ফনেটিক ইউনিজয়
মাওলানা ভাসানী : ফারাক্কা গৃহদাহের রাজনীতি
আহমদ ছফা

১৯৭৬ সালের ১৬ মে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ফারাক্কা অভিমুখে প্রাণঘাতী ব্যারাজ ধ্বংস করে দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তের দুই পাশের মানুষ ও প্রাণিদের রক্ষার তাগিদে অসুস্থ শরীর নিয়ে এক অভূতপূর্ব মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতীক। দেশপ্রেমের তাগিদেই তিনি এমনটি করেছিলেন। ঐতিহাসিক  সেই ফারাক্কা মিছিলে অন্যান্যদের সাথে সামিল হয়েছিলেন প্রয়াত লেখক আহমদ ছফা। গুরুত্ব বিবেচনা করে আহমদ ছফার স্মৃতিচারণমূলক লেখাটি মুদ্রণ করা হলো।

মে মাসের ১৬ তারিখে আমাকে রাজশাহী যেতে হয়। আমার ছিল ১০৩ ডিগ্রির মত জ্বর। সন্তোষ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় যখন আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন আমি গায়ে জ্বর নিয়ে রাজশাহী গেলাম। এইবার সন্তোষ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় মাওলানা ভাসানীর ফারাক্কা লং মার্চ দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে রাজশাহী এবং কানসাটে জনসভার আয়োজন করছিল। কানসাট জায়গাটি সম্পর্কে অনেকের ধারণা থাকার কথা নয়। মাওলানা ভাসানী সীমান্তের কাছাকাছি এই গণ্ডগ্রামটিতে এসে জীবনের সর্বশেষ বক্তৃতাটি করেছিলেন।
ফারাক্কার ব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরে আমার চিন্তাভাবনার কথা নানাভাবে প্রকাশ করে আসছিলাম। এই নিয়ে কিছু লেখালেখিও করেছি। ইচ্ছা ছিল রাজশাহী এবং কানসাটের জনসভায় আমি যেসকল ধারণা পোষণ করি সেগুলো জনগণের সামনে প্রকাশ করব।
যখন রাজশাহী পৌঁছলাম উদ্যোক্তারা আমাদেরকে এয়ারপোর্ট থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথিশালা জুবেরি হাউসে থাকার জন্য নিয়ে গেলেন। যাঁরা এই উদ্যোগ-আয়োজনের দায়িত্বভার গ্রহণ করছিলেন তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং অন্যবিধ কর্মকান্ডের কথা যখন আমি জানতে পারলাম, মনের মধ্যে একটা চোট পেয়ে গেলাম। সেকথা থাকুক। প্রথম রাতেই দেখতে না দেখতে হু হু করে আমার জ্বর বেড়ে গেল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার এসে দেখে শুনে বললেন, আমার শরীরের অবস্থা সুবিধের নয়, টাইফয়েডের দিকে টার্ন নিতে পারে। সুতরাং আমাকে বিছানাবন্দি হয়ে থাকতে হল। রাজশাহী কিংবা কানসাটের কোন সভায় আমার যাওয়া সম্ভব হয়নি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সাহেব ঢাকা থেকে আগত অতিথিদের সম্মানে যে নৈশভোজের আয়োজনটি করেছিলেন তাতেও আমি যোগ দিতে পারিনি। আমি মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম। তার কারণ এই যে, যে আবেগ এবং উদ্দীপনা নিয়ে আমি প্রচন্ড শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও একটা পবিত্র কর্তব্য পালন করার জন্য রাজশাহী এসেছিলাম, রাজশাহীর উদ্যোক্তাদের রকম-সকম এবং মনোভাব দেখে আমি ভয়ংকর রকম নিরাশ হয়ে গেলাম। যাঁরা ফারাক্কা লং মার্চ দিবসটি পালন করার যাবতীয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের ভূমিকা ছোট করে দেখান আমার এ রচনাটির উদ্দেশ্য নয়। আমার গভীর মর্মবেদনার কারণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নরকম। এই লেখায় যথাসাধ্য সে ব্যপারটি প্রকাশ করতে চেষ্টা করব।
