ফনেটিক ইউনিজয়
জীবন ও পরিবেশ

রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, ঢাকার পথ। না, সার্কাসের খেলোয়াড়ই বোধহয় আপনি। তিন দিকের নালা টপকে ঘাড়ের ওপর এসে যাওয়া মোটরসাইকেল সামলে নিতে নিতে আপনার চমক ভাঙল, তরকারি কিনতে যেতে হবে। তরকারি কিনতে গিয়ে দেখলেন, খাঁচায় বন্দি ফার্মের মুরগিগুলো পুষ্ট হয়ে উঠেছে কৃত্রিম খাদ্যসংস্থানে। ছেড়ে দিলে বোধহয় হাঁটতেও পারবে না। আপনার দৈনন্দিন জীবন এদের ভাগ্য থেকে কতটুকু উন্নত? ইট-কাঠ, কংক্রিটের এ জঙ্গলে, অপরকল্পিত এ শহরে প্রতিদিন ঘরে ফেরাই যখন একটি জীবনযুদ্ধ, তখন আশপাশের নোংরা ডাস্টবিনের পাশে ময়লা কাপড় পরে খাবার খেতে থাকা মানুষের দৈনন্দিন জীবন আপনার চোখে পড়েছে কি? এই মাত্র মুচির কাছ থেকে ত জুতো সারিয়ে নিলেন। সে বসে কাঁচা ড্রেনের পাশে একটা কোনায়, যেখানে কেউ বসবে না; অবশ্য সে জায়গাটির ভাড়াও তাকে দিতে হয়। কার কাছে, সেটি একটি প্রশ্ন বটে।
আপনি তরকারি কিনে পথ হাঁটছেন। আপনার হাতে কয়েকটি ব্যাগ, রাস্তা এবড়োখেবড়ো, ইটের খোয়া উঠে গেছে, আপনি সাবধানে পা ফেলে হাঁটছেন। ঘাড়ের ওপর কখন কাকের বিষ্ঠা পড়ে গেছে, আপনার দেখার ফুরসত নেই। আপনি ভদ্রলোক। কোনোমতে গালিটি আপনার মুখে আসছে না। অথচ পথশিশুর অশ্লীলতা আপনার বিবেককে স্পর্শ করে। কোথায় যাচ্ছি আমরা? নাকি যাওয়ারও আর রাস্তা নেই। আমরা পৌঁছে গেছি নরকে। কেমন এ নন্দিত নরক? এইমাত্র আপনার কানে এল রাস্তার মোড়ে অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে কিশোর ছাত্র ও ছাত্রী। পরদিন পত্রিকায় পেলেন বিস্তারিত খবর। খুনখারাবি, আত্মহত্যা আর ব্যাংক লুটপাটের নানা খবর। এর মধ্যেও দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে সেটি একটি প্রশ্ন।
আগে তরুণ, উচ্চপর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ঝলমলে বক্তৃতার অনুষ্ঠান আপনাকে আনন্দ দিত। বিটিভি ছিল সেরা চ্যানেল। রাত ৮টার খবর শুনতেন আপনি। এখন শত শত চ্যানেল। আপনি চ্যানেল ঘুরিয়ে উপলব্ধি করেন বিশ্ব কত বিশাল। অথচ আপনার পরিচিত সবাই বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। সেখানে তারা সিস্টেমের মধ্যে বাস করবে, ভালো থাকবে। সকালে উঠেই দেখতে হবে না ডাস্টবিন। জড়িয়ে থাকা টেলিফোন কেবল বা জানালার নিচে ময়লার স্তূপ। দেশ ত্যাগ করবেন আপনি। কারণ ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’। তারপর একসময় সুবিধামতো গাইবেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। সবাই মিলে পাঞ্জাবি, শাড়ি পরে করবেন পয়লা বৈশাখে মিষ্টিমুখ। আপনি ভাগ্যবান, কারণ দেশ ছেড়ে চলে যেতে পেরেছেন। কিন্তু সেই যে আপনার ফেলে দেয়া প্লাস্টিক, সেখানে কিন্তু আজও তা উড়ে বেড়াচ্ছে কিংবা ভেসে বেড়াচ্ছে নদীর পানিতে, যেভাবে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ শূন্যতায় ভাসছে।
তারাও বোঝে, দেশে থেকে লাভ নেই। বাংলা মা আজ তার আপন সন্তানদের হাতে ধর্ষিত, লুণ্ঠিত। তাকে ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে আঁস্তাকুড়ে। তার নিজের ছেলেরা আজ লুটপাটকারী, ব্যাংক ডাকাত, তোষণকারী, ক্ষমতাসীনদের পা চাটার দল। মেয়েরা তাদেরই বরণ করছে। আপনিও করেছেন চুরি। সম্পদগুলোকে বিদেশে পাচার করে দিচ্ছেন। এ দেশে কে থাকে? আপনি অন্য দেশের সম্মানিত নাগরিক। আর দেশের লজ্জা, যে পরিবেশ রেখে গেছেন, তাতে জমছে আরও ধুলো, ময়লা, ক্যান্সারের বিষ, আপনার প্রতি ১০ জন পরিচিতের একজন ক্যান্সারে ভুগছে। আপনি বিদেশে পালাবেন? সেখানেও একই অবস্থা। আপনি কোথায় যাবেন?
আপনি যেখানেই থাকুন, পরিবেশ উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনে যুদ্ধ করুন। যতভাবে বুদ্ধিতে কুলায়, ছলে বলে কলে কৌশলে আমাদের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। কাজ করতে হবে। কাজই প্রকৃত সুখ। কারণ কাজ করতে করতে যে মারা যায়, তার তুলনায় নিশ্চেষ্ট বিলাসী লোকে রোগে পড়ে বেশি। যে দায়িত্বশীল সেও সাবধানে রাস্তা পার হয়, সাবধানে গাড়ি চালায়। আজকাল তো প্লেন অ্যাকসিডেন্টও ঘটে। যদিও অনেক সিস্টেম হয়েছে। কিন্তু দায়িত্বের ড্রাইভে থাকা মানুষকে প্রকৃতি বাঁচিয়ে রাখে অন্যকে বাঁচানোর জন্য।
তেমনি শুধু বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যে মানুষ বেঁচে থাকে না। বেঁচে থাকে জীবনের মতো জীবনের জন্য। আপনি কি সচেতন পরিবেশের প্রতি? মানুষের প্রতি? আপনি যেইই হোনÑ আপনি হয়তো কোনো এক দোকানের চাওয়ালা কিংবা রেস্টুরেন্টের বয় বা ব্যবসার মালিক, কিন্তু আপনার গ-ির ভেতরেই আপনি হয়ে উঠতে পারেন কর্মী, সচেতন দায়িত্বশীল আর অবশ্যই অতুলনীয়। প্রত্যেকেই বিশিষ্ট, খুঁজে নিতে পারে জীবন আর প্রকৃতির ছন্দকে। একটিই জীবন, অবহেলা করবেন কেন? কাজে লেগে পড়ুন। দেশমাতাকে উদ্ধার করুন। তাকে চিনতে শিখুন। তিনি আজও আপনাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তার আর কোনো সম্মান নেই। দেশে-বিদেশে কাঙালিনী তাকে কত করে রাখবেন আর সামান্য কিছু স্বীকৃতির জন্য? একটু ভালো অবস্থার জন্য? দেশের শেষ দশার শেষ মুহূর্তের আগেই ঘুরেই দাঁড়ান, সুকান্তের মতো পণ করুন, ‘পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে যাব’... এবং জীবনের মতো জীবন পৃথিবীতে রেখে যাব।

Disconnect