ফনেটিক ইউনিজয়
পথে পথে
‘সব হুজুর জানেন’
দীপংকর গৌতম

সন্ধ্যার ঠিক আগে বাবুবাজারের মূল রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম। সেতুর একটু আগে চোখে পড়ল বয়স্ক একজন দোকানিকে চারপাশে ঘিরে রয়েছে কয়েকটি শিশু, দু-তিনজন ক্রেতাও। সোনালি রঙের একটি বাটিতে ছোট একটি আংটি রেখে বাটির চার পাশে একটি লৌহদণ্ড বারবার ঘোরাচ্ছেন দোকানি। আর তাতেই বাটির ভেতরে থাকা আংটিটি নাচানাচি করছে। কৌতূহলী শিশুরা আংটির নাচন দেখতেই ভিড় করছে দোকানের সামনে। দু-একজন আগ্রহী ক্রেতাও ওই আংটির মাহাত্ম দর্শনে মত্ত। কেউ কেউ দাম-দরও করছেন।
‘অষ্টধাতুর আংটি’, ‘অষ্টধাতুর আংটি’ কিছুক্ষণ পরপর হাঁকছেন ওই আংটি বিক্রেতা। আরেকটু এগোতেই বললেন, ‘অষ্টধাতুর আংটি নেন, অষ্টধাতুর আংটি’। আংটি ভাগ্য বদল করবে কীভাবে জিজ্ঞেস করলে বললেন, ১০-১৫ দিন ব্যবহার করেই দেখেন, ভাগ্য বদল হয় কিনা। তার আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাতে চাইনি, তাই আলোচনা আর সামনের দিকে এগিয়ে নিলাম না। বরং জিজ্ঞেস করলাম, কী কী ধাতু আছে এ আংটিতে? সোনা, রুপা, পিতল, লোহা, সিসা, তামা- আরও কী কী যেন বলে গেলেন গড় গড় করে।
এত ধাতু পেলেন কোথায়- প্রশ্ন করলে উত্তর দিলেন, জোগাড় করছি আরকি। আর মিশিয়েছেন কীভাবে জিজ্ঞেস করলে বললেন, ‘একবার গলাই তারপর মিশাই। ঘইসা মাইজা, গুঁড়া-গুঁড়া কইরা মিশাই। ঝামেলা আছে ভাইজান।’
আরও নানা কথা বলছি। কিন্তু মনের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে, আংটি কেমনে ভাগ্য বদল করতে পারে সে কথা। মানুষের ভাগ্য কোনো ধাতুর ওপর নির্ভর করতে পারে না। যদিও মানুষের শরীরের মধ্যেই আছে অনেক ধাতু। তারপর খাবারের সাথে প্রতিদিন কত ধাতুই না শরীরে প্রবেশ করে, তার হিসাব নেই। কিন্তু তাই বলে ভাগ্য পরিবর্তনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
সাংবাদিক শুনে তিনি আমার সাথে কথা বলতে রাজি হন। তবে দূরে গিয়ে কথা বলতে হবে। আমি তাই করি। শুরু হয় গল্প, তার জীবনের। নাম মোসলেমউদ্দিন। বাড়ি শরীয়তপুর। মা-বাবার বড় ছেলে। গ্রামে জমি নিয়ে একবার কাইজা হয়। তিনি তখন জমিতে কাজ করেন। এর মধ্যে ব্যাপক গোলমাল শুরু। ঢাল-সড়কি নিয়ে দুই পক্ষ হাজির। আত্মীয়র দলে তিনি যোগ দেন। কিন্তু মারামারিতে বিপরীত পক্ষের একজন মারা যায়। মামলার আসামি হন তিনি। পুলিশি তৎপরতার ভয়ে চলে আসেন ঢাকা শহরে। প্রথমে ঝাল-মুড়ি বিক্রি করতেন। তাতে আয় তেমন হতো না। এর মধ্যে গ্রাম থেকে বউ-পোলাপানও চলে আসে। খরচের চাপ বাড়ে। পরে সবজি বিক্রি শুরু করেন। তাতে মোটামুটি ভালোই চলছিল মোসলেমউদ্দিনের। এর মধ্যে মামলা মীমাংসাও হয়ে যায়। কিন্তু ততদিনে ঢাকায় থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। আর ফিরতে চান না। এর মধ্যেই শাহ আলীর মাজারে যেতে শুরু করেছিলেন। এখানে একজন হুজুরের সাথে পরিচয় হয়। তিনি খুব বুজুর্গ ব্যক্তি। তার দেয়া আংটির সুনাম শুনে তিনি হুজুরের সাথে কাজ শুরু করেন। হুজুরের সহকারী থেকে এখন নিজেই ব্যবসা শুরু করেছেন। হুজুরের দোয়ায় ভালোই আছেন।
পাঁচ ছেলের দুজন মাদ্রাসায় পড়ান, বাকি তিনজন পড়ে। বললেন, ‘এ আংটিতে খালি ভাগ্যই বদলায় না, রোগবালাইও সারায়। ডায়রিয়া, কালাজ্বর, আমাশা, খিঁচুনি, বদনজর।’ আরও নানা রোগের কথা বলে চললেন। একেকটি আংটির দাম ৩০, ৫০, ৮০ টাকা। আবার এর চেয়ে বেশি দামেরও আছে, যেমন- ১০০, ১২০, ১৫০ টাকা। ‘মাল বুইঝা দাম। ধাতু বুইঝা কাম’- বললেন তিনি। দিনে ১০ থেকে ২০টা পর্যন্ত আংটি বিক্রি করতে পারেন। ভাগ্য ভালো হলে বেশিও হতে পারে।
আংটিতে ভাগ্য বদল হয় কিনা অথবা রোগবালাই সারে কিনা, সে প্রশ্ন করলে মোসলেমউদ্দিন নীরব থাকেন। এ নিয়ে বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুক্তি-তর্ক চলতে পারে। তাতে এসব টিকবে না। তবু দেশজুড়ে এ রকম হাজারো আংটি-মাদুলি বিক্রেতারা টিকে আছেন শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিতদের বিশ্বাসের মধ্যে। তাদের নিজেদের ভাগ্য বদলের জন্য যে অবিরাম জীবন সংগ্রাম, তা চলতেই থাকে। তাকে জিজ্ঞেস করি, আপনি যে ব্যবসা করছেন সেটা কতদিন?  উত্তর আসে ছয় বছর। আবার জিজ্ঞেস করি, মানুষ কি ঠকছে না এ ব্যবসায়? মানুষকে ঠকিয়ে ভালো থাকা যায়? কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলেন, সব হুজুর জানেন। তিনি শিখাইছেন, মালপত্র তিনি দেন। ভালো-মন্দও তিনি জানেন। বলে উদাস হয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকেন। আর তার উদাস দৃষ্টির মধ্যেই আমি হাঁটতে থাকি নিজের গন্তব্যে।

Disconnect