ফনেটিক ইউনিজয়
যে দৃশ্য কেউ দেখেনি আগে

পুলিশ প্রটোকলে মন্ত্রীর গাড়ি। সাদা গাড়ির ভেতরে একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা থামিয়ে দিল। তারা জানতে পারল, খোদ মন্ত্রীর গাড়ির চালকেরই লাইসেন্স নেই অথবা লাইসেন্স সঙ্গে নেই। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে মন্ত্রী মহোদয় সাদা গাড়ি থেকে নেমে পেছনে থাকা কালো রঙের আরেকটি গাড়িতে উঠে রওনা হলেন। তিনি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। পানিসম্পদমন্ত্রী। একসময়ের যোগাযোগমন্ত্রী। আশি-নব্বই দশকে দেশের সড়ক ও সেতুব্যবস্থার যে উন্নয়ন, তার একটা বড় অংশই হয়েছে তার হাত ধরে। কিন্তু এ সিনিয়র রাজনীতিবিদকেই আজ তার সন্তান বা নাতি-নাতনির বয়সীদের দাবির মুখে, সড়কে নিয়ম প্রতিষ্ঠার দাবিতে গাড়ি থেকে নেমে যেতে হলো। তিনি যখন নামছিলেন, তখন শিক্ষার্থীদের ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ সেøাগানে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।
এর ঠিক আগের দিন একইরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন দেশের ছাত্ররাজনীতির প্রাণপুরুষ, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়া তোফায়েল আহমেদ। যিনি এখন বাণিজ্যমন্ত্রী। উল্টো পথে যাচ্ছিলেন তিনি। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আটকে দেয় তাকেও। শিক্ষার্থীরা সম্মান করে এবং যে ভাষায় তার ভুল ধরিয়ে দিয়ে যুক্তিপূর্ণ অনুরোধে গাড়িটি ফিরে যেতে বাধ্য করল, সে দৃশ্য অভূতপূর্ব। যদিও তোফায়েল আহমেদ শিক্ষার্থীদের বলেছেন, তিনি তাদের সাথে কথা বলার জন্য উল্টো পথে এসেছেন।
স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর ২০১৮ সালে এসে দুরন্ত আঠারোর এ এক অদ্ভুত জাগরণ দেখছে দেশবাসী। এমন সব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগে কারও কল্পনায়ও ছিল না। পুলিশ তার নিজের গাড়ির বিরুদ্ধে নিজেই মামলা দিচ্ছে। সরকারের নানা প্রতিষ্ঠান তো বটেই, খোদ গণমাধ্যমের গাড়িও তারা আটকে দিচ্ছে এবং গাড়ির ফিটনেস ও চালকের লাইসেন্স না থাকলে সেই গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা দিতে বাধ্য করছে। কিছু গাড়ি ভাংচুরও করা হয়েছে। যারা এ কাজগুলো করছে, তাদের বয়স ১৬-২২ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ স্কুলের শেষ এবং কলেজপড়ুয়া, বড়জোর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী; উঠতি তারুণ্য যাকে বলে।
এ প্রজন্মের ব্যাপারে এতদিন সমাজের কথিত সচেতন মহলের বেশ হতাশাব্যঞ্জক আর নেতিবাচক ধারণা ছিল। যেমন- ‘এখনকার পোলাপান সারাদিন ফেসবুক নিয়ে থাকে, দিন-দুনিয়ার কোনো খবর রাখে না, সেলফিশ, সমাজ ও রাষ্ট্র্রের ভালোমন্দে একাত্ম হয় না, এই করে সেই করে, তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই’ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সবাইকে বিস্মিত ও বিহ্বল করে দিয়ে সেই প্রজন্মই রাস্তায় নেমে এল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে। সরকারের পতন চায় না তারা। উন্নয়ন নাকি গণতন্ত্র সে তর্কে যায় না। তাদের দাবি খুব পরিষ্কার। আর তা হলো, সড়কে শৃঙ্খলা। বছরের পর বছর দেশের সড়কব্যবস্থায় যে নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, মাফিয়ার দৌরাত্ম্য, যে মৃত্যুর মহামারী, অনিয়ম, বেপরোয়া আচরণ, এসব থেকে তারা মুক্তি চায়।
বিস্ময়করভাবে দেখা গেল, এ শিশু-কিশোরদের সঙ্গে অনেক অভিভাবকও রাস্তায় নেমেছেন। বলেছেন, তারাও এ দাবিতে একমত। কারণ তাদের পাবলিক পরিবহনে চলতে হয়। কিন্তু দিনের পর দিন তাদের সঙ্গে যে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে, জিম্মি করে যেভাবে পয়সা আদায় করেছে পরিবহন মালিকরা, কিন্তু বিনিময়ে কোনো সেবা তো দূরে থাক, উল্টো ফুটপাতে গাড়ি উঠিয়ে দিয়ে নিরীহ মানুষের প্রাণ নিয়েছে, সেই বিভীষিকার অবসান তারা চান। ফলে সন্তানের সাথে অভিভাবকও এখন বলছেন, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’।
