ফনেটিক ইউনিজয়
বর্ষবরণ দেশে দেশে
দীপংকর গৌতম
ইরানের বর্ষবরণ উৎসব
----

পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। বাঙালিত্বের এই আকিঞ্চন আর কোনো উৎসবে মেলে না। যদিও একসময় নববর্ষ পালিত হতো ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল কৃষি। কারণ কৃষিকাজ ছিল ঋতুনির্ভর। মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০-১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তার সিংহাসনে আরোহণের সময় থেকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬)। সে সময় বাংলার কৃষকরা চৈত্র মাসের শেষ দিন পুণ্যাহ পালন করত। জমিদার, তালুকদার ও অন্যান্য ভূস্বামীরা খাজনা পরিশোধ করত। বাজারের দোকানদারদের দেনা শোধ করতে হতো সাধারণ মানুষকে। পরদিন ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করালেও এ উৎসব মেহনতি কৃষক-মজুরদের জন্য খুব যে সুখকর ছিল, তা নয়। তবে এখন নববর্ষ মানেই শ্রেণিহীন উৎসব। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে সবখানেই ছড়িয়ে গেছে উৎসব বারতা। প্রাচীন পারস্য, বর্তমান ইরানে দুই সপ্তাহব্যাপী নওরোজ  উৎসব পালিত হয়ে আসছে প্রায় ১৫ হাজার বছর আগে থেকে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া বা ব্যাবিলনে নববর্ষ উদযাপিত হয়ে আসছে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে থেকে। রোমানরা অনেক আগে থেকেই বসন্তকালে নববর্ষ উৎসব পালন করে আসছে। ব্যাবিলনীয়দের দেখাদেখি ইহুদিরা নববর্ষ উৎসব ‘বুশ হুশনা’ পালন করে আসছে যিশু খ্রিস্টের জšে§র অনেক আগে থেকে।
যুক্তরাজ্যে নতুন বছরে মধ্যরাতের পর যে পুরুষ প্রথম বাড়িতে পা দেয়, বলা হয় সে বাড়িতে সৌভাগ্য নিয়ে আসে। মধ্যরাতের পর বাড়িতে পা দেয়া প্রথম মানুষটি অবশ্যই সোনালি বা লাল চুলওয়ালা ও নারী হতে পারবে না। এতে বাড়িতে দুর্ভাগ্য আসে। লন্ডনে নববর্ষের আগ মুহূর্তে ট্রাফালগার স্কয়ার ও পিকাডেলি সার্কাসে বিশাল পরিসরে মানুষ সমবেত হয়। মধ্যরাতে বিগ বেনের ধ্বনি শুনে এরা একত্রে নববর্ষকে বরণ করে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রে নববর্ষ উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দু টাইমস স্কয়ার। এখানে নতুন বছর শুরু হওয়ার ১০ সেকেন্ড আগে এক বিশালাকার ক্রিস্টাল বল নেমে নতুন বর্ষের আগমনের কাউন্টডাউন শুরু করে। এটিই বিশ্বের সবচেয়ে বড় নিউ ইয়ার পার্টি। এতে প্রায় ৩০ লাখ লোক অংশগ্রহণ করে। ভারতীয় বর্ষবরণ উৎসবকে বাংলার বাইরে দিওয়ালি উৎসব বলে অভিহিত করা হয়। এটি হয় বিভিন্ন রাজ্য বা সম্প্রদায়ের নিয়ম অনুযায়ী। পাঞ্জাবে নববর্ষ উৎসব পরিচিত ‘বৈশাখী’ নামে।
ফ্রান্সের নববর্ষ উদযাপন খুবই মজার। বছরের শেষ দিনে ঘরে থাকা সব মদ শেষ করতেই হবে। নতুন বছরে ঘরে পুরনো মদ পড়ে থাকা অশুভ। সৌভাগ্য ঘরে আসবে না। তবে ঘরে থাকা মদ ফেলে দিলে চলবে না। খেয়েই শেষ করতে হবে। মদে মশগুল রাত, নতুন ভোর! বছরের শেষ পাঁচদিন ঘরে কোনো আগুন জ্বলে না প্যারাগুয়েতে। হয় না কোনো রান্না। ওই পাঁচদিনকে তারা পালন করে ‘ঠা-া খাবার খাওয়ার দিন’ হিসেবে। ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টার পর নতুন বছরের ঘণ্টা বাজলে হেঁশেলে আগুন জ্বেলে নতুন নতুন পদ একসঙ্গে খেয়ে নতুন বছরে পা দেন তারা।
