ফনেটিক ইউনিজয়
পথে পথে
‘বিশ্বের সবচেয়ে অপমানজনক কাজটি করি’
দীপংকর গৌতম

ফিলিপ মুর্মু। হামাগুড়ি দিয়ে ভিক্ষা করেন। বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর থানার রাঙ্গামাটিয়া গ্রামে। বাবা প্রাণতোষ মুর্মু আর মা রেবা মান্ডী। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে ফিলিপ সবার বড়। বাবা প্রাণতোষ মুর্মু সংসারের ভালো-মন্দ দেখা-শোনা করেন। পোলিও আক্রান্ত হয়ে শৈশব থেকেই হামাগুড়ি দিয়ে পথ চলতে হচ্ছে। তবু মনে অনেক জোর। বহুদূর পথপরিক্রমার ইচ্ছা। এখন ভিক্ষা করলেও হাল ছাড়েননি। অদম্য তার পথচলা। ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, পান্থপথ সিগন্যালের আশপাশেই দেখা মেলে তার। কথা বললে মন ভরে যায়। তার চিন্তার উচ্চতা দেখে অবাক হই, এরকম শিক্ষিত মানুষকে ভিক্ষা করতে হয়? শিক্ষিত মানুষ তিনি। হামাগুড়ি বা ওয়াকার নিয়ে পথ চললেও স্বপ্নবান এক মানুষ তিনি। স্বপ্ন দেখেন। রঙিন স্বপ্ন। ইচ্ছেটা তার আকাশ ছোঁয়ার। তবে জীবন চলার পথে বাধা পা দুটো। পোলিওকে সঙ্গী করেই পৃথিবীতে আগমন তার। উচ্চমাধ্যমিক পাস করেও চাকরি না পেয়ে ভিক্ষাবৃত্তিকেই শেষ পর্যন্ত পেশা হিসেবে নিয়েছেন।
ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করা ফিলিপ মুর্মু বলেন, যখন থেকে বুঝতে শিখি আমি আর দশজনের মতো না, আমার শৈশবহীন, উল্লাস ছাড়া দিন কাটাতে হবে আমৃত্যু, তখন থেকে বাবার অভাবের সংসারেও আমি পড়াশোনা করতে শুরু করি। রপ্ত করতে চেষ্টা করি বাংলার সঙ্গে হিন্দি ও ইংরেজি। বাবার মাঠের কাজের সঙ্গে যতটা পারতাম জোগান দিতাম। আবার পড়াশোনা করতাম। সাঁওতালপল্লীর স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে হাইস্কুলে ভর্তি হই। অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করি দিনবদলের প্রত্যাশা নিয়ে। ১৯৯৫ সালে গোমস্তাপুরের রহনপুর জনতা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ১৯৯৮ সালে রহনপুর ইউসুফ আলী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করি।
ফিলিপের গ্রামের বাড়িতে থাকা ছোট ভাই সুব্রত মুর্মু এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। আর একমাত্র ছোট বোন রেখা দশম শ্রেণিতে পড়ছে। তার ইচ্ছা ছিল গ্র্যাজুয়েশন করে একটা চাকরি করে সংসারের দায়িত্ব নেয়ার। বাবার বয়স বাড়ছে। এর পরে কাজও করতে পারবেন না। সব ভেবে ফিলিপ ১৯৮৯ সালে উন্নত চিকিৎসার আশা নিয়ে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসা নেন টানা চার বছর। এরপর কোনো উন্নতি না দেখে ফিরে যান নিজ গ্রামে। অভাবের সংসারে চিকিৎসা তো দূরের কথা, দীর্ঘদিন লড়াই করেছেন শুধু টিকে থাকার জন্য।
২০১৬ সালে কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসেন ফিলিপ। দীর্ঘদিন খুঁজে কোনো কাজ না পেয়ে অবশেষে বেছে নেন ভিক্ষাবৃত্তি। রাজধানীর ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার ও পান্থপথ এলাকায় ওয়াকার নিয়ে চলাফেরা করে ভিক্ষা করেন ফিলিপ। প্রতিদিন ভিক্ষা করে ৫০০-৬০০ টাকা পান। আর এ টাকা দিয়েই নিজের চলাফেরাসহ গ্রামে থাকা বাবা ও ভাই-বোনদের পড়াশোনার খরচ জোগান। এখন বসুন্ধরা সিটি এলাকার পান্থপথ সিগন্যালের পাশেই ফিলিপের ঠিকানা। সারা দিন ভিক্ষাবৃত্তির পর রাতে এখানেই শায়িত হন ফিলিপ।
ফিলিপের ভাষ্যমতে, অনেকেই তাকে সাহায্য-সহযোগিতার কথা বলেন। তবে পরে কেউই এগিয়ে আসেন না। চাকরির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর দরখাস্ত করেও কোনো লাভ হয়নি তার। সমানতালে বাংলা ও ইংরেজিতে কথা বলায় পারদর্শী ফিলিপ। ছোটবেলা থেকেই কখনও হামাগুড়ি দিয়ে, কখনও হাতে কিংবা পায়ে ভর করেই চলাফেরা করতেন। স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতে ঘুরে বেড়িয়েছেন বহু ডাক্তারের কাছে। অনেক টাকাও ব্যয় করেছেন। অবশেষে পোলিওমুক্ত হওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে এখন বেঁচে থাকার আশায় ছুটে চলছেন। ওয়াকার নিয়ে এত পথ চলা যায় না। ভিক্ষা করার মতো অপমানজনক আর কঠিন কাজ নেই। কতজনকে বললে একজন হয়তো দু’টাকা দিল, কেউ বকা দিল। সব সহ্য করার মতো কষ্ট নিয়ে ভিক্ষা করে বাঁচতে হয়। এটা যে কত অপমানজনক কাজ, তা পৃথিবীর কেউ জানে না। আমি বিশ্বের কষ্টময়, সেরা অপমানজনক কাজটি করি। ভাবতে লজ্জা লাগে, জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা আসে। তবুও আমাকে হারলে চলবে না।
ভিক্ষার টাকা জমিয়ে একটি হুইল চেয়ার কেনার অনেক দিনের শখ ফিলিপের। এ মারফতে কিছু টাকাও জমিয়েছিলেন। কয়েকদিন আগে এক মহৎ ব্যক্তি ফিলিপ মুর্মুকে একটি হুইল চেয়ার কিনে দেন। এখনও সেটিতে চলতে শুরু করেননি। কাল থেকে করবেন। তাতে কষ্ট একটু কম হবে হয়তো। কিন্তু ভিক্ষার পরিমাণ কমতে পারে। মানুষ ভাববে আয়েসি ভিখারি। ফিলিপ মুর্মু বলেন, পরিশ্রমের কাজ করার শক্তি নেই আমার। ভিক্ষা করতে আর মন চায় না। তবুও বাধ্য হয়েই করি। ছোটখাটো একটি কাজ পেলে ভিক্ষা করা ছেড়ে দেব। কিন্তু কেউ কি সদয় হয়ে একটা কাজ দেবেন? এ প্রশ্ন করে তিনি উত্তরের জন্য যেন অপেক্ষা করছিলেন। উত্তর জানা নেই বলেই আমি ততক্ষণে জনতার কাতারে মিশে যাই।

Disconnect