ফনেটিক ইউনিজয়
সুখলতা রাও : বিস্মৃতির আড়ালে এক আলোকিত নারী

ছড়াকার সুকুমার রায়ের সহোদরা ও জগজ্জুড়ে নামকরা চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পিসি হলেন বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ও সমাজসেবক  সুখলতা রাও (১৮৮৬-১৯৬৯)। রায় পরিবারের এ গুণী মেয়েটিকে সবাই তেমন করে মনে রাখেননি, যেমন করে মনে রেখেছেন তার খুড়তুতো বোন লীলা মজুমদারের কথা। পদ্য ও গদ্য উভয় প্রকার রচনাতেই দক্ষ ছিলেন সুখলতা। উঁচুমানের  ছবি আঁকতেন জল ও তেলরঙে। পড়াশোনা যখন করতেন, সেটাও গভীর মনোযোগ ও নিষ্ঠার সঙ্গে।   
সুখলতাদের আদি বাড়ি ছিল বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহের মসুয়ায়। তার পিতা বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, চিত্রশিল্পী ও যন্ত্রকুশলী উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। তার মা বিধুমুখী দেবী ছিলেন বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক, ব্রাহ্ম সমাজের অন্যতম প্রধান নেতা দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কন্যা। শিশুসাহিত্যিক, ছড়াকার, বাংলা সাহিত্যে ননসেন্স রাইমের প্রবর্তক সুকুমার রায় ছাড়াও তার আরও দুই ভাই ছিলেন, যাদের নাম সুবিনয় রায় ও সুকোমল রায়। এছাড়া দুই প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক বোন পুণ্যলতা চক্রবর্তী ও শান্তিলতা রায়।
উপেন্দ্রকিশোর-বিধুমুখীর পরিচয় ও প্রণয় গড়ে উঠতে রবীন্দ্রনাথের একটা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ সুহৃদ দ্বারকানাথ ও কাদম্বিনীর গুরু প্রসাদ চৌধুরী লেনের বাড়িতে আসতেন মাঘ উৎসবে পাড়ার ছেলেমেয়েদের গানবাজনার তালিম দিতে। বেহালা হাতে নিয়মিত সেই রিহার্সালে যোগদান করতেন রবীন্দ্রনাথের বন্ধু টুনটুনি-বেড়ালের বিখ্যাত ও মজাদার গল্পের রূপকার উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। শিগগিরই দ্বারকানাথের প্রথম ঘরের কন্যা বিধুমুখীর সঙ্গে উপেন্দ্রকিশোরের সখ্যতা গড়ে ওঠে। পরে পারিবারিক সম্মতিতেই তাদের বিয়ে হয়।
উপেন্দ্রকিশোর-বিধুমুখী দম্পতির প্রথমে মেয়ে হওয়ার পর যখন ছেলে হলো, তখন তাদের ডাকনাম নিয়ে একটা সমস্যা দেখা দিল।  মেয়েছেলে দুজনেরই ভালো নাম ঠিক ছিল। কিন্তু ডাকনাম স্থির করা যাচ্ছিল না। বড় মেয়ের  পোশাকি নাম সুখলতা। কিন্তু সুকুমারের জন্মের পর ডাকনাম নিয়ে সমস্যার মুশকিল আসান করে দিলেন রবীন্দ্রনাথ নিজেই, তবে অজ্ঞাতে। রবীন্দ্রনাথ যদিও বহুজনের নামকরণ করেছিলেন, এক্ষেত্রে তিনি তা সরাসরি করেননি। কিন্তু সেই বছরেই (১৮৮৭) রবীন্দ্রনাথের কিশোর-উপন্যাস ‘রাজর্ষি’ প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে দুই চরিত্র, হাসি আর তাতা। সুখলতা তাই ‘হাসি’ হয়ে গেলেন আর সুকুমার রায় হয়ে গেলেন ‘তাতা’। সেই নামেই তারা ছিলেন সুপরিচিত পরিবারে ও সুহৃদ সান্নিধ্যে।
