ফনেটিক ইউনিজয়
জীববৈচিত্র্য ধ্বংসকারী কয়লা ও আণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়

[চতুর্থ পর্ব]
রামপাল, বাঁশখালীসহ অন্যান্য কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে যেসব বিপর্যয় ঘটবে, সেগুলো হলো-
বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রায় ২০ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকায় জীববৈচিত্র্য ও প্রাণী সময়ের বিবর্তনে ধ্বংস হয়ে যাবে। গাছগাছালির বংশ বৃদ্ধি হ্রাস পাবে এবং ১০-১৫ বছরের মধ্যে মরুময় প্রক্রিয়া শুরু হবে। অ্যাসিড রেইনের (রাসায়নিক বৃষ্টি) উৎপত্তি হবে। ফলে সব ধরনের পশু-পাখি-প্রাণীর জীবন হুমকির সম্মুখীন হবে এবং তাদের প্রজননক্ষমতা ভয়ানক হ্রাস পাবে। চিংড়িসহ অন্যান্য মাছের সংখ্যা প্রচণ্ড হ্রাস পাবে এবং এ মাছ ভক্ষণে মানুষ ক্যান্সারসহ অন্যান্য দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হবে। জমির উর্বরতা প্রচণ্ড কমে যাবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এলাকায় অচিরেই গাছগাছালি উজাড় হয়ে যাবে। ফলে পরবর্তী সময়ে ঝড়, সুনামিতে মানুষের জীবন হানি ও সম্পদের বিনাশ ঘটবে। সব ধরনের ফসল, শাকসবজি, ফলফলারির উৎপাদন বৃদ্ধি হ্রাস পাবে। ফলে বেকারত্ব, দারিদ্র্য বৃদ্ধিসহ সমাজে নৈরাজ্য ও হতাশা সৃষ্টি হয়ে এক অস্থিতিশীল সমাজ গড়ে উঠবে। স্থানীয় ও বিদেশী পর্যটকদের এ এলাকায় ভ্রমণ কমে যাবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনজনিত কালো ধোঁয়া, H2O দ্বারা আবৃত থাকার ফলে ওই এলাকা সর্বদাই কালো মেঘ দ্বারা ঢাকা থাকবে। ওই স্থানে উৎপাদিত ঘাস যা গরু-ছাগলের মূল খাদ্য, তা বিষযুক্ত হওয়ার ফলে দুধের মান যেমন হ্রাস পাবে, তেমনি দুধের পরিমাণও অনেকাংশে কমে যাবে। ওইসব গরু-ছাগলের মাংস ভক্ষণে মানুষের নানা রকম অনিরাময়যোগ্য ব্যাধির সৃষ্টি হবে। উদগীরিত ‘সবুজবিনাশী গ্যাস’ (Green House Gas) যথা CH4, NOx এবং SO2 বায়ুমণ্ডলে সঞ্চিত হবে। ফলে জাতীয় আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্যে ব্যাপক পরিবর্তন হবে, যা জনগণের স্বাস্থ্য বিবেচনায় কিছুতেই কল্যাণকর ও শুভ নয়।    
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে যখন কয়লা পোড়ানো হবে, সেই কয়লা থেকে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম এবং এ থেকে আরও কিছু রেডিও অ্যাক্টিভ পদার্থ সৃষ্টি হয়। এগুলো পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষণ করে। যুক্তরাজ্যের একটি প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষকের একটি জরিপ থেকে জানা গেছে যে, এ দূষণ প্রক্রিয়া একই ক্ষমতার একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন (Nuclear Power Station) কেন্দ্র থেকে উদগত রেডিও অ্যাক্টিভ ম্যাটেরিয়ালের বর্জ্য থেকে ৪০ থেকে ৮১ গুণ। কাজেই মনুষ্য জীবন তো বটেই, এ এলাকার গাছগাছালিসহ নদীতে বসবাসকারী সমস্ত প্রাণিকুলের জন্য এ এক