ফনেটিক ইউনিজয়
ইতিহাসের আলোকে চলচ্চিত্রে নারী নির্মাতাদের ভূমিকা

পর্ব- ৬.
লাতিন আমেরিকায় বেশ কয়েকজন নারী নির্মাতা আছেন। আর্জেন্টিনার মারগট বেনাসেরাফ মাত্র দুটো প্রামাণ্যচিত্র রেভেরন ও আরায়া নির্মাণ করলেও তার দুটি প্রামাণ্যচিত্রই লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। তার আরায়া ছবিটি লবণ খনির শ্রমিকদের নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র, যেসব শ্রমিক ৪৫০ বছর ধরে বংশপরস্পরায় এ শিল্পের ওপর জীবন নির্বাহ করছেন। আর্জেন্টিনার আরেকজন নির্মাতা মারিয়া লুইসা বেমবার্গ একাধারে নারীবাদী, লেখিকা, নির্মাতা ও অভিনেত্রী।  তার নির্মিত মোমেনটস (১৯৮১), নোবডিস ওয়াইফ (১৯৮২), আই দ্য ওয়ার্সট অব অল (১৯৯০) নারীবাদী চলচ্চিত্রের অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কলাম্বিয়ার প্রামাণ্য নির্মাতা মারটা রদ্রিগেজ রাজনৈতিক প্রামাণ্য ছবি নির্মাণে অধিক আগ্রহী। তাই তার ছবির বিষয়বস্তু নিজ দেশের কৃষক, শ্রমিক থেকে সাধারণ জনগণ। সত্তরের নারী আন্দোলন তাকে ছবি নির্মাণের দিকে উৎসাহিত করে তোলে। তবে আর্থিক সংকটের কারণে তার ছবি নির্মাণে প্রায়ই বিলম্ব হয়। যেমন তার অন্যতম প্রামাণ্যচিত্র ‘লাভ, ওমেন অ্যান্ড ফ্লাওয়ার’ (১৯৮৪-৮৫) নির্মাণ করতে প্রায় চার বছর সময় লেগে যায়। তার পরও তার ছবি নির্মাণ থেমে থাকে না। দ্য ব্রিক মেকারস (১৯৭২), পিজেনটস (১৯৭৫) ও নেভার এগেইন (২০০১) তার অন্যতম সৃষ্টি।
কিউবার সারা গোমেজ বাস্তবতাকে দ্বান্দ্বিকভাবে উপস্থাপন করতে বেশি আগ্রহী। তার ট্রেজার আইল্যান্ড (১৯৬৮), ওয়ান ওয়ে অর অ্যানাদার (১৯৭৭) প্রামাণ্যচিত্রগুলো নান্দনিকতার কারণে এখনও আলোচিত হয়। মেক্সিকোর লোরদেস পোর্টিলোর ‘দ্য মাদারস অব প্লাজা দ্য মায়ো’ প্রামাণ্যচিত্র আরেকজন লেখিকা ও নির্মাতা সুজানা মনেজের সঙ্গে তিন বছরের প্রচেষ্টায় নির্মাণের পর ১৯৮৫তে বেস্ট ডকুমেন্টারি হিসেবে আকাদেমি অ্যাওয়ার্ডের জন্যে মনোনীত হয়। ভেনিজুয়েলার সোলভেইগ হুগোস্টেইন একাধারে লেখিকা, নির্মাতা ও প্রযোজক। তার নির্মিত মোরাও (২০০৬) ছবিটি ২০০৭ সালে বেস্ট ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ আকাদেমি অ্যাওয়ার্ড পায়। জার্মানি ক্যান বি ভেরি বিউটিফুল সামটাইম (১৯৮২), সানতেরা (১৯৯৫) তার নির্মিত অন্যতম ছবি। পেরুর হেডি হনিগম্যান (১৯৫১-) হলোকাস্ট থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষদের মধ্যে অন্যতম একজন। তার পরিবারে প্রায় সবাই গল্প বলিয়ে মানুষ ছিলেন। বিশেষ করে তার মা। তার মা তাকে বলতেন, ‘পৃথিবীটা ভয়ঙ্কর সব বিষয়বস্তু দিয়ে ঘেরা। কিন্তু তাই বলে তোমাকে এর জন্য দুঃখ করলে চলবে না। তোমাকে জাগতিক সবকিছুকে রসিকতা আর ভাগ্যের পরিহাস হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে, না হলে মৃত্যু।’ হেডি ছবি নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রামাণ্যচিত্রকে বেছে নেন। ২০১০ সালে তাইওয়ান আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে তাকে যখন বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত করা হয়, তখন তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ছবি নির্মাণ করতে হলে মনের জানালাটাকে একেবারে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। প্রামাণ্যচিত্র হচ্ছে সিনেমার সেই শাখা, যেখানে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই সব করতে হয়। আর তাই আমি সাক্ষাৎকার নেয়ার বদলে ছবির চরিত্রদের সঙ্গে কথপোকথন করি।’ বসনিয়ার যুদ্ধের ওপর নির্মিত ‘ক্রেজি’ প্রামাণচিত্রে তাই সৈনিকদের সাক্ষাৎকার নেয়ার সময়, অধিকাংশ সময় তাদের কথা বের করে আনার জন্য নির্মাতা হেডি মাটির দিকে তাকিয়ে থাকেন ছবির প্রায় সবটা সময়জুড়ে। তবে হেডি জানান, ‘কিন্তু আমি সত্যি সত্যিই তাদের মনের অবস্থা জানার ও বোঝার চেষ্টা করছিলাম।’
ইরানে যখন চলচ্চিত্রের যাত্রা হয়, সিনেমার বয়স তখন পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। তবে বেশির ভাগ ছবিই তখনও ইরানে ঘরোয়া পরিম-লে সীমাবদ্ধ ছিল। অর্থাৎ হলে গিয়ে সিনেমা দেখার প্রচলন শুরু হয়নি। সিনেমা হলে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকারের (শুধু পুরুষ দর্শক) জন্য আরও পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হয়। আর নারী দর্শকের জন্য আরও ২১ বছরÑ যখন ১৯২৬ সালে ইরানের সিনেমাটোগ্রাফার খান বাবা মোতাজেদি নারীদের জন্য আলাদা সিনেমা হলের ব্যবস্থা করেন, তখন থেকে প্রদর্শনের ব্যবস্থা শুরু হয়। কিন্তু সেটাও নানা কারণে প্রতিক্রিয়াশীলদের দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়। আরও তিন-চার বছর পর অবশেষে নারী-পুরুষের পৃথক আসনে বসার মাধ্যমে সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। অর্থাৎ শুধু সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখার জন্য ইরানের নারীদের প্রায় তিন দশক অপেক্ষা করতে হয়। ১৯৩০ সালে প্রথম ইরানি ছবি নির্মিত হয়। সেটা পুরুষ নির্মাতার হাতে। নারীর আগমন তারও অনেক পরে এবং প্রথম পর্যায়ে শুধু অভিনয় আর চিত্রনাট্য লেখার দিকে নারীদের আগ্রহ দেখা যায়, নির্মাণের দিকে নয়। তবে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হচ্ছে, ইরানি নারীদের সিনেমা পরিচালনা, চিত্রনাট্য রচনা, অভিনয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে আগমন ঘটে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের পরে। ১৯৭৯-এর বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ইরানের নারীরা চলচ্চিত্রের অভিনয় ও চিত্রনাট্য শাখায় আসতে থাকেন। তবে কেউই পেশা হিসেবে এ মাধ্যমকে তখনও বেছে নেননি। একমাত্র মারভা নাভিল প্রথম ইরানি নারী, যিনি চলচ্চিত্র