ফনেটিক ইউনিজয়
শুভ জন্মদিন
আহমদ ছফার ট্রাউয়ারস্পিয়েল

কার সাধ্য আমাকে ঠেকায়?
আমার সাধনায় ফুল ধরছে, ফল ফলছে।
-আহমদ ছফা (২০১০: ১৬৫)

জীবনের একপ্রান্তে পৌঁছিয়া আহমদ ছফা ‘লেনিন ঘুমাবে এবার’ (১৯৯৯) নামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করিয়াছিলেন। পরের বছর প্রকাশিত ‘আহমদ ছফার কবিতা’ নামধেয় সংকলনটি যদি আমলে না আনি তো বলিতে হইবে ‘লেনিন ঘুমাবে এবার’ আহমদ ছফার সর্বশেষ কবিতার বই। এই বইয়ে ‘কবি ও সম্রাট’ নামে একটি কবিতা আছে। আজিকার এই নিবন্ধে এই কবিতাটি প্রসঙ্গে দুইটি কথা বলিতে চাই।
তাহার আগে কবিতা প্রসঙ্গে আহমদ ছফার একটি কৈফিয়ত শুনিয়া লইব। ‘আহমদ ছফার কবিতা’ নামক সংকলনের ভূমিকা উপলক্ষে তিনি একটা জিজ্ঞাসা পেশ করিয়াছিলেন, ‘জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমি যখন নিজেকে প্রশ্ন করি- আমি কি কবি? আমি কি উপন্যাস লেখক, প্রবন্ধকার, ছোটগল্প লেখক অথবা অনুবাদক কিংবা শিশু সাহিত্যিক?’ এই জিজ্ঞাসার যে উত্তর তিনি দিয়াছিলেন তাহাও শুনিবার মতো: ‘আমার পক্ষে কোন কিছুই হয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। একটা গভীর অতৃপ্তিবোধ এবং দহনবেদনা আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।’ আহমদ ছফার এই উত্তরের মধ্যে সৌজন্যের প্রকাশ শতকরা একশ ভাগ আছে। তারপরও মনে হয় সৌজন্যই শেষ কথা নয়। অবশ্য অধিক কিছু আছে কিনা সে কথা বলা অপরের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। ‘লেনিন ঘুমাবে এবার’ বইয়ে ‘কবিতার দোকান’ নামে একটি কবিতাও আছে। ঐ কবিতাটি শেষ হইয়াছে একটি চরণে: ‘আমার সাধনায় ফুল ধরছে, ফল ফলছে।’ আমার ধারণা ‘কবি ও সম্রাট’ কবিতাটিকে এই সাধনার ফুল কিংবা ফলজ্ঞানে গ্রহণ করার সুযোগও আছে।


বাংলাদেশে এই মুহূর্তে যাঁহারা কবিতায় প্রতিপত্তি লাভ ও প্রভাব বিস্তার করিয়াছেন তাঁহারা আহমদ ছফার সাধনাকে মোটের ওপর অগ্রাহ্য করিতে না পারিলেও তাঁহার কবিতা মোটেই গ্রাহ্য করেন নাই। সে স্বাধীনতা তাঁহাদের অবশ্যই আছে। কিন্তু এ দেশের যে সকল মানুষ মনে করেন আহমদ ছফার সাধনাকে অস্বীকার করা মানে এই জাতির সংস্কৃতির সহিত বিশ্বাসঘাতকতা আমিও তাহাদের মধ্যেই পড়ি। কথাটা সরাসরিই জিজ্ঞাসা করিতে চাই: আহমদ ছফাকে কি কবি  পরিচয়েও অস্বীকার করা যায়? জিজ্ঞাসাটির উত্তর তিনি নিজে দিয়াছেন এইভাবে : ‘কবিতা দিয়েই আমার লেখালেখির শুরু। কিন্তু অনবচ্ছিন্নভাবে কবিতা লেখার