মারাত্মক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হবে। তাছাড়া যে বৃষ্টির পানি সেচ ও পানের জন্য ব্যবহৃত হতো, তা আর করা যাবে না। কারণ বায়ু বিষাক্ত হয়ে ওঠার ফলে বৃষ্টির পানি পানের ও সেচের জন্য উপর্যুক্ততা হারিয়ে ফেলবে। সেই সাথে কয়লা পরিবহনকারী যেসব ট্রাক ও রেল মানুষের বসবাসের এলাকা দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করবে, সেসব এলাকার লোকজন কয়লাবাহিত বর্জ্য দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে সার্বিক  স্থাপনার চারদিক থেকে শুরু করে ওই স্থানের শ্রমিকদেরও প্রচণ্ড স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটবে এবং নিয়মিত অসুস্থতায় ভুগতে থাকবে। সর্বোপরি কয়লা থেকে উদগত আর্সেনিক দ্বারা ভূমি-জলে আর্সেনিক দূষণ শুধু বৃদ্ধিই পাবে না, ত্বরান্বিতও হবে। এতে সবারই স্বাস্থ্যহানি ঘটবে এবং শিশুদের  শ্রবণশক্তি প্রচণ্ড হ্রাস পাবে।

বিকল্প ভাবনা
আমরা এরইে মধ্যে দেখেছি, উষ্ণতা বৃদ্ধিসহ অকালবন্যা, খরা, বন-বাদাড়-গাছগাছালি উজাড় হওয়াসহ প্রাণ-প্রকৃতি-জীববৈচিত্র্যবিনাশী ভয়ানক আবহাওয়ার তা-বে এ সুন্দর ধরণীতে এক মহপ্রলয় শুরু হয়ে গেছে। ক্যান্সার, হাঁপানি, অ্যাজমা, হ্রদরোগসহ আরও হাজারো রকমের অনিরাময়যোগ্য অসুখ-বিসুখে মানুষ এক ত্রিশঙ্কু অবস্থায় পতিত। সচেতন মানবপ্রেমী বিজ্ঞানী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, সমাজ বিশ্লেষকরা তত্ত্ব, তথ্য ও নানারকম উপাত্ত দিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দিয়েছেন, এ বিশে^র জন-জমি-জলা-জীববৈচিত্র্যকে যদি বাঁচাতে হয়, তাহলে দেরি না করে কয়লা আর আণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। সাথে সাথে এর বিকল্প বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যবস্থার পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হবে। সারা বিশ্বে মোট ২ লাখ ৪৪ হাজার ট্রিলিয়ন কিলোওয়াট আওয়ার ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে কয়লা থেকে উৎপাদন হচ্ছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ট্রিলিয়ন কিলোওয়াট আওয়ার ঘণ্টা, যা প্রায় মোট বিদ্যুতের ৬০% ভাগ আর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ৭ হাজার ৩৫০ ট্রিলিয়ন কিলোওয়াট আওয়ার ঘণ্টা, যা শতকরা হিসাবে দাঁড়ায় প্রায় ৩% ভাগ। এর মধ্যে বড় চার দেশ ভারত, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর অস্ট্রেলিয়া নিজেরাই তাবৎ বিশ্বে উৎপাদিত কয়লা বিদ্যুতের  ৭০-৭৫ ভাগ কয়লা আর পারমাণবিক বিদ্যুৎ  উৎপাদন করছে। এ বড় অর্থনীতির চারটি দেশ তার অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে এতদিন সাশ্রয়ী ও নির্ভরশীল বিবেচনায় কয়লা আর পারমাণবিক বিদ্যুৎ দিয়ে তাদের জাতীয় শিল্পকে এক অকল্পনীয় উচ্চতায় নিয়ে গিয়ে অর্থনীতির শক্ত ভিত গড়ে তুলেছে। একদিকে এ শক্ত ভিতের অর্থনীতি যেমন তর তর করে বেড়ে উঠেছে, বিনিময়ে বিশ্ব আর মানবতাকে হারাতে হয়েছে তার বৈচিত্র্য, শুদ্ধতা, আর জীবনমান। বিশ্ব হয়ে উঠেছে অসহনীয় উষ্ণ, বসবাসের অযোগ্য, নানারকম অনিরাময়যোগ্য রোগবালাইয়ের এক অফুরান ভাণ্ডার। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, এ চারটি দেশসহ প্রায় সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আজ অর্থনীতির সমস্ত ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বকে, মানবতাকে বাঁচানোর জন্য নিজ নিজ দেশে কয়লা আর পারমাণবিক বিদ্যুৎ বন্ধ করার মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এরই মধ্যে তারা এ বিষয়ে কার্যক্রমও শুরু করেছে। এর মধ্যে ভারত, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপিয়ান অন্যান্য অনেক দেশের মোট ৪ হাজর ৯০০ মেগওয়াটক্ষমতার ১৩৫টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও মোট ৪ হাজার ৩৩২ মেগওয়াটক্ষমতার তিনটি আণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে এবং ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে বছরে নির্দিষ্ট ক্ষমতার কয়লা আর পারমাণবিক বিদ্যুৎ বন্ধ করা হবে, যা ২০২৫-৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়া হবে। এসব দেশের শাসকেরা এটা করছে, কারণ তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন নন। এরা নিজ দেশেই থাকবেন সন্তানসন্ততিসহ। এদের ছেলেমেয়েরা নিজ দেশেই লেখাপড়া, চিকিৎসা করাবেন। তাই নিজ দেশ আর জনগনকে বাঁচাতে তারা এ পদক্ষেপ নিতে পেরেছেন। এজন্যই কয়লা আর আণবিক বিদ্যুৎ আজ সারা বিশ্ব থেকে ক্রমশ অপসৃত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের সরকার তা করছে না। বরং সারা বিশে^র উল্টো এখানে কয়লা আর আণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যেন পাল্লা দিয়ে নির্মিত হচ্ছে। কয়লা আর আণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সব মেগা প্রজেক্ট বাদ দিয়ে সাশ্রয়ী নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে দেশ ও জনগণ বাঁচবে, জল-জমি- জীববৈচিত্র্য বাঁচবে, তা যেমন ঠিক, কিন্তু তাতে  বিদেশী ব্যাংকে টাকা পাচারের, বিদেশে দ্বিতীয় বাড়ি, তৃতীয় বাড়ি নির্মাণের তো সুযোগ হবে না। এখন প্রশ্ন, যদি কয়লা আর আণবিক বিদ্যুৎ অপসৃত হয় তাহলে বিদ্যুৎ যে উন্নয়নের চাবিকাঠি সে বিদ্যুৎ আমরা পাব কোত্থেকে? সারা বিশ্ব সে উত্তরও খুঁজে পেয়েছে। আর তা হলো নবায়নযোগ্য বা স্বচ্ছ জ্বালানি। সুখের বিষয়, বাংলাদেশ প্রায় সব ধরনের নবায়নযোগ্য বা স্বচ্ছ জ্বালানি উৎসের এক বিশাল ভাণ্ডারে সমৃদ্ধ দেশ। কিন্তু আমরা সে পথে যাচ্ছি না দেশপ্রেম, নিষ্ঠা আর সততার অভাবে। এ ধরনের সরকার যদি আমরা খুঁজে পাই যাদের  দেশপ্রেম, নিষ্ঠা আর সততার কোনো রকম কমতি নেই, ভাবতে পারেন সেদিন থেকেই শুধু স্বচ্ছ জ্বালানিই নয়, প্রকৃত এক স্বয়ম্ভর শক্তিশালী নতুন বাংলাদেশ পেয়ে যাব। কিন্তু কে করবে সে কঠিন কাজ? (চলবে)

Disconnect