফনেটিক ইউনিজয়
শওকত আলীর চলে যাওয়া
হরিপদ দত্ত

হারানো বা ফেলে আসা মাতৃভূমির স্মৃতির ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের (উত্তরবঙ্গ) গ্রামীণ জন ও জনপদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার চেষ্টা ছিল শওকত আলীর। অন্য অনেক অভিবাসী কবি-লেখকের মধ্যে তা দেখা যায় না। তাঁদের আশ্রয়টা ছিল গ্রাম বিচ্ছিন্ন নগর-উপনগরে। সে কারণেই তাঁদের লেখায় বাংলাদেশের পলল মাটি আর মানুষের ভেজা জমিনের গন্ধ নেই কিংবা থাকলেও ভাসা-ভাসা বায়বীয়। শওকত আলীর ‘ঘটি’ থেকে ‘বাঙাল’ হওয়ার চেষ্টার এই যে বাসনা, আজ তাঁর চলে যাওয়ার দিনে সে কথা মনে করে আমাদের মাথা নত হয়ে আসে

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক শওকত আলী। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। তিনি চলে গেলেন। শরীরটা দীর্ঘদিন ধরেই আপন আয়ত্তে ছিল না। চলে যাওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও আমাদের ধরে রাখার অসহায়ত্তের ভেতরেই আচমকা চলে গেলেন। কোথায় জন্ম মাটি, কোথায় বা কবর মাটি! দেশ ভাগের শিকার। মাতৃভূমি-বিচ্ছিন্ন মানুষ। আমার এ লেখা তাঁর সাহিত্য নিয়ে নয়, বরং ব্যক্তি মানুষ নিয়ে। দীর্ঘদিন খুব কাছে থেকে দেখেছি, চিনেছি, শ্রদ্ধা করেছি, ভালোবেসেছি। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কটা যে কখন বন্ধুত্ব কিংবা বড় ভাই-ছোট ভাইয়ে পৌঁছে গেছে টেরই পাইনি। আমার সঙ্গে তাঁর শেষ দেখা ২০১২ সালে। দুই ঘণ্টা বসেছিলাম পাশাপাশি, চেয়ারে নয়, একেবারে তাঁর বিছানায়, বালিশের পাশে। ‘আসি স্যার’- এই আমার শেষ বাক্য। পা ছুঁয়ে প্রণাম করে নীরবে ঘরছাড়া। পেছনের অস্পষ্ট তাঁর শেষ বাক্য, আমি বুঝতে পারিনি। আমি সিঁড়ি ভাঙছি। তারপর ল্যান্ডফোনে চেষ্টা। লাইন পাইনি। বছরের পর বছর গেছে, জনশ্রুতি ছাড়া তাঁর কণ্ঠস্বর আর শোনা হয়নি আমার। অথচ তিনি চলে গেলেন। তাঁর জন্মভূমি পশ্চিম দিনাজপুরের রায়গঞ্জের (বর্তমান জেলা) মাটি ছুঁয়ে বার কয়েক বাসে যাতায়াত করেছি, ওটাই তাঁর জন্মভূমি, অথচ নৈশ কোচে তাঁর দেখা নেই। চারদিকে আলো-আঁধারী।
নির্মম প্রশ্ন করেছিলাম আমি তাঁকে। প্রশ্ন তো নয়, পিস্তলের গুলিতে হৃৎপি- এফোঁড়-ওফোঁড় করা; সাতচল্লিশে কেনো জন্মভূমি ছাড়লেন? কই, আবুল বাশার কিংবা সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ তো ছাড়েননি।’ কবি মাইকেলের সেই সনেট ‘নীরবিলা তরুরাজ’- অর্থাৎ নিরুত্তর তিনি। বুকের ভেতর উত্তর হয়তো ছিল, কিন্তু কণ্ঠনালি বিদ্রোহ করে। আরও ভয়ংকর প্রশ্ন ছিল; সাতচল্লিশে যে পাকিস্তানে এলেন, তা তো এখন আর নেই।’ এবার মনে হলো সত্যি তিনি আচমকাই কামানের গোলা নিক্ষেপ করে আমার চৈতন্যকে ছিন্নভিন্ন করে দিলেন; ‘তাতে তোমার কী? আমি বুঝতে পারি তিনি উত্তেজিত। বুকে মানুষটার পেসমেকার বসানো, বিপদ হতে পারে। ক্ষমা চেয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাই। তিনি আমার একটা হাত চেপে ধরে স্নেহ-ভালোবাসায় বিগলিত হয়ে মুখে হাসি টেনে বললেন; ‘বোকা ছেলে, অমন প্রশ্ন করতে আছে?’ শওকত আলীর চোখে জল। এবার বলেন; ‘তোমার ভাবিকে (মৃত স্ত্রী) মনে পড়ছে।’
