ফনেটিক ইউনিজয়
ভাষার ব্যবহার ও নারী

মানুষের সাথে পশু-জীবজন্তুর পার্থক্য হচ্ছে ভাষা। ভাষার সাংকেতিক রূপ অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও যোগাযোগের অপরিহার্য মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হলেও মানুষের কৃতিত্ব হলো মনের সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ভাষাকে উপযুক্ত করে তোলা। মানুষের শৈল্পিক চেতনা প্রকাশেরও মাধ্যম হয়ে উঠেছে ভাষা। কিন্তু আমরা দেখব, পৃথিবীর যেকোনো আবিষ্কার বা উদঘাটনই সবসময় শাসকশ্রেণি তাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে। নিজেদের পক্ষে কাজে লাগিয়েছে। মানুষের ভাষা বিকাশ লাভ করেছে শিল্প-সাহিত্যে ও ভাষাতত্ত্বে। সমাজের একটা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণি তার নেতৃত্ব দিয়েছে। একটা সময় পর্যন্ত এ বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণি ছিল একচেটিয়াভাবে সমাজের পুরুষ সদস্য দ্বারা গঠিত। অর্থাৎ শাসকের আসনে তখন পুরুষ। বৃহত্তর নারী সমাজ বৃহত্তর পুরুষ সমাজের অধীন। ফলে ভাষার গঠন ও বিকাশ ঘটেছে পুরুষের বায়বীয় প্রতিনিধি হিসেবে। পুরুষবাদী সভ্যতার প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে ভাষা। ভাষার মধ্যে পুরুষবাদী ধারণাটা এমনভাবে সংযুক্ত যে, নারীরাও এ ভাষাশিক্ষার মধ্য দিয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ছায়াশরীর হয়ে উঠেছে।
নারী-পুরুষে অধিকার ও মর্যাদাসংক্রান্ত মূল পার্থক্যটা শুরু হয়েছে পুরুষ যেদিন থেকে ভাষার ওপর একক কর্তৃত্ব স্থাপন করেছে। নারী যখনই নিজস্ব ভাষা সৃষ্টি বা ভাষার ওপর যৌথ নেতৃত্ব স্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে, তখনই তাদের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গেছে। আমরা যে বলি নারী-পুরুষে বৈষম্যের প্রধান কারণ অর্থনীতি; এ অর্থনীতির বিষয়টিও ভাষার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। পৃথিবীর তাবৎ শাসনক্ষমতার মূল অস্ত্র হলো ভাষা। যে কারণে বলা হয়, আপনি যদি কোনো জাতির ভাষা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে আপনি সেই জাতির সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। এ নীতি থেকেই আমরা জানি, পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী সর্বপ্রথম আমাদের ভাষার ওপর আঘাত হানে। অন্যদিকে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন বেগবান হয় ভাষার স্বাধীনতা অর্জনের ভেতর দিয়ে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইংরেজি বা উর্দুতে, এমনকি প্রমিত বাংলায় প্রদান করা হলে বাংলাদেশের গণমানুষ কি তাতে এমনভাবে উজ্জীবিত হতে পারত?
পুরুষ সমাজের ভাষা নির্ধারণ করে। এ ভাষা নির্ধারণের মাধ্যমে নির্ধারণ করে মানুষের আচরণ, ক্ষেত্রবিশেষ মানুষের জীবনচিত্র। ভাষা-রাজনীতির কারণে আমরা প্রকৃতিগতভাবে মেনে নিই, চাঁদ নারী, সূর্য নর। এ এলিগরি থেকে আমরা সার্বিকভাবে মেনে নিই, যা নরম তাই নারী, আর যা বলিষ্ঠ তা পুরুষ। ভাষা এক্ষেত্রে ‘gendered agency’ হিসেবে কাজ করে। বলা যেতে পারে, ভাষা মানুষ আবিষ্কার করে না, বরং ভাষার মধ্যে মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করে। আর সে কারণেই কেউ যদি বলে, আমি রাস্তায় একজন মানুষকে যেতে দেখলাম। আমরা বুঝি সে কোনো পুরুষকে যেতে দেখেছে; কেননা নারীকে দেখলে বলত, আমি রাস্তায় একটা মহিলাকে যেতে দেখলাম। যেমন বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম বলতে আমরা মাশরাফির দল বুঝি। কিন্তু সালমাদের দলকে বোঝাতে হলে বলতে হবে বাংলাদেশ নারী বা মহিলা ক্রিকেট টিম। অথচ পুরুষ দলের আগে কিন্তু ‘পুরুষ’ শব্দটি যোগ করতে হচ্ছে না। প্রায়ই খবরের শিরোনাম হয়, ‘একজন নারীর লাশ মিলেছে’। পুরুষ হলে শিরোনাম হয়, ‘একজন মানুষের লাশ মিলেছে’।