অভ্যাসটি আমার দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। কৈফিয়তস্বরূপ আমি একটা কথাই বলতে পারি, জীবনের দায় কবিতার দায়ের চাইতে অনেক বেশি নিষ্ঠুর। শুধু কবিতা নয়, সে সমস্ত রচনাকে সাহিত্যপদবাচ্য লেখা হিশেবে অনায়াসে চিহ্নিত করা সম্ভব তার বাইরেও অনেক ধরনের লেখা আমার কলম থেকে জন্ম নিয়েছে। কখনো সামাজিক দায়িত্ববোধের তাগিদ, কখনো একটি নতুন বিষয়ের প্রতি অধিকার প্রসারিত করার প্রয়াস কিংবা কখনো ভেতরের তাপচাপের কারণে নতুন নতুন বিষয়ের ওপর আমাকে মনোনিবেশ করতে হয়েছে।’
একটা কথাও এখানে অসত্য বলেন নাই আহমদ ছফা। প্রমাণ তাঁহার ‘কবি ও সম্রাট’ নামক কবিতা বা কাব্যনাটিকা। এই কবিতাটির বিষয়বস্তু সামান্যই- দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের অষ্টাদশ শতাব্দীর সংকট। দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের ইতিহাসে ইংরেজি অষ্টাদশ শতাব্দী সচরাচর একটি ক্রান্তিকাল বলিয়া গণ্য হয়। একদা ইতিহাস ব্যবসায়ী ও অন্যান্য বৃত্তিধারী পণ্ডিতেরা বলিতেন এই শতাব্দীটা ছিল মোগল সাম্রাজ্যের পতনের যুগ। কিছুদিন হইল পণ্ডিতদের মতও বদলাইতেছে। অনেকেই বলিতেছেন, এই যুগটা তো নিতান্ত পতনের যুগ ছিল না, ভারতবর্ষের নানান দিকে তখন নতুন নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের অঙ্কুরও গজাইয়া উঠিতেছিল। নতুন নতুন রাষ্ট্র গড়িয়া ওঠার একটা তাৎপর্য তো ইহাও হইতে পারে যে এই মহাদেশে নতুন নতুন জাতিও তখন গড়িয়া উঠিতেছিল।
কিন্তু মানুষ যাহা ভাবে বিধাতা তাহা নাও তো করিতে পারেন। সকলেই জানেন, অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ এই দুই শতাব্দীতেই আমাদের এই মহাদেশ জাতীয় স্বাধীনতা পুরাপুরি হারাইয়াছিল। ভারতবর্ষের নানান প্রান্তে নানান জাতি গড়িয়া উঠিবার পথে সেদিন প্রতিবন্ধকতা হইয়া দাঁড়াইয়াছিল এয়ুরোপিয় নানা জাতির হাতে- শেষ বিচারে ইংরেজ জাতির কামানের আঘাতে- এই মহাদেশের সকল জাতির পরাজয়। এই পরাজিতদের মধ্যে প্রধান বলিয়া যে শক্তিকে গণনা করা হয় তাহার পরিচয় সে যুগের অবনতিশীল মোগল সাম্রাজ্য। একটা কথা ভুলিয়া গেলে চলে না। খোদ মোগল সাম্রাজ্যের গর্ভেই সেদিন জাগিয়া উঠিতেছিল নতুন নতুন ভারতীয় জাতীয়তাবাদ। এই ঘটনারই একটা আলামত ছিল খোদ মোগল রাজদরবারের ভাষা     ফারসির জায়গায় উত্তর ভারতের সর্বত্র উর্দু কিংবা যাহাকে বলে বা হিন্দুস্তানি ভাষা তাহার বিকাশ।
