ফনেটিক ইউনিজয়
ইতিহাসের আলোকে চলচ্চিত্রে নারী নির্মাতাদের ভূমিকা

২০১২ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল এবং সেটা হলো, “পাম দো’র অ্যাওয়ার্ডের তালিকায় কোনো নারী নির্মাতা মনোনয়ন না পাওয়বার কী কারণ?” নারী নির্মাতা মনোনয়নের নিদারুণ অনুপস্থিতি উৎসব কর্তৃপক্ষকে অত্যন্ত বিচলিত ও চিন্তান্বিত করায় প্রশ্নটা উত্থাপিত হয়েছিল। ব্রিটিশ নির্মাতা অন্দ্রে আর্নল্ড ক্ষোভে-দুঃখে বলেই ফেললেন, ‘নারী নির্মাতাদের এ অনুপস্থিতির অর্থ দাঁড়ায় পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার অনুপস্থিতি’ (দি অবজারভার, ২০ মে, ২০১২)। ঠিক একই কথা ভিন্ন শিরোনামে (নারী নির্মাতারা আজ কোথায়?) উচ্চারিত হয়েছিল ২০১১ সালের ২০ মার্চ ওই একই পত্রিকায়। সে বছর চলচ্চিত্রাভিনেত্রী জো ওয়ানামেকার ‘বার্ডস আই ভিউ’ চলচ্চিত্র উৎসবে বলেন, ‘আমরা পৃথিবীর অর্ধেক জনসংখ্যার কাহিনী থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। মোট চলচ্চিত্র নির্মাণের মাত্র শতকরা ৬ ভাগ ছবি নির্মিত হয় নারী নির্মাতার হাত ধরে। তার ওপর আকাদেমি অ্যাওয়ার্ডের ৮২ বছরের দীর্ঘ সময়ে ২০১০-এ মাত্র একজন নারী নির্মাতার ভাগ্যে এ অ্যাওয়ার্ডের (নির্মাতা বিভাগে) সর্বপ্রথম সর্বোচ্চ শিরোপাটি জুটেছে।’ সুজান বিয়ের, ওই উৎসবের ‘বার্ডস আই ভিউ’ চলচ্চিত্র উৎসবে বিদেশি ভাষা বিভাগে যার পরিচালিত ‘ইন এ বেটার ওয়ার্ল্ড’ ছবির জন্য পুরস্কৃত হন, বলেন, “সম্ভবত ‘পরিচালক’ বা ‘নির্মাতা’ শব্দটি আমাদের মাথায় ‘লিডার’ অর্থে গেঁথে থাকে এবং সেই ‘লিডার’ বা ‘বস’ মানুষটি আমাদের মনের অজান্তে একজন পুরুষের চেহারায় ভেসে ওঠে। সম্ভবত এ কারণেই চলচ্চিত্রে নারী নির্মাতার সংখ্যা এত স্বল্প। অথচ চলচ্চিত্রজগতে এমন অনেক মহান পরিচালক (পুরুষ) আছেন, যাদের সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে এবং বলাই বাহুল্য, তাদের প্রায় সবার ভেতর নারীসুলভ কোমলতা লক্ষ করেছি। এবং সেই বৈশিষ্ট্য নিয়েই তারা দক্ষতার সঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও পরিচালনার কাজটি করে থাকেন। যেমন ড্যানি বেয়েল, মাইকেল উইন্টার কটন, রোয়ান জোসেফ ও এমন আরও অনেক পরিচালক। ...আমার মনে হয়, নারীর আত্মবিশ্বাসের অভাবই নারী নির্মাতাস্বল্পতার মূল কারণ।” আরও কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হচ্ছে, ২০১০ সালে আকাদেমি অ্যাওয়ার্ডের প্রাক্কালে সেই একই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল। জানুয়ারি ৩১, ২০১০, দ্য গার্ডিয়ানে কিরা ককরেন তার প্রতিবেদনে ‘নারী নির্মাতার এত সংখ্যাস্বল্পতা কেন?’ শিরোনাম দিয়ে লেখেন, ‘...গত বছর (২০০৯)  স্যান্টিয়াগো শহরের প্রফেসর মার্থা লুজেনের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০০৮ সালে হলিউডের চিত্র পরিচালকদের মধ্যে শতকরা ৯ ভাগ মাত্র নারী পরিচালক। ঠিক একই পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে ১০ বছর আগে ১৯৯৮ সালে।’ অথচ ওই বছরই অর্থাৎ ২০১০-এ সবাইকে অবাক করে দিয়ে ক্যাথেরিন বিগলো ইরাক যুদ্ধের ওপর নির্মিত ‘দ্য হার্ট লকার’ ছবির জন্য অস্কার জিতে নিয়েছিলেন। যদিও আকাদেমি অ্যাওয়ার্ডের দীর্ঘ ৮২ বছরের সময়ে প্রথম একজন নারী নির্মাতার অস্কার জয়, যা আগেই উল্লিখিত হয়েছে। ক্যাথেরিন বিগলোর আগে মাত্র তিনজন নারী পরিচালক, লিনা ওয়ার্টমুলার ১৯৭৬ সালে, জেন ক্যাম্পিয়ান ১৯৯৩ সালে ও সোফিয়া কোপালা ২০০৩ সালে অস্কার মনোনয়ন পান; অ্যাওয়ার্ড নয়। অন্যদিকে আকাদেমি অ্যাওয়ার্ডের বিদেশি ভাষা বিভাগে নারী নির্মাতা মনোনয়নের সংখ্যাধিক্য থাকলেও এ পর্যন্ত মাত্র দুজন নারী নির্মাতা