ফনেটিক ইউনিজয়
খাটনির মডেলিং করি কিন্তু টাকা পাই হাতেগোনা

‘মডেল’ শব্দটা শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে কোনো স্বপ্ন মানুষ বা কোনো এক স্বপ্নচারী রূপবতী; যাকে দেখলে যে কেউ চমকে যাবে, এটাই নিয়ম। কিন্তু চারুকলার মডেলরা স্বপ্ন জগতের কেউ না, দেখতেও অপরূপা নয়। এসব মডেলের শারীরিক সৌন্দর্যের বিষয়টি বিবেচনার নয়। ফ্যাশনসচেতনও নন তারা। আছে ক্লান্তিময় চেহারা,  ক্ষুধার্ত চোখ, রোগা দেহ। তাদের চলার পথ আমাদের মতো অত সহজ স্বাভাবিকও নয়। ক্ষুধা, দরিদ্রতা, অপ্রাপ্তি তাদের নিত্যসঙ্গী। মডেল বললেও তাদের এ পরিচিতি শুধু চারুকলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চারুকলার শিক্ষানবিশদের চাহিদামতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থির অবস্থায় থেকে পোজ বা ভঙ্গিমা সরবরাহ করাই তাদের কাজ। খুর্শেদ, পাগলা, ফাতেমা বেগম (বড়), ফাতেমা বেগম (ছোট), আব্দুল হাই প্রমুখ চারু মডেল হিসেবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। দাদু বা খালা হয়েই এরা জীবন পার করে দেয়। কেউ কেউ তুই-তোকারিও করে। সবই চারুকলার ছাত্ররা ভালোবাসা থেকেই করে।
কিন্তু তাদের অন্তর্গত জীবন কেমন? সেটিও যে খুব বর্ণাঢ্য তা কিন্তু নয়। যাদের মডেল সাজিয়ে দেশবরেণ্য শিল্পীরা সুনাম-সুখ্যাতি অর্জন করেন, দেশ-বিদেশে পাড়ি জমান, বড় অংকের টাকায় একেকটি ছবি বিক্রি করেন, তাদের জীবনের খোঁজ রাখে না কেউ। বেশ-ভূষা, স্বাস্থ্যের গড়ন দেখলেই বোঝা যায়, তারা কেমন আছেন? তবে কেউ এসব নিয়ে কথা বলতে চান না। ভাবেন- কোনো কথা শিল্পীর বিপক্ষে গেলে চাকরি হারিয়ে অকূল পাথারে ভাসতে হবে। তবে তারা সবাই যে কবি সুকান্তের ‘বাতিওয়ালা’, এটা সহজেই অনুমেয়। বাতিওলারা সবখানে বাতি জ্বালিয়ে আলোকিত করে, অথচ নিজের ঘরে জমে থাকে দুঃসহ অন্ধকার। কথা হয় কয়েকজন মডেলের সঙ্গে-