এই নিবন্ধের অল্প জায়গার মধ্যে এই বিষয়টির উপর পূর্ণ সুবিচার করা যাইবে না। তবে যে বিষয়টি জানা না থাকিলে আহমদ ছফার কবিতাটির মূল্য নিরূপণ করা কঠিন তাহা এই রকম। ‘কবি ও সম্রাট’ কবিতার নায়ক দুইজন : একনায়ক অবনতিশীল দিল্লি সাম্রাজ্যের সম্রাট আর অন্যজনের নাম সে যুগের শ্রেষ্ঠ কবি মোহাম্মদ তকি মির- যিনি শুধুমাত্র ‘মির’ নামেই অধিক পরিচিত। এই মিরের নাম ধরিয়াই পরের যুগের কবি মির্জা আসাদুল্লাহ খান ওরফে গালিব একদা লিখিয়াছিলেন, ‘গালিব, উর্দু কবিতার একমাত্র ওস্তাদ তুমি নও, লোকে বলে আগের জমানায় মির বলিয়া একজনও ছিল কিন্তু।’ [রেখতা কে তুমহি উস্তাদ নাহি হো গালিব, কেহতে হ্যায় আগলে জমানে মে কোই মির বিহ্ থা]
আহমদ ছফার কবিতার ঘটনাটি- আগেই বলিয়াছি সামান্য। দরবারের রাজনীতি ও কবির হেনস্তা। এই ঘটনা অসামান্য হইয়া ওঠে যখন আমরা তাহাকে ইতিহাসের দীঘল পটভূমিতে দেখিতে পারি। মির তকি মিরকে সম্রাট দরবারে ডাকাইয়া আনিয়াছেন। তাঁহার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। এই সকল অভিযোগের মধ্যে আছে গঞ্জিকাসেবন হইতে শুরু করিয়া যুবকের ধর্মকর্মে মতিহরণ পর্যন্ত। অভিযোগের ফিরিস্তি অনুসারে এমনকি কুমারীর সতীত্বনাশের কারণও তাঁহার কবিতায় পাওয়া যায়। খোদ সম্রাট তাহার কিছু উচ্চারণ করিতে কসুর করেন নাই:
 অহরহ গাঁজাচণ্ডু খাও, শরাব
খানায় করো নরক গুলজার, রেণ্ডিবাড়ি করো
তুমি নিত্য গতায়াত। সবচেয়ে আপত্তির প্রত্যহ দিচ্ছ
ছেড়ে লাউডগা সাপের মতো অবাধ্য কবিতা।
হৃদয়ের বোঁটা ধরে টান দেয় এ রকম ফলাযুক্ত তীর।
তোমার শব্দের বিষ, উপমাঝঙ্কার কেড়ে নিচ্ছে
যুবকের ধর্মকর্মে মতি। নারীরা নিষিদ্ধ চিজ
বেশি ভালবাসে, তাই সবাই আশঙ্কা করে
তাবত শরিফগৃহে অগ্নিকাণ্ড হবে।
ইতিহাসে যে কবি মির (১৭২২-১৮১০) তকি মির নামে পরিচিত তাঁহার সহিত আহমদ ছফা (১৯৪৩-২০০১) নিজেকে একসারিতে দাঁড় করাইয়া দেখিতেছেন কিনা সে প্রশ্ন আমার মনে জাগিয়াছে। কথাটা আরও একভাবে ভাবা যায়- অষ্টাদশ শতাব্দীর দক্ষিণ এশিয়ার সহিত বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের সংকটকে কোন এক জায়গায় তিনি হয়তো তুলনা করিতেছেন। পাঠিকা এই প্রশ্নটাকেই আমার প্রথম প্রস্তাব বলিয়া ধরিয়া লইতে পারিবেন। আমার প্রস্তাব ‘কবি ও সম্রাট’ একটি রূপক কবিতা যেখানে আহমদ ছফা একটি পতনোন্মুখ সাম্রাজ্যের মুখোমুখি একটি উদয়নরত নতুন রাষ্ট্রের সম্ভাব্য নৈতিক ভিত্তির অনুসন্ধান করিয়াছেন।