অর্থাৎ ‘মানুষ’ ‘পুরুষ’ শব্দের সমার্থক শব্দ। ইংরেজিতে ‘মানুষ’ বলতে বলা হয় human; hu-এর সঙ্গে man শব্দটি এখানে কৌশলে জুড়ে দেয়া হয়েছে। যেমন যদি কেউ মানুষকে huwoman বলে তবে ব্যাকরণসিদ্ধ হবে না। তার চেয়ে বড় কথা wo+man যোগ করে নারী হলো কেন? HE-এর সঙ্গে S যোগ করেই তো sHE হয়েছে। এই যে আমরা বাংলা ব্যাকরণে Gender-এর বাংলা করা হলো লিঙ্গ, ভালো কথা। কিন্তু first person, second person, third person-এর বাংলা প্রথম পুরুষ, দ্বিতীয় পুরুষ, তৃতীয় পুরুষ এটা কিসের ভিত্তিতে করা হলো? কোনো উপন্যাসে কথকের ভূমিকায় যদি থাকে কোনো নারী চরিত্র, তাহলে কি আমরা বলব উপন্যাসটি ‘প্রথম পুরুষের’ বয়ানে উপস্থাপিত?
পুরুষ ভাষা নির্ধারকের ভূমিকায় বলেই কিছু কিছু গৌরবময় কাজের নামকরণে নারীরূপ তৈরি হয়নি, আবার উল্টো কিছু কিছু নিচু পেশার পুরুষবাচক শব্দ তৈরি হয়নি। যেন এ কথিত খারাপ কাজটি পুরুষ করতেই পারে না! উদাহরণ হিসেবে ‘সতীত্ব’ শব্দটির কথা বলা যায়। ভাষা রাজনীতির কারণে আমাদের সমাজে পতিতা থাকলেও পতিত থাকে না। তাই বেশ্যা-বারবনিতা-গনিকা-মাগী-ছিনাল-খানকি-বারাঙ্গনা প্রভৃতি স্ত্রীবাচক শব্দের কোনো জুতসই পুরুষবাচক সমার্থক শব্দ পাওয়া যায় না। মাগী শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ (নারী) ইতিবাচক, কিন্তু একেও ব্যবহৃত অর্থে নেতিবাচক করে তোলা হলো।
ব্রিটিশ কবি ও পাদ্রি জন হেনরি নিউম্যান তার ‘দি আইডিয়া অব ইউনিভার্সিটি’ প্রবন্ধে বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হচ্ছে gentlemen বা ভদ্রলোক (লোক মানেও কিন্তু পুরুষ) তৈরি করা। আমরা এই যে বলি ladies an’ gentlemen। gentlewomen an’ gentlemen বললে সমস্যা কী? (এমন অনেক শব্দ আছে, যেমন chairman, spokesman, sportsman, businessman, cameraman, manpower, masterpieace, mastermind) এই যে আমরা বলি হিউম্যান, এ শব্দটাই তো জেন্ডারনিরপেক্ষ না। তাহলে ‘হিউম্যান’ ‘হিউম্যান’ হয় কী করে?
গালির প্রসঙ্গেও বলতে হয়, একজন পুরুষ আরেকজন পুরুষকে গালি দিচ্ছে। কিন্তু গালিটা দেয়া হচ্ছে মা তুলে। খানকির ছেলি, বেশ্যার পুত, নটির ছাওয়াল, তোর মাক্কে, আরও অনেক আছে। এগুলো কথিত ভদ্রলোকরা কম ব্যবহার করে। ভদ্রলোকরা বলেন ‘বাস্টার্ড’। এটাও কিন্তু মাকে বা নারীকে খাটো করার অর্থে বলা।
পৃথিবীর হাজার হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, রাজনৈতিকভাবে তো বটেই, জ্ঞানভিত্তিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এভাবে ভাষারাজনীতির শিকার হয়ে বঞ্চিত হয়েছে নারীরা। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৈয়াকরণিকভাবে কিছু কিছু শব্দের ব্যবহার বন্ধ করে দেয়া উচিত। ব্যাকরণ প্রণয়নের সময় জেন্ডার বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা থাকতে পারে। সেই সঙ্গে ভাষার প্রায়োগিক দিকটাই দেশের সব মিডিয়া ও বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী মহল সচেতন হলে জনগণ নিজের অজান্তেই নতুন ভাষারীতি রপ্ত করতে সক্ষম হবে।

Disconnect