এই হচ্ছেন শওকত আলী। আমার কলেজজীবনের শিক্ষাগুরু। বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী উপন্যাস প্রদোষে প্রকৃতজন-এর মহান শিল্পী। বই আকারে বেরোনোর আগে ঈদ সংখ্যা বিচিত্রায় প্রথম প্রকাশ। এর পয়লা পাঠ-প্রতিক্রিয়া আমিই লিখি। বইটির পাঠক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বইটির শেষ অনুচ্ছেদে লেখকের পয়েন্ট অব ভিউ বা লেখক দৃষ্টিকোণ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। স্পর্শকাতর এই বিতর্কটি কী, পাঠকমাত্রই জানেন। তাই এর দ্বিতীয় সংস্করণে লেখককে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে অতিরিক্ত অনুচ্ছেদ লিখতে হয়। অবশ্য না লিখলেও চলত।
শওকত আলী তাঁর জন্মভূমি পরিত্যাগকারী পূর্বপাকিস্তানি বা পূর্ববঙ্গে অভিবাসী হলেও অন্য অনেক অভিবাসী কবি-লেখকের মতো স্মৃতিবিচ্ছিন্ন বা মাটিবিচ্ছিন্ন ছিলেন না। তাঁর শিল্পসত্তার এটাই ছিল বড় শক্তি। বিষয়টি নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার বহুবার কথা হয়েছে। মনোযোগী পাঠকমাত্রই বিষয়টি ধরতে পারবেন। শওকত আলীর গ্রামভিত্তিক লেখাগুলো পাঠ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেশ ভাঙার ফলে ব্রিটিশ বঙ্গের দিনাজপুর জেলাটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। সীমান্ত পেরিয়ে পূর্বখণ্ডে লেখক পরিবার পুনর্বাসিত হন। আমরা জানি দ্বিখণ্ডিত বঙ্গের দিনাজপুর, রংপুর, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি জেলাগুলো হিমালয়ের প্রান্তময়ী সমভূমি। ভূপ্রকৃতি অভিন্ন। কৃষি সভ্যতা অভিন্ন। আঞ্চলিক ভাষাও এক। জনজাতির সংস্কৃতিও এক। তার শস্য, প্রকৃতি, লোকজীবন একেবারে অভিন্ন। এই অভিন্নতাই ঢাকা শহরে অভিবাসী শওকত আলীকে গ্রামভিত্তিক (উত্তরবঙ্গ) সাহিত্য রচনায় উসকে দিয়েছে। তিনি তাঁর সফল কারিগর। আজীবন লিখতে পেরেছেন অসংখ্য গল্প-উপন্যাস। অন্য অনেকে যা পারেনি। জননী উপন্যাসের ঔপন্যাসিক শওকত ওসমানকে তো আশ্রয় নিতে হয় পূর্ব স্মৃতি বা বাল্যস্মৃতিতে, তাঁর জন্মভূমি হুগলি জেলার সবলসিংহপুর গ্রামে। তিনি গ্রাম বিচ্ছিন্ন ছিলেন বলেই তাঁর সাহিত্য গড়ে ওঠে ঢাকা শহর কিংবা প্রতীকে- রূপকে।
আমরা শওকত আলীর ‘লেলিহান সাধ’ গল্পটির দিকে তাকাতে পারি। গ্রামভিত্তিক গল্প। মাটি-ফসল-কৃষক তাঁর চরিত্র। সেই গল্পেই বাংলা সাহিত্যের একটি কালজয়ী ডায়ালগ রয়েছে। শস্য পাহারারত এক কৃষকের। মাঘের হাড়কাঁপানো শীতে। ‘কি জার নামিল্ বাহে।’ কী অবিস্মরণীয় উক্তি। বুকের ভেতরের কলজে ধরে টান মারে।
অনেকে হয়তো জানে না। আমি খানিকটা টের পেয়েছিলাম। তাঁর ভেতরে গোপনে একটা বিচ্ছিন্নতার দ্বন্দ্ব কাজ করত। ব্রিটিশ ভারত, দেশভাগ, পাকিস্তান, পাকিস্তানের ভাঙন, বাংলাদেশ। এ নিয়ে একটি আত্মদ্বন্দ্ব। উদ্বাস্তুর অভিশাপ থেকে তিনি মুক্তি পাননি। অসতর্ক মুহূর্তে কথাচ্ছলে নানা কথা মুখ থেকে বেরিয়ে আসত। ঢাকা শহরকেও খুব যে আপন করে নিতে পেরেছিলেন, তাও নয়। তিনি তাঁর স্মৃতিবিশ্বের। বলতেন একাত্তরে নিহত পিতার কথা। উঠোনে টিনের পোড়া চালের তলায় চাপা পড়ে থাকা পিতার কঙ্কালের কথা। বারবার বলতেন তাঁর পিতা ছিলেন গান্ধীবাদী কংগ্রেসি এবং কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা। সেই পিতার দেশত্যাগ করে পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েও একাত্তরে নির্মমভাবে নিহত হলেন।