সুখলতার জন্ম ব্রাহ্মপাড়ায়। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে বিধুমুখীকে বিয়ে করেছিলেন উপেন্দ্রকিশোর। তারপর সংসার পাততে উঠে এলেন তারা ১৩ নং কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের দোতলার কয়েকখানি ঘর নিয়ে। শ্বশুর-জামাই একই বাড়ির দুই ভাড়াটে। শ্বশুর হলেন সেকালের বিখ্যাত সমাজসেবক ও নারীহিতৈষী দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়, যার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর কন্যা বিধুমুখীর সঙ্গেই উপেন্দ্রকিশোরের বিয়ে হয়েছে। এই ১৩ নং কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের বাড়িতেই বছরখানেক পর জন্ম নিয়েছিলেন হাসি ওরফে সুখলতা। সুখলতা, পুণ্যলতা, শান্তিলতা। তিনটি মিষ্টি মেয়ে। তিনজনেরই কলম ছিল অত্যন্ত মনোগ্রাহী, বিশেষ করে শিশুদের জন্য রচনায় ও স্মৃতিকথায়। পুণ্যলতার ‘ছেলেবেলার দিনগুলি’ পড়া একটা মস্ত অভিজ্ঞতা। শান্তিলতার সরস কবিতাগুলোর কথা অনেকে জানেন না। কিন্তু তিনিও সুলেখিকা ছিলেন।
উপেন্দ্রকিশোর মেয়েদের যত্ন নিয়ে লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন। না শিখিয়ে উপায়ই বা কী ছিল? পাশের ঘরেই থাকেন প্রখ্যাত নারীবান্ধব শ্বশুরমশাই। আর থাকেন ভারতের প্রথম এন্ট্রান্স পাস, গ্র্যাজুয়েট ও নারী চিকিৎসক কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়। কাদম্বিনী বিপত্নীক দ্বারকানাথকে বিয়ে করেছিলেন। এ দুই মহাপ্রাণের  প্রভাব অবশ্যই উপেন্দ্রকিশোর ও তার মেয়েদের ওপর পড়েছিল। সুখলতাকে উপেন্দ্রকিশোর ভর্তি করে দিলেন ব্রাহ্মবালিকা বিদ্যালয়ে। এখান থেকেই এন্ট্রান্স পাস করলেন তিনি। তারপর ভর্তি হলেন বিএ ক্লাসে বেথুন কলেজে। কলেজের পড়া শেষ করে কিছুদিন শিক্ষকতাও করেন সুখলতা। তারপর ২১ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে গেল ওড়িশার ‘ভক্তকবি’ মধুসূদন রাওয়ের প্রথম সন্তান ড. জয়ন্ত রাওয়ের (জন্ম ১৮৭৮) সঙ্গে। জয়ন্ত রাও ওড়িশা চিকিৎসা বিভাগের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে প্রখ্যাত সিভিল সার্জন হিসেবে সুপরিচিত হন। সুখলতা রায় তখন হাসি থেকে হয়ে গেলেন সুখলতা রাও। কলকাতা থেকে কিছুকালের জন্য উঠে এলেন ওড়িশার কটকে,  স্বামীর গৃহে।
বাবার কাছে বসে সুখলতা পাঠ নিয়েছিলেন সাহিত্য ও চিত্রের। অন্য ভাইবোনেরাও সবাই লেখেন। সুখলতা শুধু লেখেন না, ছবিও আঁকেন। স্কুলে পড়ার সময় নিয়মিত ছবি আঁকা শিখতে হতো। শান্তশিষ্ট মেয়ে, হুড়োহুড়িতে  উৎসাহ নেই, প্রশান্ত, অন্তর্মুখী স্বভাব। তাই দেখে উপেন্দ্রকিশোর তাকে ও অন্যদের এনে দিতেন আঁকার নানা সরঞ্জাম। সুখলতার ঝোঁক ছিল ফুল-পাতা, পাখি, গাছপালাসহ প্রকৃতির  ছবি আঁকায়। কলকাতায় প্রকৃতিকে কাছে পাওয়া যেত না বলেই হয়তো এমন করে প্রকৃতিপ্রীতি জেগে উঠেছিল তার মনে ছোটবেলা থেকেই। অবশ্য মানুষের প্রতিকৃতি আঁকায়ও তার উৎসাহ  ছিল। এর মধ্যে সুখলতার আঁকা ‘পূজারিনী’ ছবিটি ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রথম ছাপা হলে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সাগ্রহে তার বাংলা ও ইংরেজি মাসিক পত্রিকা ‘প্রবাসী’ আর ‘মডার্ন রিভিউ’য়ে কয়েকটি ছবি পরপর