ফনেটিক ইউনিজয়
জীববৈচিত্র্য ধ্বংসকারী কয়লা ও আণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়

[শেষ পর্ব]
কি করতে হবে
আমরা এরই মধ্যে দেখেছি, এ বিশে^র জন-জমি-জলা-জীববৈচিত্র্যকে যদি বাঁচাতে হয়, তাহলে দেরি না করে কয়লা আর আণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ কীভাবে উৎপাদন করতে হবে, সে বিষয়ে সবার স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে এবং সেদিকে লক্ষ রেখেই কাজে অগ্রসর হতে হবে। বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারকে আয়ত্ত করতে হবে। বিশ্বে যেসব জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় সেগুলো হলো-
১) তরল জ্বালানি- ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল, ২) নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর, ৩) গ্যাস, ৪) কয়লা, ৫) সূর্যের তাপ ও আলো, ৬) পানিপ্রবাহ, ৭) বায়ুবেগ, ৮) বর্জ্য, ৯) সমুদ্রের ঢেউ।
উপরে বর্ণিত প্রতিটি জ্বালানির প্রাপ্যতায় বাংলাদেশ বিশ্বে ঈর্ষণীয় স্থানে অবস্থান করছে। কিন্তু তার পরও দেশপ্রেমহীনতা ও ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে আমরা আজ ‘রেন্টালের ঝালে, কয়লা আর আনবিকের তালে’ হাবুডুবু খাচ্ছি। বিশ্বে কয়লাভিত্তিক ও আণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে মোটামুটি শীর্ষে অবস্থানকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, চীন ও ভারত নিজেদের দেশ ও পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য এরই মধ্যে তাদের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে কয়লা গ্যাসীকরণ পদ্ধতিতে রূপান্তর কিংবা বন্ধ ও আণবিক কেন্দ্রগুলোকে বন্ধ করে দেয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করছে । পরিবেশ ও বায়ুদূষণকারী বর্জ্য কোনো দেশের সীমান্তে এসে থমকে দাঁড়াবে না। সীমানা পেরিয়ে সারা বিশ্বকেই দূষিত করবে। তাই যুক্তরাষ্ট্র, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত পৃথিবীকে দূষণের অপরাধে শুধু নিজেদের দেশের পরিবেশবাদীদের দ্বারাই নয়, সারা বিশ্বের পরিবেশবাদীদের তীব্র বিরোধিতার মুখে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন কর্মসূচি গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে ।
হিসাব করে দেখা গেছে, ‘কয়লা গ্যাসীকরণ পদ্ধতি’তে  একই কয়লা দিয়ে  প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় এবং আবিষ্কৃত কয়লার প্রায় শতভাগই ব্যবহার করা যায়। একই সাথে দক্ষ যন্ত্রপাতি ও গৃহস্থালি অ্যাপলায়েন্স ব্যবহার করার কর্মসূচি গ্রহণ করা হলে চাহিদাও বর্তমানের চেয়ে ৩৫-৪০ শতাংশ হ্রাস পাবে। বিশ্বে অনেক দেশেই তা প্রয়োগ করে আশাতীত ফল লাভ করেছে। ইউএনডিপির অর্থায়নে নরসিংদীর পলাশে ২০১৪ সালে বিএসটিআইয়ের একটি প্রকল্পে আমি পরামর্শক হিসেবে কাজ করে একটি চমৎকার ফলাফল পেয়েছিলাম। ব্যস ওই পর্যন্তই! বিশ্বে ভুক্তভোগী অনেক দেশই এরই মধ্যে পরিচ্ছন্ন (নবায়নযোগ্য) জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাসহ দক্ষ যন্ত্রপাতি ও গৃহস্থালি অ্যাপলায়েন্স ব্যবহার করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কেবল আমরাই পিছিয়ে আছি। অথচ বিশ্বে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেসব প্রাথমিক জ্বালানি মুখ্য উপাদান হিসেবে ভূমিকা রাখে, বাংলাদেশে তার সবগুলো শুধু অঢেলই নয়, অত্যন্ত উঁচুমানের।
পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বলতে যা বুঝায় অর্থাৎ জলবিদ্যুৎ, সূর্য, বায়ু, সমুদ্র ঢেউ ইত্যাদি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক দেশ হাজার হাজার মেগাওয়াট তৈরি করছে। আর বাংলাদেশে জল, সূর্য, বায়ু ও বর্জ্য এত অঢেল থাকা সত্ত্বেও আমরা মানবঘাতক জ্বালানি দিয়ে আজ বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি। এর দায়-দায়িত্ব কে নেবে? এ প্রবন্ধে  পরীক্ষামূলকভাবে সম্ভাবনাময়, নবায়নযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ গঠনের পদক্ষেপ নিতে জোর সুপারিশ করা হচ্ছে। টেকসই জ্বালানি (Sustainable Energy) ব্যবহারের স্বার্থে ও জ্বালানি নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে প্রতিটি জ্বালানি ব্যবহার করে সম্ভাব্য কী পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, তাতে কত ব্যয়, জ্বালানির মজুদ, চাহিদা,ওই জ্বালানি দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রাপ্তির ব্যাপ্তিকালের একটি তালিকা নিচে দেয়া হলো :
১. প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে ৫,০০০ মেগাওয়াট, যার নির্মাণ ব্যয় ২৫,০০০ কোটি টাকা। বার্ষিক চাহিদা ৩৫,০০০ কোটি ঘনফুট।
২. বায়ু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে ৫,০০০ মেগাওয়াট, যার নির্মাণ ব্যয় ২৫,০০০ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বায়ুর গতির প্র্রয়োজন ৩.২মিটার/সেকেন্ড, যা আমাদের ৪.৫মিটার/সেকেন্ড।
৩. সূর্যরশ্মি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে ১০,০০০ মেগাওয়াট, যার নির্মাণ ব্যয় ৮০,০০০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশে সূর্যরশ্মির বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৬.৪ বিদ্যুৎ ইউনিট/বর্গমিটার। বিশ্বের গড় ৪.৪ বিদ্যুৎ ইউনিট/বর্গমিটার।
৪. বায়োমাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে ১০,০০০ মেগাওয়াট, যার নির্মাণ ব্যয় ৮০,০০০০ কোটি টাকা। যে দেশে জনসংখ্যা বেশি সেখানে বর্জ্যও বেশি উদগীরিত হয়।
৫. নদীস্রোত থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে ১০,০০০ মেগাওয়াট, যার নির্মাণ ব্যয় ৫০,০০০ কোটি টাকা। আমাদের ২৪,০০০ কিলোমিটার জলপথকে সংরক্ষণ করতে পারলে সবচেয়ে সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নদীর স্বাভাবিক স্রোত থেকে পাওয়া যাবে। নদীতে ড্যাম বা বাঁধ দিয়ে নয়।
৬. সাগরের ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে ১,০০০ মেগাওয়াট, যার নির্মাণ ব্যয় ৫০০,০০০ কোটি টাকা। আমাদের ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের শক্তিমত্তাকে ব্যবহার করার কৌশল আজ বহুল ব্যবহৃত।
সমগ্র চাহিদার যেমন আজই প্রয়োজন নেই, তেমনি সব অর্থও দীর্ঘ সময়ে প্রয়োজন হবে। কাজেই দীর্ঘ পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এ সংক্ষিপ্ত আলোচনায় কি আমরা বুঝতে পারছি না, সর্বনাশা প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে আন্দোলন না করে কোন পথে আমরা এগোচ্ছি? বাংলাদেশ অনেক সম্পদশালী দেশ। পৃথিবীর খুব কম দেশই খুঁজে পাওয়া যাবে, যে দেশে তার ভৌাগোলিক সীমানার মধ্যে এত সব সম্পদের সমারোহ ঘটে।  বাংলাদেশের প্রাপ্ত সম্পদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য  হলো, এ দেশে প্রাপ্ত সব সম্পদই অত্যন্ত উঁচুমানের। তবু অপশাসন ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে আমরা একটি সম্পদশালী দেশের নাগরিক হয়েও প্রচণ্ড দারিদ্র্যের মাঝে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছি। এ দেশের গণমানুষেরা অসম্ভব সৃজনশীল, পরিশ্রমী। সবকিছু মিলে বাংলাদেশ  একটি দারুণ সম্ভাবনাময় দেশ। কিন্ত যতই দিন যাচ্ছে দেশ বিনাশী, বায়ুদূষণকারী, সম্পদবিনাশী অচিন্তনীয়, অবাস্তব সব প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। আজকের সমাজসচেতন নাগরিকদের নিশ্চুপ অবহেলা, নির্লিপ্ততা ও আত্মকেন্দ্রিকতা এ দেশকে শুধু দরিদ্রই নয়, বসবাসের অনুপযোগীও করে তুলছে। সচেতন নাগরিকদের এমন নির্বোধ বিলম্ব একে ধ্বংসের কিনারায় এনে পৌঁছাবে এটা নিশ্চিত।

Disconnect