মাওলানা ভাসানীর ফারাক্কা লং মার্চের গুরুত্বের কথা আমি মর্মে মর্মে অনুভব করতাম। কিন্তু মাওলানা সাহেব কি রকম শারীরিক অবস্থায় ফারাক্কা পর্যন্ত লং মার্চের ঝুঁকিটি গ্রহণ করেছিলেন তার কোন বস্তুনিষ্ঠ ধারণা আমার ছিল না। যেহেতু আমি ভিন্ন রাজনৈতিক ঘরানার মানুষ, অন্যদের মত আমিও সেসময়ে এই লং মার্চের বিষয়টি মাওলানার আরেক ধরনের রাজনৈতিক ভেল্কিবাজি বলে মনে করেছিলাম। এইবার যখন অসুস্থ হয়ে রাজশাহীর এরকম অপরিচিত পরিবেশে অসহায় সময় যাপন করছিলাম তখন মাওলানা সাহেবের ফারাক্কা লং মার্চের একটা বাস্তব চিত্র নানামানুষ নানাভাবে আমার কাছে তুলে ধরেন। এখানে একটা কথা অবশ্য পরিস্কার করে নেওয়ার আছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরি হাউসে আমি পুরোপুরি অসহায় হয়ে পরেছিলাম একথা বললে অন্যায় করা হবে। লেখক হাসান আজিজুল হক, প্রফেসর শহিদুল ইসলাম এই দুজন শিক্ষক এবং ছাত্রবন্ধু মাসুম ও তাঁর দুবন্ধু আমাকে সঙ্গ দিয়ে অসুখের যন্ত্রণা অনেকটা লাঘব করেছিলেন। একথা অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি। যা হোক, আমরা মাওলানা সাহেবের লং মার্চের প্রসঙ্গটিতে ফিরে আসি। মাওলানা সাহেবকে ১৯৭৬ সালে যখন পিজি হাসপাতাল থেকে উঠিয়ে নেয়া হয় তখন তাঁর শরীরে ছিল আগুনের মত জ্বর। প্রাসটেট গ্ল্যান্ড এবং আরো নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি বেশ কিছুদিন আগে পিজি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁকে যখন রাজশাহী পর্যন্ত নেয়া হল। দেখা গেল তাঁর শারীরিক অবস্থার ভয়ংকর রকম অবনতি ঘটেছে। অনেকে মনে করলেন তাঁকে নিয়ে আর টানা হেঁচড়া করা ঠিক হবে না। একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে। সকলের মধ্যে একটা দোদুল্যমান মনোভাব দেখা দিল। তাঁর শরীরের এই অবস্থা, তার ওপর তুমুল বৃষ্টি। এই ধরনের আবহাওয়ায় মাওলানাকে সীমানা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। তাই সকলে গড়িমসি করছিলেন।
মাওলানা সাহেবকে ব্যাপারটি জানানো হলে তিনি সেই প্রকান্ড হুঙ্কারটি ঝেড়ে দিলেন- ‘কি মনে কর মিঞা, তোমাগো শরীরে মানুষের রক্ত নি আছে! চল, সামনে চল।’
অতএব আবার লং মার্চ শুরু হল। যেতে যেতে যখন সীমান্তের নিকটবর্তী কানসাট গ্রামটিতে মিছিল এসে থামল মাওলানার অবস্থা তখন সঙ্গিন। এই অবস্থায় তাঁকে চারজন মানুষ কানসাট গ্রামের একমাত্র পাকাবাড়ি স্কুলটির দোতলায় তুলে মাইকের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। সেই বিশেষ সময়টিতে অনবরত প্রসাব নির্গত হয়ে তাঁর কাপড়চোপড় ভিজিয়ে দিচ্ছিল। অথচ এই ব্যাপারে তাঁর নিজের কোন বোধশোধ ছিল না। এরকম সংজ্ঞালুপ্ত অবস্থায় তিনি দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে কানসাটের জনসভাটিতে বজ্র কঠোর কন্ঠে গুরুগম্ভীর ভাষায় দেড় ঘন্টাব্যাপী জীবনের শেষ বক্তৃতাটি কিভাবে তাঁর পক্ষে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল, লং মার্চের অংশগ্রহণকারীরা এটাকে একটা আশ্চর্য ঘটনা বলে মনে করেন।
মাওলানা তাঁর বক্তৃতায় বলেন- ‘গঙ্গার পানি আমাদের ন্যায্য হিস্যা, এটা আমাদের প্রাকৃতিক অধিকার, এই অধিকার মানুষের একার নয়, পশু-পাখি, গাছপালা, কীটপতঙ্গ প্রাণবান সবকিছুর একান্ত জন্মগত অধিকার। যারা এই অধিকার হরণ করছে তারা প্রাণের বিরুদ্ধে জুলুম করছে। ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে এই অঞ্চলে প্রাণের বিকাশ প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিতে চাইছে। বাংলাদেশের প্রাণবান মানুষ এই জুলুম কিছুতেই মেনে নিতে পারে না এবং ভারত জুলুমবাজি করে শেষ পর্যন্ত কোনদিনই জয়যুক্ত হতে পারে না।’
মাওলানা দীর্ঘ বক্তৃতা যখন শেষ করছিলেন, আকাশ ভেঙে মুষলধারে বৃষ্টি নেমে এসেছিল। হঠাৎ করে তিনি শিশুর মত কেঁদে উঠে আকাশের দিকে হাত তুললেন ও বললেন, ‘আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের একটা বাঁচার পথ করে দেবেন।’
এই কথাগুলো যখন শুনলাম আমার মনের মধ্যে একটা প্রচন্ড তোলপাড় অনুভব করলাম। কেন যেন আমার মনে হতে থাকল, মাওলানা সাহেব আমার বাবা। শুধু আমার বাবা নয়, আমার দেশের সমস্ত প্রাণবান সত্তাসমূহের ধারক বাহক। ফারাক্কা লং মার্চ স্মৃতি উদ্যাপনের পোস্টারটিতে জীবনের অন্তিম ভাষণদানরত মাওলানার ছবিটি দেখে কেন জানি আমার তাঁকে মনে হতে থাকল, তিনি একজন জলদেবতা।

Disconnect