ছাপিয়ে দেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাকে ছবি আঁকার ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একটা স্নেহ ও সংস্কৃতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। মনসামঙ্গলের বিখ্যাত বেহুলা-লখিন্দর উপাখ্যান নিয়ে ইংরেজিতে ১২টি গল্প লিখে ১২টা রঙিন ছবি নিজে হাতে এঁকে সুখলতা ‘BEHULA’ নাম দিয়ে একটা বই প্রকাশ করেছিলেন। এ বইয়ের জন্য রবীন্দ্রনাথ এক চমৎকার ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন। আসলে রবীন্দ্রনাথের ভালো লেগেছিল বেহুলার ছবি। অনেকে এ তথ্য জানেন না, সুখলতা রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে লিখেছেন, “তিনি ইচ্ছা করাতে ‘সন্দেশ’ কাগজে প্রকাশিত তার একটি কবিতার ছবি এঁকে দিয়েছিলাম।” মডার্ন রিভিউয়ে সাবিত্রী-সত্যবানের গল্পকে ভিত্তি করে আঁকা সুখলতার একটি ছবি ‘In Quest of the Beloved’ ছাপা হয়েছিল। সেটি দেখে জনৈক উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মচারী রবীন্দ্রনাথকে ছবিটি তার কাছে ভালোলাগার ও সেটি কেনার ইচ্ছার কথা জানান। রবীন্দ্রনাথ চিঠি লিখে সুখলতাকে একথা জানান এবং ছবিখানি তাকে পাঠিয়ে দেন।
এছাড়া আরও একটি তথ্য যা বহুল প্রচারিত নয়। রবীন্দ্ররচনার বহু অনুবাদকের তালিকায় সুখলতারও একটি সম্মানযোগ্য স্থান আছে। রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা ও রানী’ নাটক ও ‘জাপান যাত্রী’ ভ্রমণ পত্রাবলির অনুবাদ করেছিলেন তিনি যথাক্রমে ‘Devouring Love’ ও ‘A Visit to japan’ নামে। অনুবাদ দুটি প্রকাশ হয়েছিল রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকীর (১৯৬১) লগ্নে ও ‘East -West Institute Series’-এর বই হিসেবে নিউইয়র্ক থেকে ।
বিয়ের পর স্বামীর সহযোগিতায় সুখলতা সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন এবং কটকে ‘শিশু ও মাতৃমঙ্গল কেন্দ্র’, ‘উড়িষ্যা নারী সেবা সংঘ’ প্রভৃতি সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সমাজসেবার পাশাপাশি তিনি বাংলা ও ইংরেজিতে ‘আলোক’ নামে একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করেন। সুখলতা বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় সাহিত্যচর্চা করেন এবং ২০টির মতো গ্রন্থ রচনা করেন। তার মধ্যে নিম্নলিখিত গ্রন্থগুলো বিশেষ সুনাম অর্জন করে- লালিভুলির দেশে,  নিজে পড়,  নিজে শেখ, গল্প আর গল্প, নতুন পড়া, সোনার ময়ূর, নতুন ছড়া, বিদেশী ছড়া, নানান দেশের রূপকথা, পথের আলো, ঈশপের গল্প, হিতোপদেশের গল্প।
সুখলতা রাওয়ের ‘নিজে পড়’ গ্রন্থটি শিশুসাহিত্য সংসদ কর্তৃক প্রকাশিত হয় এবং এর জন্য তিনি ‘লেখিকা’ পুরস্কার ও ভারত সরকারের ‘সাহিত্য পুরস্কার’ (১৯৫৬) লাভ করেন। এছাড়া তার আরও কয়েকটি গ্রন্থ পুরস্কৃত হয়। সমাজসেবায় অবদান রাখার জন্য তিনি স্বামীর সঙ্গে যৌথভাবে ‘কাইজার-ই-হিন্দ’ পদক লাভ করেন। চিত্রশিল্পী হিসেবেও তার খ্যাতি ছিল। সুখলতা রাও (রায়) ১৯৬৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

Disconnect