ফাতেমা বেগম
বয়স ৫৫। গ্রামের বাড়ি জামালপুর। আজ থেকে ২০ বছর আগে ১৯৯৫ সালে স্বামীর খোঁজ নিতে এসেছিলেন এই চারুকলায়। স্বামী ছিলেন হাশেম স্যারের (শিল্পী হাশেম খান) গাড়ির ড্রাইভার। হঠাৎ করে স্বামী বাড়িতে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেয়। একসময় বাড়ির সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে। খোঁজ নিতে এসে জানতে পারেন, তার স্বামী অন্যত্র বিয়ে করে নতুন সংসার করেছে। হাশেম স্যারের ড্রাইভারের চাকরিটাও ছেড়ে চলে গেছে। এ কথা শুনে ফাতেমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ফিরে গিয়ে নিজ বাড়িতেও ওঠার সুযোগ ছিল না। তারপর হাশেম স্যারের পরামর্শেই চারুকলায় শুরু করেন মডেলিংয়ের কাজ। আজও প্রতিদিন সকাল ৯টায় চারুকলায় আসেন, বিকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করেন কখন ডাক পড়ে। শুরুতে প্রতি সেশনে ১০০-২০০ টাকা দিত। এখনও সম্মানীর টাকার অংক আর বাড়েনি। এর বাইরে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের থেকে কিছু দেয়। মডেল হয়ে যে টাকা পান, তা দিয়েই সংসারটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন ফাতেমা। এখন বয়স হয়েছে। ১/২ ঘণ্টা এক ভঙ্গিমায় স্থির পোজ দিতেও কষ্ট হয়।
তার ছবি এঁকে অনেকেই পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু পুরস্কার পাওয়ার পর কেউ ধন্যবাদটুকুও জানাতে আসেননি। ফাতেমা চারুকলার বাইরে গুলশান, বনানীতে বাসায় গিয়েও মডেল হওয়ার কাজ করেছেন। কিন্তু তার টানাহেঁচড়ার জীবনের আর পরিবর্তন হলো না। ফাতেমা বলেন, ‘এতদিন কাজ করতে করতে চারুকলা আর কাজের প্রতি একটা মায়া তৈরি হয়ে গেছে। এ কারণে ছাড়তেও পারছি না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি আমাদের দিকে নজর দিত, তাহলে বাকি জীবনটা একটু ভালোভাবে কাটাতে পারতাম।’ এ কথা বলেই ডুকরে কেঁদে ওঠেন। ফাতেমা বলেন, ‘এই যে কত মানুষ তাদের নিজেদের ছবি এঁকে দিলে নাকি খুব খুশি হয়। কিন্তু আমরা তো খুশি হতে পারি না।’

ছোট ফাতেমা
জীবনের অংকের কত রকম হিসাব-নিকাশ! আমাদের প্রচলিত সমাজে যারা গ্ল্যামার মডেল হয়ে থাকেন, অল্প সময়েই আর্থিক সচ্ছলতার কোনো কমতি থাকে না। থাকে অগণিত ফ্যান-ফলোয়ার। অথচ চারুশিল্পের মডেল হয়ে বেঁচে থাকার জন্য কিনা ফাতেমার নিজের বিয়েটাই ভেঙে গিয়েছিল। স্বামী তাকে নাকি এই বাজারি কাজ করার অনুমতি দিত না। অথচ নিতান্ত পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে বা সহজ ভাষায় বলতে গেলে বেঁচে থাকার তাগিদেই ছোট ফাতেমা বেছে নিয়েছিল জীবনের এই পথ। এ গল্পের নায়িকার নামও ফাতেমা। সবাই চারুকলায় তাকে ছোট ফাতেমাই ডাকেন। অধ্যাপক জামাল উদ্দিন আহমেদই মূলত এই ছোট ফাতেমার আবিষ্কারক। ফাতেমা বলেন, ‘জামাল স্যার আমার বাবার মতো। তিনিই আমার পরে বিয়ে দেন।’
কিন্তু এই যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে বসে থাকার কাজটা কেমন লাগে? উত্তরে ফাতেমা বলেন, ‘জানি না ভালো কি মন্দ। আর জেনেই বা কি লাভ। তয় বড় বড় মডেলরা শুনি সামান্য ক্যামেরার সামনে দাঁড়াইলেই হাজার হাজার টাকা পায়। তাই আমি একদিন এক আর্টিস্টকে বলছিলাম, এই রঙ-তুলি ছাইড়া ক্যামেরা কিনে আনেন। ওই মডেলিংয়ে অনেক টাকা। আমার কথা আর্টিস্ট হেসেই উড়ায়ে দিল। কইল, তখন তো আর আমায় নাকি ক্যামেরার মডেল হিসেবে রাখবে না। কি নিষ্ঠুর নিয়ম বলেন। আমরা এত খাটনির মডেলিং করি, কিন্তু টাকা পাই হাতেগোনা। অথচ! এ কথা বলেই চুপ হয়ে যান। দারিদ্র্যের লজ্জা তখন ফাতেমাকে ঘিরে। গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডে যে একেবারেই কাজ করেননি তা নন, পারসোনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পত্রিকার ফটোশুটে মেকআপের আস্তরণ লাগিয়ে মডেল সেজেছেন বেশ ক’বার। এমনকি গৌতম ঘোষের ‘মনের মানুষ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করেছেন। কিন্তু ওই যে দারিদ্র্যকে বেঁচেই তো ছোট ফাতেমার জয়জয়কার। তাই দারিদ্র্য আর হাহাকারের মলিন মুখে দীর্ঘ ক’ঘণ্টা বসে থাকা জীবনেই আটকে রইল সব।