পোল্যান্ডেও বর্ষবরণটা বেশ আয়েশি ও খুবই ঐতিহ্যবাহী। এখানকার তরুণীরা বর্ষবরণের রাতে খরগোশের মতো পোশাক পরে জড়ো হয়। তারা বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি জোগাড় করে খরগোশের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে। ওই শাক-সবজি তারাই চিবিয়ে খায়! তাদের বিশ্বাস, শাক-সবজি খেয়ে নতুন বছরে পা দিলে নাকি নতুন বছরের দিন সুন্দর হবে। বুলগেরিয়ায় বর্ষবরণের দিন হাঁচি দেয়া বেশ মঙ্গলের। বর্ষবরণের দিন তাদের বাড়িতে আসা কোনো অতিথি যদি হাঁচি দেন, তাহলে বাড়ির কর্তা তাকে নিজের খামারে নিয়ে যান। এরপর ওই ব্যক্তির প্রথম নজর যে পশুর ওপর পড়বে, সেই পশুটি ওই ব্যক্তিকে উপহার দেয়া হয়।
বছরের শেষ দিন হাঙ্গেরিবাসী হাঁস, মুরগি বা কোনো ধরনের পাখির মাংস খান না। উড়তে পারে এমন পাখির মাংস খেলে নতুন বছরে জীবন থেকে সব সৌভাগ্য উড়ে যাবে! এমনই বিশ্বাস তাদের। ভিয়েতনামের উত্তরের সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী যেখান থেকে প্রতিদিন জল সংগ্রহ করে, বছরের শেষ দিনে সেই জলাধারে দলবেঁধে গিয়ে মোমবাতি জ্বেলে মাটিতে মাথা ছুঁইয়ে প্রণাম করে। তারা সবাই নতুন কলসিতে এক কলস জল নিয়ে আসে। এরপর ওই জল দিয়ে বছরের প্রথম দিন রান্না করে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে উৎসর্গ করার পর নিজেরা খায়। আফ্রিকার মাদাগাস্কারে নতুন বছর শুরুর সাতদিন আগে থেকে মাংস খাওয়া বন্ধ। বছরে প্রথম দিন বাড়িতে মুরগির মাংস রান্না হবে। প্রথমে তা খেতে দেয়া হবে মা-বাবাকে। মা-বাবাকে খেতে দেয়া হয় মুরগির লেজের দিকের অংশটা। আর ভাই-বোনদের দেয়া হয় মুরগির পা।
নববর্ষ উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে প্রায় ৮০ হাজার আতশবাজি ফোটানো হয় । ১৫ লাখ মানুষ এ দৃশ্য উপভোগ করে। স্কটল্যান্ডের মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে নতুন বছরের আগমনের প্রস্তুতি নেয়। এ সময় জুনিপার গাছের ডাল পোড়ানো হয়। নববর্ষের দিন যে মানুষ প্রথম বাড়িতে পা রাখে, সে-ই ওই বছর বাড়ির সদস্যদের ভাগ্য নির্ধারণ করে। স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় যে নববর্ষ উৎসব হয়, তা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উৎসবগুলোর মধ্যে একটি। চার দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানে বিশ্বের সব প্রান্ত থেকে মানুষ আসে। বড়দিনে যে সান্তা ক্লজ লাল পোশাক পরে, নববর্ষের দিন সে-ই লালের পরিবর্র্তে নীল স্যুট পরে এদিন শিশুদের মধ্যে খেলনা বিতরণ করে। জার্মানরা ঠাণ্ডা পানির মধ্যে তরল সিসার টুকরা ঠেলে দেয়। সিসার টুকরা যে রকম আকার বানায়, তা দেখে ভবিষ্যৎ নির্ণয় করা হয়। চীনারা নববর্ষ পালন করে প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী। নববর্ষের প্রথম দিন তারা স্বর্গ ও পৃথিবীর দেবতাকে তুষ্ট করে নানা উপাসনা-উপাচারে, দ্বিতীয় দিন পূর্বপুরুষের মঙ্গল কামনা করে। ‘ওয়েইলু’ নামক বিশেষ ভোজনের আয়োজন করা হয় এদিন। পক্ষব্যাপী আলাদা আলাদা অনুষ্ঠানের মধ্যে সপ্তম দিনটি পালিত হয় ‘শস্য দিবস’ নামে। সারা বিশ্বে নববর্ষ পালনের এ রেয়াজ রয়েছে বিচিত্রভাবে বিচিত্র ঢঙে।

Disconnect