আমার দ্বিতীয় প্রস্তাব, এই কবিতায় আধুনিক কবিতার গর্ভসঞ্চারের সকল লক্ষণ হাজির আছে। আধুনিক নায়কের নিয়তি স্বর্গের দেবতারা পূর্ব হইতে নিরূপণ করিয়া রাখেন নাই। এই নিয়তির গ্রষ্টা একালের ইতিহাস নিজেই। এই নিয়তির নামই জার্মান ভাষার পণ্ডিতেরা রাখিয়াছিলেন ট্রাউয়ারস্পিয়েল (Trauerspiel)। এই কবিতার একমাত্র নায়ক কবি নহেন, সম্রাটও সমান নায়ক মর্যাদার দাবিদার। সমজদার পাঠিকা দেখিবেন, আহমদ ছফার সম্রাট কোনদিকেই কবির চেয়ে কম নহেন। সম্রাটের দ্বিতীয় অভিযোগেই তাহার প্রমাণ মিলিতেছে:
মির তকি মির, তুমি কবি
আশা করি অনুভবে বুঝে নিতে পারো।
তোমার তাবত কালো জ্বলে ওঠে আরো কালো হয়ে
উচ্চারিত কথার আলোকে। নারী ও পুরুষের
মনের গোপন ঘরে যেই সব বিস্ফোরক দাহ্যবস্তু থাকে
চকিতে চকমকি ঠুকে লাগাও আগুন
যার তেজে আনন্দে কুমারী করে সতীত্বকে খুন।
তুমি স্থির হয়ে একদণ্ড থাক না কোথাও।
নগরে বন্দরে তুলে তীব্র সংবেদন ছুটে যাও
দেশ থেকে দেশান্তরে অশান্ত ঘূর্ণির মতো
যেন এক জ্যান্ত মহামারি।
সম্রাটের আরো অভিযোগ আছে। তাহাদের মধ্যে আছে ধর্ম-ব্যবসায়ীদের তাপ ও চাপ দুইটাই। এখানে রাষ্ট্রের অন্তর্গত সংঘাতের কথাই সম্রাটের উদ্বেগ আকারে হাজির হইয়াছে। সম্রাটের ইচ্ছাই সার্বভৌম-কথাটা প্রকৃত প্রস্তাবে কথার কথামাত্র বলিয়া প্রমাণিত হইতেছে। খোদ সম্রাট বলিতেছেন:
ভেবে দেখো, আমাকে ফেলেছো তুমি কেমন মুশকিলে!
মোল্লারা তোমার নামে জুড়েছে চিৎকার,
কাটামুণ্ডু দাবি করে, তা নইলে ধর্ম নাকি
যাবে রসাতলে। সবকটা ধর্মস্থানে
বর্শার ফলার মতো ধারালো চকচকে প্রতিবাদ
উঠছে জেগে। সবাই সম্রাটের কাছে চায়
যোগ্য প্রতিকার- প্রজাদের ধর্মরক্ষা সম্রাটের
কাজ, অতয়েব সব দায় সম্রাটে বর্তায়।
এই সকল অভিযোগ সত্ত্বেও সম্রাট শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেন তিনি নিজেও মির তকি মিরের একজন ভক্ত পাঠক। তিনি কবির কল্যাণই কামনা করেন। সর্বোপরি কামনা করেন নিজের সাম্রাজ্যের স্থিতিও। তাই শাস্তির পরিবর্তে কবিকে একটি পুরস্কারই দিতে চাহিলেন তিনি। বলিলেন:
মির তকি মির, অধিকন্তু বাক্যব্যয়
নেই প্রয়োজন। তোমাকে দাওয়াত করি
চলে এসো দরবারের শান্ত ছায়াতলে।
দরবারই প্রকৃষ্ট স্থান, সমস্ত গুণের ঘটে
সম্যক বিকাশ, পায় সমাদর। এই হিন্দুস্তানে
যেইখানে যত ক্ষমতার বিস্ফোরণ ঘটে-
ধর্মতত্ত্ব শিল্পকলা অথবা বিজ্ঞান-
সম্রাটের উৎস থেকে সমস্ত সম্ভবে।