এ অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। প্রথমজন হলেন নেদারল্যান্ডসের আন্তোজ গোরিস ১৯৯৫-এ ‘আন্তোনিয়াস লাইন’ ছবির জন্য এবং ডেনমার্কের সুজান বিয়ের ২০১০-এ ‘ইন এ বেটার ওয়ার্ল্ড’ ছবির জন্য। এখন আমাদেরও প্রশ্ন, নারী নির্মাতাদের এ সংখ্যাস্বল্পতার কারণ কী? তা কি এজন্য যে, নারীরা ছবি নির্মাণে খুব একটা আগ্রহী নন, যতটা চলচ্চিত্রে অভিনয়সহ অন্যান্য কাজে? অথবা ছবি নির্মাণ একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও পরিশ্রমবহুল মাধ্যম বলে নারীরা এগিয়ে আসতে মানসিক ও শারীরিকভাবে নিজেদের দুর্বল মনে করে? বা চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে অনেকটা সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে হয় বলে, চলচ্চিত্রে দীর্ঘ সময় ব্যয় করার চেয়ে অন্য কাজে যেখানে সময় কম দিতে হয়, সেসব কাজে নিজেদের নিয়োজিত রাখতে আগ্রহী বেশি তারা? অথবা নারী নির্মাতার সংখ্যাধিক্যের কি খুব প্রয়োজন আছে? নারী নির্মাতাদের চলচ্চিত্রে অংশগ্রহণের বিশ্ব-ইতিহাসটি পর্যবেক্ষণ করলে আমরা চিত্রটা কেমন দেখতে পাই? চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাদের পদার্পণের বিশ্বচিত্রটি পর্যবেক্ষণ করলে এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হয়তো কিছুটা সুবিধা হবে। চলচ্চিত্রে নারীর সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটা এবার অবলোকন করা যাক।
১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর লুই ও আগুস্ত লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় যখন প্যারিসের বুলেভার্ড দ্য কাপুসিন্সের গ্র্যান্ড কাফেতে জনসমক্ষে বিশ্বের সর্বপ্রথম সিনেমাটোগ্রাফের উদ্বোধন করলেন, তার ঠিক পরের বছর অর্থাৎ ১৮৯৬ সালে ফ্রান্সের এলিস গাই ব্লশের ( ১৮৭৩-১৯৬৪) ‘দ্য ক্যাবেজ ফেরি’ নামের ১ মিনিট দৈর্ঘ্যরে নির্বাক ছবিটি মুক্তি পায়। অর্থাৎ চলচ্চিত্রে পুরুষ পরিচালকদের আবির্ভাবের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নারী নির্মাতাদের আগমন ঘটেছে। ঘটনাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দাবি রাখে। কেননা বিশ্বচলচ্চিত্র যখন মাত্র যাত্রা করেছে, যখন কনিষ্ঠতম এ শিল্পের গঠন অনেকটাই অপরিণত, যখন পুরুষ নির্মাতারাই এ শিল্পের সঙ্গে মাত্র পরিচিতি পেতে শুরু করেছে, ঠিক সেই সময়ে একজন নারীর সাহসী আগমন বিস্ময় ও আনন্দ দুটোরই উদ্রেক ঘটায়। এলিস ব্লশে তার জীবদ্দশায় ১৮৯৬ থেকে ১৯২০ পর্যন্ত ৪০০টির মতো ছবি নির্মাণ করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নির্বাক যুগে প্রায় বেশির ভাগ ছবির দৈর্ঘ্য খুব বেশি না থাকায় অনেক ছবি নির্মাণ সম্ভব ছিল, যা সবাক যুগে কম ঘটে। ১৯২০-এর পর এলিস ব্লশের দেউলিয়াত্ব ও পারিবারিক জীবন বিপর্যয়ের কারণে আর ছবি নির্মাণ সম্ভব হয়নি তার পক্ষে। তবে ১৯৫৩ সালে ব্লশেকে ফ্রান্সের অন্যতম সম্মানসূচক অ্যাওয়ার্ড ‘লিজিয়ন দ্য অনার’ দেয়া হয়। ওই একই সময়ে আমেরিকায় আরেকজন নির্মাতার আর্বিভাব ঘটে, লুই ওয়েবার ( ১৮৭৯-১৯৩৯)। যিনি একাধারে অভিনেত্রী, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক ও পরিচালক ছিলেন এবং প্রায় ৪০০ ছবি নির্মাণ করেন, যেসব ছবির প্রায় প্রতিটিতে মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক ন্যায়পরায়ণতার চিহ্ন রেখেছেন। তার ছবিগুলো তৎকালীন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ডিডব্লিউ গ্রিফিতের দ্বারা প্রশংসিত হয়। তাকে আমেরিকার আদি অকৃত্রিম চলচ্চিত্র অথর হিসেবে আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। (চলবে)

Disconnect