আমাকে কথা দিয়েছিলেন সাতচল্লিশের উদ্বাস্তুদের নিয়ে একটি মহাকাব্যিক উপন্যাস লিখবেন। আমার জন্ম জন্মান্তর উপন্যাসটি ছিল তাঁর কোলের ওপর। শওকত স্যার আর লিখলেন না, না লিখেই চলে গেলেন। চলে যাওয়ার আগে কমসে কম পঁচিশ বছর পূর্বে আমার কাছে বারবার বলেছেন এক দিনাজপুর পেছনে ফেলে আর এক দিনাজপুরে অভিবাসী না হলে লেখকই হতে পারতেন না। জন্মভূমির প্রতিচ্ছায়াই তাঁর শিল্পের শিকড়। বলতেন, ‘জান হরিপদ, একই মাটি, একই ভাষা, একই গাছগাছড়া, (হেসে) তোমাদের ঢাকাইয়া না।’
ভারতে চিকিৎসা করাতে গিয়ে জীবনের বদলে স্ত্রীর মৃত্যুগন্ধ সারা অস্তিত্বে মেখে বিমান থেকে নামার বিষণ্ন করুণ বর্ণনা দিয়ে কেঁদেছিলেন। বলেছিলেন; তুমি ঠিক বুঝবে না, জীবনসঙ্গী হারিয়ে গেলে যে শূন্যতা তৈরি হয় তার পূর্ণতা কখনো হয় না সন্তানদের দ্বারা।’ সেই শূন্যতা শওকত আলী আমৃত্যু বয়ে গেছেন। আমাদের ভাবি অর্থাৎ শওকত স্যারের স্ত্রী ছিলেন অসাধারণ সুন্দরী। আমি বলতাম কালো অনার্যের ঘরে শ্বেতবর্ণা আর্য নারী। স্যার কথাটা উপভোগ করতেন। ভাবি ভীষণ পান খেতেন। সে কারণে আমার সঙ্গে তাঁর ভালো জমত। ভাবি যখন চলে গেলেন, আমি তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। শেষ দেখা হয়নি!
শওকত আলীর শিল্পচেতনার ক্ষমতা ছিল ভিন্ন মাত্রার। পশ্চিমবঙ্গে জন্মে ও পূর্ববঙ্গেও মাটিকে চেনার অসম্ভব ক্ষমতা ছিল তাঁর। চিনেছিলেন উত্তরবঙ্গের কৃষিনির্ভর গ্রামীণ মানুষকে। তাঁর লেখার প্রাণরস সেখান থেকেই টেনে নিয়েছিলেন। অনেক প্রতিভাধর অভিবাসী লেখক উচ্চাঙ্গের গল্পে সফলতা দেখাতে পারলেও শওকত আলীর মতো উপন্যাস লিখতে পারেননি। জন্মভূমি বিচ্ছিন্নতা এবং আগত দেশের মাটি আর মানুষের সঙ্গে একাত্ম হতে না পারার কারণই এর মূলে। সংগত কারণে আমরা প্রশ্ন করতে পারি, পশ্চিমবঙ্গের লেখক সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ কিংবা আবুল বাশার যদি পূর্ববঙ্গের অভিবাসী হতেন, তবে কি আমরা পেতাম অলীক মানুষ আর অগ্নিবলাকার মতো সৃষ্টি?
হারানো বা ফেলে আসা মাতৃভূমির স্মৃতির ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের (উত্তরবঙ্গ) গ্রামীণ জন ও জনপদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার চেষ্টা ছিল শওকত আলীর। অন্য অনেক অভিবাসী কবি-লেখকের মধ্যে তা দেখা যায় না। তাঁদের আশ্রয়টা ছিল গ্রাম বিচ্ছিন্ন নগর-উপনগরে। সে কারণেই তাঁদের লেখায় বাংলাদেশের পলল মাটি আর মানুষের ভেজা জমিনের গন্ধ নেই কিংবা থাকলেও ভাসা-ভাসা বায়বীয়। শওকত আলীর ‘ঘটি’ থেকে ‘বাঙাল’ হওয়ার চেষ্টার এই যে বাসনা, আজ তাঁর চলে যাওয়ার দিনে সে কথা মনে করে আমাদের মাথা নত হয়ে আসে। সঙ্গে সঙ্গে আমার একটি প্রশ্ন, শওকত আলীর শোবার ঘরের দক্ষিণের জানালা দিয়ে যে প্রাচীন কতবেলগাছটি দেখা যেত, তা কি এখনো নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে?
লেখক: সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

আরো খবর

Disconnect