তো সেই জাস্টিস কে নিশ্চিত করবেন? করবেন রাষ্ট্রের কর্তারা। কিন্তু দেখা গেল, কর্তারাই উল্টো পথে গাড়ি চালান। কর্তাদের গাড়ির চালকেরই লাইসেন্স নেই। যে আইশৃঙ্খলা বাহিনী রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ করবে, আইনের শাসন নিশ্চিত করবে, তাদের গাড়িরই ফিটনেস নেই, তাদের গাড়ির চালকের লাইসেন্স নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা সেসব গাড়ি থামিয়ে পুলিশকেই বাধ্য করছে মামলা দিতে এবং গাড়ির গায়ে কালি দিয়ে লিখে দিচ্ছে, ‘লাইসেন্স নেই’।
কী বার্তা দিচ্ছে এ তারুণ্য? গল্পটা সেই রাজার নতুন পোশাকের মতো? একজন রাজা নতুন পোশাক পরে বেরিয়েছেন। এমন পোশাক, যে পোশাকে এর আগে কেউ রাজাকে দেখেনি। সবাই অবাক বিস্ময়ে দেখছে আর ভাবছে আহা রাজার এ কেমন পোশাক। কিন্তু কেউ কিছু বলছে না। কারণ রাজার পোশাকের সত্যিকারের মাহাত্ম্য যারা বুঝবে না, তারা নিজেদের পদে থাকার অযোগ্য, এমন ঘোষণা আগেই ছিল। ফলে রাজার পোশাক দেখে সবাই বিস্মিত হয়, কিন্তু নীরব থাকে। অগত্যা ন্যাংটো শিশুরা চিৎকার করে ওঠে, ওই দেখো রাজা আমাদের মতো পোশাক পরেছে। মানে রাজার কোনো পোশাকই নেই। রাজা উলঙ্গ।
যে শিশু-কিশোররা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে রাস্তায় নেমে এল, স্কুলের পোশাক পরে, বৃষ্টিতে ভিজে গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স আর গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট চেক করছে, তারা মূলত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, কোনো কিছুই ঠিকভাবে চলছে না। যে কথা এতদিন কেউ বলেনি, তা এ শিশুরা চিৎকার করে বলছে। তারা বলছে, ওই দেখো রাজার পোশাক নেই।
শিশু-কিশোররা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কেউই তার কাজটা সঠিকভাবে করছে না। যে পুলিশ গাড়ির ফিটনেস আর ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করবে, তাদেরই লাইসেন্স নেই। যে গণমাধ্যম সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরবে, তাদের গাড়িই নিয়ম মেনে চলে না। যে মন্ত্রীরা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ করেন, তারাই উল্টো পথে চলেন। তাদের চালকেরই লাইসেন্স নেই। ফলে তারা জাস্টিস চায়। ফলে তারা লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের গাড়িচালকের বিরুদ্ধেও মামলা দিতে বাধ্য করে। এ দৃশ্য স্বাধীন বাংলাদেশে এর আগে কেউ দেখেনি। এ এক অদ্ভুত বাস্তবতা; ভুক্তভোগীদের জন্য এ এক করুণ অভিজ্ঞতা। যারা বছরের পর বছর মনে করে আসছিলেন তারা সব নিয়ম-কানুন আর আইনের ঊর্ধ্বে, তারা নাজেহাল হচ্ছেন এমন একটি প্রজেন্মর হাতে, যারা ভোটের হিসাবে তো বটেই, অন্য কোনোভাবেই কারও গণনার ভেতরে ছিল না। যাদের বার্গার বা ডিজুস জেনারেশন বলেই এতদিন টিপ্পনী কাটা হয়েছে। সেই প্রজন্ম রাস্তায় নেমেছে ন্যায়বিচারের দাবিতে।
আখেরে এ ঘটনায় সড়কে শৃঙ্খলা কতটুকু ফিরবে বা সড়কে নৈরাজ্য কতটুকু থাকবে, তা এখনই বলা মুশকিল। কিন্তু অর্ধশত বছর ধরে এ দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনায় যে অন্যায়, অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা আর মাফিয়ার দৌরাত্ম্য চলে এসেছে, তার বিরুদ্ধে কারও না কারও রুখে দাঁড়ানোর প্রয়োজন ছিল বটে। কিন্তু যে কাজটি করার কথা ছিল বড়দের, সেই কাজটি করে দেখাল ছোটরা। তাদের অভিবাদন। তবে সতর্ক থাকা দরকার, যাতে কোনো সুযোগসন্ধানী পক্ষ তাদের নিজেদের স্বার্থে এ প্রজন্মকে ব্যবহার করতে না পারে।

Disconnect