এই আকস্মিক আমন্ত্রণে দরবারের কায়েমমোকাম রাজকবি, রাজকীয় ভাঁড় ও অন্যান্য লোকজন প্রমাদ গণিতে শুরু করেন। শুধুমাত্র তাঁহাদের ঈর্ষা ও চক্রান্তের কারণেই নহে, নিজের স্বভাববশতও কবি মির তকি মির রাজদরবারে সুস্থ বোধ করিতে পারেন না। তিনি রাজদরবারে যোগদানের এই সনির্বন্ধ অনুরোধ- এই রাজকীয় দাওয়াত- কবুল করিতে পারিলেন না। তাঁহার অস্বীকৃতির একটি কারণ এইভাবে বয়ান করিয়াছেন আহমদ ছফা:
আমি তো দেহাতি লোক
সবক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকি, এমন তৌফিক নেই
অক্ষমতা ঢাকি। বুলিতে মাটির গন্ধ, লেবাসে
মিসকিন, ভাঙ্গাচোরা মানুষের সঙ্গে কাটে দিন।
ঝলমলে দরবার কক্ষে যারা আসে যারা যায়
দিব্যকান্তি দিব্যদেহধারী, অশেষ আশিসপ্রাপ্ত
তেজবীর্য ঐশ্বর্যের অংশ অপহারী।
আমি তো সামান্য লোক ঘুরি পথেঘাটে
খুঁজে পাই আপনারে মানুষের হাটে।
যেন নবীন জান্নাতখ- বাদশাহর দরবার
ধূলিমাখা দুচরণস্পর্শে হবে কলঙ্কিত
রক্তবর্ণ গালিচার পাড়। মহামান্য বাদশাহ সালামত
ফিরে যাই নিজ বাসে- চাই এজাজত।
দিল্লীশ্বর মোগল সম্রাট কবিকে তারপরও ঢের বুঝাইয়া সুজাইয়া দেখিলেন, দরবারে আসিয়া আশ্রয় লইবার অনুরোধ করিতে থাকিলেন, কিন্তু কবি কিছুতেই সে অনুজ্ঞা রাখিবেন না। কবির জন্য রাজদরবারে মাথা গুঁজিয়া থাকাটা আত্মহত্যার শামিল। এই কবিতার মধ্যে বিধৃত শিল্প ও রাষ্ট্রের- কবির হৃদয়ধর্ম ও সম্রাটের রাজধর্মের অন্তর্গত বিরোধটি এই সত্যে ধরা পড়িয়াছে। এই বিরোধ কবির পক্ষে ধরা পড়িয়াছে দুই শব্দে। কবি কি চাহেন? স্বাধীনতা কিংবা নিরাপত্তা। সমস্যার মধ্যে একটাই: কবির জন্য নিরাপত্তার অপর নাম মৃত্যু। কবি যদি স্বাধীনতা চাহিবেন তো পাইবেন মৃত্যু, এই মৃত্যুর অপর নাম ‘নিরাপত্তা’। আর যদি তিনি চাহেন নিরাপত্তা, তাহা তো পাইবেনই। এই নিরাপত্তার অপর নাম তো-একটু আগেই বলিলাম- আর কিছু নয়, মৃত্যু। কবি বলেন:
সুখ নয় স্বর্গ নয় জগতপ্রাণের মাঝে ঢেলে দেবো প্রাণ।
আমি তো আমার নয়, নেপথ্যে অদৃশ্যশক্তি
আমারে চালায়, ক্ষিপ্রবেগে অর্ধেক অস্তিত্ব যেন
কেড়ে নিয়ে যায়। সম্রাট সংকটত্রাতা- সবিনয়ে
রাখি নিবেদন, সমীচীন নয় পিঞ্জিরায়
বন্দি করা কাননের পাখি।
মন্দভাগ্য কবির পক্ষে রাজদরবারের এহেন সনির্বন্ধ আমন্ত্রণ গ্রহণ করাটা কেন সম্ভব হইল না- সঙ্গত কারণেই এই প্রশ্ন জাগিতেছে। কবি নিজেই বলিতেছেন, ‘আমি তো আমার নয়, নেপথ্যে অদৃশ্যশক্তি আমারে চালায়’। এই অদৃশ্যশক্তিই কবিত্বের গোড়ার কথা। কবিত- সোজা কথায়- কবির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। মির তকি মিরের জবানে উত্তরটা এই রূপ ধরিয়াছে:
