ফনেটিক ইউনিজয়
পথে পথে
‘পড়ালেখা কইরা মাস্টার হমু’
দীপংকর গৌতম

‘পড়ালেখা করমু। পড়ালেখা ছাড়মু না। বাপ বাঁচলে আবার ইশকুলে যামু। লেখাপড়া কইরা মাস্টার হমু। তহন গরিব গো পড়ামু। এহন পড়ালেখার চিন্তা করি না। এহন ইশকুলে গেলে আমাগো সংসার চলব কেমনে?’- এভাবেই কথাগুলো বলছিল মেহেদী হাসান।
মেহেদী হাসান ফুটপাতের ঝালমুড়ি বিক্রেতা। রাজধানীর শনির আখড়া সেতুর পাশে সকাল-সন্ধ্যা ঝালমুড়ি বিক্রি করে। রোদ-বৃষ্টিতেও মেহেদীর এ বেচাকেনা থেমে থাকে না। মাঝেমধ্যে শনির আখড়া এলাকার বাইরে গিয়েও বিক্রি করে। প্রতিদিন বেচাকেনা শেষে বাসায়  ফেরার পথে মুড়ি, চানাচুর ও মসলা, পেঁয়াজ, মরিচ কিনে নেয়। মা ঘুঘনি, পেঁয়াজ-মরিচ কেটে, মসলা প্রক্রিয়াজাত করে ঠিক করে রাখেন। সকালে মেহেদী নাশতা করে মুড়ির রান্না মসলাসমেত শনির আখড়ায় এসে হাজির হয়ে যায়। সারাদিন ঝালমুড়ি বিক্রির পর ২০০-২৫০ টাকা লাভ হয় তার।
মেহেদীর বাড়ি ঝালকাঠির শেকেরহাটের মুক্তাহার গ্রামে। তার বাবা আজাহার শেখ ও মা হাছিনা বানু। চার ভাইবোনের মধ্যে মেহেদী সবার ছোট। শেকেরহাটের মুক্তাহার নিজ গ্রামে তৃৃতীয় শ্রেণির মেধাবী ছাত্র ছিল মেহেদী। বিদ্যালয়ে তার রোল নম্বর ছিল ৪। কিন্তু পরিবারের অভাব-অনটনের কারণে চলতি বছরের জুনে ঢাকায় পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে। তার বাবা একসময় আখের ব্যবসা করতেন। কিন্তু কয়েক মাস আগে বিষফোঁড়া বা বাঘি রোগে আক্রান্ত হন তিনি। ফলে চলৎশক্তি হারিয়ে ঘরে পড়ে আছেন অনেকদিন ধরেই। দিন দিন কাজের শক্তিহারা হয়ে পড়েছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি মেহেদীর বাবা আজাহার শেখ। বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় সংসারে টানাপড়েন দেখা দেয়। অসুস্থ বাবাকে ঘরে রেখে রুটি-রুজির সন্ধানে তার মা মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ শুরু করেন। কিন্তু মায়ের একার রোজগারে সংসার ও বাবার ওষুধের খরচ জোগানো যাচ্ছিল না। ফলে মেহেদীর পড়ালেখায় ছেদ পড়ে। মায়ের একার ওপর এত কষ্ট কমাতে সংসারের হাল ধরতে তাই এবার মেহেদীও এগিয়ে যায়। পড়াশোনা ছেড়ে গ্রাম থেকে শহরে এসে মা-বাবার সংসারের হাল ধরতে হয়েছে তাকে।
রাজধানীর শনির আখড়ার গোবিন্দপুরে থাকে মেহেদী। তিন বোনের বিয়ে হয়েছে। বড় বোন স্বামীর সঙ্গে গ্রামেই থাকে। বাকি দুই বোনের মধ্যে মেজো বোন সাভারে থাকে। আর ছোট বোন থাকে বাড্ডায়। বোনরা সবাই স্বামী-সন্তান নিয়ে ব্যস্ত। মাঝেমধ্যে বোনদের কেউ কেউ সহযোগিতা করে, কিন্তু তা খুবই সামান্য।
একসময় লেখাপড়া ও খেলাধুলা করে সারাদিন মেতে থাকত মেহেদী। এখন প্রতিদিন ঝালমুড়ির ডালা নিয়ে বের হতে হয় মেহেদীকে। ঘরে অসুস্থ বাবার ওষুধ কেনা ও মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে প্রতিদিন সকাল থেকেই ঝালমুড়ির ডালা নিয়ে ছুটে চলে। এলাকার একজন মুরব্বির সহযোগিতায় ঝালমুড়ি বিক্রির পথ বেছে নিয়েছিল মেহেদী। তবে এ ব্যবসায় মাই উৎসাহিত করেছেন তাকে। ব্যবসার পুঁজিও দিয়েছেন মা।
ঝালমুড়ি বিক্রির কারণ সম্পর্কে মেহেদী বলেন, ‘কাজ না করলে খামু কী? কে আমাগো খাওয়াইব? শুইয়া থাকলে পেট ভরব না। কাজ না করলে বাপের ওষুধ কে কিন্না দিব? মায় মাইনসের বাইতে কাজ করে, মোর ভালা লাগে না।’ মেহেদী আরও বলে, ‘পড়ালেখা ছাড়মু না। বাপ ঠিক হইলে আবার ইশকুলে যামু। লেখাপড়া কইরা মাস্টার হমু। তহন গরিব গো পড়ামু।’
যে বয়সে বই নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল মেহেদীর, সেই বয়সে ঝালমুড়ির ডালা নিয়ে ফুটপাতে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে তাকে। তবে এখনও পড়ালেখার স্বপ্ন দেখে সে। স্বপ্ন দেখে বাবা সুস্থ হয়ে উঠলেই আবার স্কুলে যাওয়ার। পড়াশোনা করে শিক্ষক হয়ে দরিদ্র ছেলেমেয়েদের পড়ানোর দায়িত্ব নেবে মেহেদী।

Disconnect