আব্দুল হাই, বয়স ৬৫
বাড়ি বিক্রমপুর। ১৪ বছর আগে তৌফিক স্যার (আব্দুস সাত্তার তৌফিক) তাকে চারুকলায় নিয়ে এসেছিলেন। আগে লেবারের কাজ করতেন। ২০০০ সালের বন্যায় বাড়িঘর নদীতে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। সব হারিয়ে বউ-বাচ্চা নিয়ে কাজের সন্ধানে চলে এলেন ঢাকায়। বন্ধু কামালের সাথে কাজের সন্ধান করতেই চারুকলার তৌফিক স্যার তাদের দুজনকে ডেকে মডেল হওয়ার অনুরোধ করেন। সেই মডেল হওয়া কী বিষয়, কিছুই জানতেন না। পরে জানলেন, বসে থাকলেই কিছু পয়সা আসবে। আব্দুল হাই খানিক দীর্ঘশ্বাস নিয়েই বলেন, ‘ওই ২ ঘণ্টার জন্যই সময় বেচি আরকি। নিজের দুই ঘণ্টা বন্দি জীবনের মূল্য ২০০ টাকা।’ খুব অবলীলায় এমন এক কঠিন দর্শন বলার সময় মডেল আব্দুল হাইয়ের চোখ ভারী দেখা গেল। জীর্ণ শরীরে খুব বেশি শক্তি নেই। অথচ অবাক করার মতো হলেও সত্যি, সেই কামরাঙ্গীচর থেকে ২ ঘণ্টা হেঁটে চারুকলায় এসে ২ ঘণ্টা বসে থাকলে মেলে মাত্র ২০০ টাকা। নিজের চোখের সামনেই তার জীর্ণ মুখের ভাস্কর্য তৈরি হয় অগণিত। অথচ আব্দুল হাই সেই ভাস্কর্য দেখে হয়তো মলিন মুখে ভাবতে থাকেন, আজ কি থালায় ভাত উঠবে? তরকারি কি কিনতে পারবেন? আজ কি আরেকটা কাজ পাওয়া যাবে। দিনের আরও খানিক সময় তো রয়ে গেছে। কেউ কি কিনবে আরও ২ ঘণ্টা?
খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী, চারুকলার অধ্যাপক জামাল স্যার মডেলদের আশ্রয় বললেও অত্যুক্তি হবে না। তিনি বলেন, চাহিদা অনুযায়ী আমরা মডেল পাচ্ছি না। এর অবশ্য কিছু যৌক্তিক কারণও আছে। আমরা তাদের তেমন আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দিতে পারি না। যারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন, তারা কোথাও সুবিধা করতে পারছেন না বলে যেতেও পারছে না। আমরা মডেল বৃদ্ধি ও তাদের নিয়মিত করার ব্যাপারে সিরিয়াসলি ভাবছি, দেখি কী করা যায়। চারুকলার অধ্যাপক মো. ফারুক আহমেদ মোল্লা বলেন, আমি ফাতেমার ছেলেকে এনে চাকরি দিয়েছি। যাদের সাহায্য করার মানসিকতা আছে তারা করে।
‘মডেল ফাতেমাকে নিয়ে অনেক কাজ করেছি। তাকে নিয়ে আঁকা একটি ছবি পুরস্কৃতও হয়েছে। এ ছবির ক্ষেত্রেও ফাতেমার দারিদ্র্যের ছাপটাকেই উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি’Ñ বলেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী জামাল আহমেদ। তার পরও কথা থেকে যায়। এই মডেলদের নিয়মিত করা হলে তাদের সংকট থাকত না। ছাত্র থেকে অনেকেই শিক্ষক বা পরিচালক হয়েছেন, কিন্তু মডেলদের ভাগ্যোন্নয়ন হয়নি আজও।

Disconnect