জাঁহাপনা, খোদাবন্দ বাদশাহ মেহেরবান
আমার জিন্দেগি হোক আপনার খেদমতে কুরবান।
সম্রাটের আমন্ত্রণ সম্মানের উত্তরীয় হয়ে
সর্বাঙ্গ আবৃত করে রয়েছে জড়িয়ে।
আমি হই তেমন এক মন্দভাগ্য লোক
শিরোপা সম্মান আর উচ্চতর মহত্ত্বগৌরব
যার হৃদয়ধর্মের কাছে মানে পরাভব। সম্বল
হৃদয়মাত্র, নিবেদন তাই টুটাফাটা প্রাণ নিয়ে
অভ্যস্ত জীবনে আমি ফিরে যেতে চাই।
কবি যাহা বলিয়াছেন তাহার সারনাম ‘হৃদয়ধর্ম’। আর এই হৃদয়ধর্মই কবিকে চালায়। সত্যের মধ্যে, এই হৃদয়ধর্ম কবির অপর- এক্ষণে তাহা পরমের রূপ ধরিয়াছে। ইহার জবাবে সম্রাট যাহা বলিয়াছেন তাহা অনেকটা জার্মান তত্ত্বকার হেগেলের কথার সহিত মিলিয়া যায়। গ্রিক পুরাকথার আলোকে ট্রাজেডি বলিতে যাহা বুঝাইত তাহা ছিল অনেকটা এই রকমই। যেখানে দুই প্রবল পরাক্রম পরস্পর মুখোমুখি, সেখানে দুই শক্তিকেই সমান বিক্রমশীল ধরিয়া লইতে হয় সেখানে সংঘাত অনিবার্য।      
সম্রাট বলিতেছেন কবির হৃদয়ধর্মের সহিত রাষ্ট্রের রাজধর্মের বিরোধ ক্ষমাহীন।
মির তকি মির, তোমার হৃদয়ধর্ম-
সম্রাটেরও রাজধর্ম আছে। দুই ধর্ম পরস্পর মুখোমুখি
পথে দাঁড়িয়েছে। সম্রাট হৃদয়ধনে ভাগ্যবান
নন, সম্রাটকে চালায় কানুন।

গ্রিক পুরাকথার নিরিখে যাহাকে আমরা ট্রাজেডি বলিয়া জানি তাহার একটা বিশিষ্ট গুণ আছে। সেখানে দেব- দেবতার লীলা বিরাজ করে। শুধুমাত্র বিরাজই করে না, তাঁহাদের হস্তক্ষেপে পৃথিবীচারী নরনারীর, নায়ক-নায়িকার দান উল্টাইয়া যায়। গ্রিক ট্রাজেডির নায়ক-নায়িকা- একপ্রকার বলা যাইতে পারে- তাঁহাদের যাহা কিছু আছে তাহা লইয়াই দেবতার বিধানের বিরুদ্ধে লড়াই করিয়া যায়। তাঁহারা ভাঙ্গিলেও ভাঙ্গিতে পারেন, কিন্তু কদাচ মচকাইতে চাহেন না। খোদ এয়দিপাস কিংবা তাঁহার কন্যা আন্তিগোনের কথাই ধরি না কেন। তাঁহারা ভাঙ্গিয়াছেন, কিন্তু মচকান নাই। এয়দিপাস যে তাঁহার পিতাকে খুন করিলেন, মাতাকে দয়িতাস্বরূপ কবুল করিলেন তাহা তো দেবতারাই ঠিক করিয়া রাখিয়াছিলেন। তিনি দণ্ড পাইয়াছেন, কিন্তু সে দণ্ড মাথা পাতিয়া লয়েন নাই। নিজে দোষী- একথা কদাচ কবুল করেন নাই।