মাধ্যমকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তার ছবি বহির্বিশ্বে নিয়ে যান। আরও কিছু পরে ইরানের ৪৫০ জন পুরুষ নির্মাতার পাশে মাত্র ১১-১২ জন নারী নির্মাতার আগমন ঘটে। রাকশান বানিএতামেদ (১৯৫৪Ñ) ইরানের প্রথম নারী নির্মাতা, যিনি বাইরের বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেন তার নির্মাণের গুণে। ১৯৭৮ সাল থেকে প্রধানত প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে তার নির্মাণের অগ্রযাত্রা সূচিত হয়। তার ছবির বিষয়বস্তু প্রধানত দরিদ্রতা, অপরাধমূলক ঘটনা, তালাক, বহুগামিতা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, নারী নিগ্রহ ইত্যাদি। ২০০২ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধের ওপর নির্মিত ‘আওয়ার টাইম’ ছবিটি ইরানের ইতিহাসে প্রথম নারী নির্মিত যুদ্ধের প্রামাণ্যচিত্র। ২০০৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘গিলানে’ প্রামাণ্য ছবিটি প্রায় দেড় বছর ধরে দিনের পর দিন গ্রামে থেকে তাদের মানসিকতা অবলোকনের পর নির্মাণ করা হয়। এশিয়া-প্যাসিফিক অ্যাওয়ার্ড ছাড়াও আরও অ্যাওয়ার্ডে রাকশান বানি ভূষিত হয়েছেন। নিকি কারিমি (১৯৭১) ইরানের একজন সফল অভিনেত্রী, সেই সঙ্গে নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার। স্বনামধন্য নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামির প্রযোজনায় ২০০১ সালে নির্মাণ করেন ছবি ‘টু হ্যাভ অর নট টু হ্যাভ’। ছবিটি ইরানের রেইন ফিল্ম ফেস্টিভালে শ্রেষ্ঠ নির্মাতা হিসেবে পুরস্কৃত হয়। সাাম্প্রতিক সময়ে সামিরা মাকমালবাফ  (১৯৮০) ইরানের নারী নির্মাতাদের মধ্যে অত্যন্ত প্রশংসিত ও বহির্বিশ্বে আলোচিত একজন নির্মাতা। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তার নির্মিত ‘দি অ্যাপেল’ (১৯৯৮) ছবিটি দিয়ে তিনি সাড়া জাগিয়েছিলেন। প্রতিবন্ধী দুই বোনের অনবদ্য অভিনয় ছবি শেষ হয়ে যাওয়ার পরও মনে রেখাপাত করে থাকে। পরবর্তীতে ব্ল্যাকবোর্ড (২০০০), অ্যাট ফাইভ ইন দি আফটারনুন (২০০৩), টু লেগড হর্সেস (২০০৮) সবগুলোই প্রশংসিত হয়। ব্ল্যাকবোর্ড ২০০১ সালে কান ফেস্টিভালে স্পেশাল জুরি বিভাগে অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত ছবি। সামিরা বেশির ভাগ সময় অপেশাদার শিল্পীদের নিয়ে তার ছবির কাজ করেন। ব্ল্যাকবোর্ড ছবিটি সম্পর্কে তার মন্তব্য, “আপনি যদি একজন শিক্ষক হন, তাহলে ব্ল্যাকবোর্ড বহন করা আর ছাত্রদের আহ্বান করা ছাড়া আর কীই বা করতে পারেন? তারা (শিক্ষক) অনেকটা রাস্তার ফেরিওয়ালাদের মতো, চিৎকার করে করে বলে- ‘এসো। কিছু শেখো।’ এ রকম শোচনীয় পরিবেশে, সবাই গরিব। কেউ কিছু শিখতে পারে না।” কোনো দেশের উন্নয়নে শিক্ষা কতটা প্রয়োজনীয় শর্ত হতে পারে, সেটা নির্মাতা সামিরা ‘ব্ল্যাকবোর্ড’-এর নানা রকম ব্যবহারের মধ্য দিয়ে অসাধারণ দক্ষতায় দেখিয়েছেন। (চলবে)

Disconnect