একই কথা আন্তিগোনের বিষয়েও বলা যায়। আন্তিগোনে লড়িয়াছেন মাত্র একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়। তাঁহার লড়াই গোটা গ্রিক জাহানের বিধি-বিধানের বিরুদ্ধে। এতকাল ধরিয়া যে বিধিকে আমরা ‘নিয়তি’ (অর্থাৎ নিয়তি) বলিয়া আসিতেছি আন্তিগোনে-মাত্র একজন মানুষ- তাহাতে যতি বা ছেদ টানিয়াছেন। গ্রিক ট্রাজেডির এই বিশেষ গুণ অনুসারে মানুষ প্রয়োজনে দেবতার সম্মুখে দাঁড়ায়। সে ভাঙ্গে কিন্তু মচকায় না। এই নীতির নামই বাসনা। বাসনার মৃত্যু নাই। বাসনা পরম।
আধুনিক জমানার গোড়ায়- বিশেষ এয়ুরোপ মহাদেশে-ট্রাজেডির রূপান্তর ঘটিয়াছে। জন্মিয়াছে ‘ট্রাউয়ারস্পিয়েল’ বা ‘দুঃখের দিনের পালা’। এয়দিপাসের সহিত কেহ যদি শেক্সপিয়র প্রণীত ‘হ্যামলেট’ তুলনায় সমালোচনা করেন দেখিবেন ট্রাজেডি আর ট্রাউয়ারস্পিয়েলের পার্থক্যটা কোথায়। মানুষের বাসনা মাত্রেরই তাহার পরের- অর্থাৎ শেষ বিচারে পরমের বাসনা। মানবজাতির ইতিহাসে পরমের নিকটতম তুলনা তাহার ভাষা। বাসনা এই ভাষার মধ্যেই ধরা পড়িয়াছে।
আহমদ ছফার ‘কবি ও সম্রাট’- কবির নিজের ভাষায়- নাট্য সংলাপ বিশেষ। ইহার সহিত তুলনা করিবার মত কীর্তি বাংলা ভাষায় বিশেষ নাই। তাই আমাদের অপোগ- কবিতা ব্যবসায়ীরা যে ইহার তাৎপর্য উপলব্ধি করিতে পারেন নাই তাহাতে বিস্মিত হইবার হেতুও নাই। ইংরেজি পদকর্তা শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’ নাট্য সংলাপের সহিত ইহার তুলনা করা চলে। নায়ক হ্যামলেটের সহিত নায়ক এয়দিপাসের প্রভেদ আছে। এই প্রভেদই ট্রাজেডির সহিত ট্রাউয়ারস্পিয়েলের প্রভেদ। এয়দিপাসকে চালাইয়াছিল দেবতার ইচ্ছা বা নিয়তি আর হ্যামলেটকে চালাইতেছিল তাঁহার হৃদয়ধর্ম বা বাসনা।
আহমদ ছফার মির হ্যামলেটের সহিত তুলনীয় এক চরিত্র। হ্যামলেটের দ্বিধা তো জগদ্বিখ্যাত। মিরের দ্বিধাবিভক্তি অবশ্য অন্যরকম। আহমদ ছফার নাট্য সংলাপটির নামেই প্রকাশ ইহার নায়ক দুইজন: কবি ও সম্রাট। আসলে কবি ও সম্রাট মোটেও দুইজন নহেন- এই দুইজন একই মিরের দুই রকম প্রকাশ বৈ নয়। ট্রাউয়ারস্পিয়েলের নায়কেরা এই দ্বিধার মূর্তিস্বরূপ। আহমদ ছফা মিরকে যেমন কবি ও সম্রাট আকারে দ্বিধাবিভক্ত করিয়াছেন তেমনি নিজের জীবনপাত্রের মধ্যেও মিরের পদার্থ ঢালিয়া দিয়াছেন। এইভাবে ‘কবি ও সম্রাট’ আহমদ ছফার অ্যালেগরি বা পরকথায় পরিণতি মানিয়াছে।
আহমদ ছফার কবিতা পড়িবার উপক্রমণিকা আকারে যে তিনটি প্রস্তাব এখানে পেশ করিয়াছি তাহার মূলসূত্র আমি জার্মান পণ্ডিত বাহ্ল্টার বেনিয়ামিন ও ফরাশি শিক্ষক জাক লাকাঁর লেখায় পাইয়াছি। আহমদ ছফার ট্রাউয়ারস্পিয়েল বা দুঃখের দিনের পালার শেষ এখনও হয় নাই। এখনও পেক্ষাগৃহ পূর্ণ রহিয়াছে।

আরো খবর

Disconnect