ফনেটিক ইউনিজয়
আমাদের শিক্ষা, আমাদের শিক্ষক

পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তিকে মূল্যায়ন করা হয় অর্থ, ক্ষমতা এবং পদবির মানদণ্ডে। আপনি যতো বেশি অর্থের মালিক কিংবা আপনি যতো বড় পদবিধারী হবেন, সমাজে আপনার সম্মান এবং গ্রহণযোগ্যতা ততো বেশি। সেই বিবেচনায় আমদের দেশে শিক্ষকদের অবস্থান কতটা সম্মানজনক অবস্থায় আছে সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। দাবি করা হয়, বিশ্ব এখন সভ্যতার চরম উৎকর্ষের সীমানায় অবস্থান করছে। হ্যাঁ, সভ্যতা যদি হয় বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার, তবে হয়তো ঠিক আছে। কিন্তু এই সভ্য সমাজে মানবতা কিংবা মূল্যবোধের বিবেচনায় মানবিক বিশ্ব সেভাবে উন্নতি লাভ করেনি। যদি তেমনটি হতো, তবে সভ্যতা বিনির্মাণে যে শিক্ষকেরা শিক্ষার আলো জ্বেলেছেন, তাদের নিয়ে অন্তত এদেশে বছরজুড়ে লাঞ্ছনা-বঞ্চনার অশ্রুসিক্ত ইতিহাস লিখতে হতো না। প্রাথমিক থেকে শুরু করে প্রত্যেক স্তরের শিক্ষকের মনে অসন্তোষ, হতাশা। এই অসন্তোষ কিংবা হতাশা নিয়ে আর যা-ই হোক মানসম্মত শিক্ষা (কোয়ালিটি এডুকেশন) নিশ্চিত হবে না।
যে দেশে একজন শিক্ষক অধিকার আদায়ের জন্যে কাফনের কাপড় পরে রাস্তায় অনশন করে। যে দেশে দারিদ্র্যের কষ্ট বইতে না পেরে একজন শিক্ষক গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মাহুতি দিতে চায়। যে দেশে অধিকার আদায়ের মিছিলে পুলিশ ভাইয়েরা মরিচের গুঁড়া গুলে ছুঁড়ে মারে শিক্ষকের চোখে। সেই দেশে আপনি ‘কোয়ালিটি এডুকেশন’ কীভাবে আশা করা যায়? আগে রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষকের মূল্যায়নের জায়গাটি সুনিশ্চিত করতে হবে। তারপর ‘কোয়ালিটি এডুকেশন’- এর স্বপ্ন দেখতে হবে।
‘শিক্ষকের সাথে ছাত্রের আর্থিক লেনদেন কিংবা স্বার্থ কিছুতেই থাকতে পারে না। এতে শিক্ষকের প্রতি ছাত্রের শ্রদ্ধাবোধ কমে যায়’। কথাটি মন্দ নয়। কিন্তু জীবন-যাপনের ব্যয়ের সাথে আর্থিক অসঙ্গতি থাকলে মানুষ অসৎ পথ বেঁচে নেয়। শিক্ষক একজন মানুষ। শুধু সম্মান দিয়ে তো আর জীবন চলে না। সীমিত বেতনে চলা সম্ভব নয় বলেই একজন শিক্ষক বাড়তি আয়ের পথ বেছে নেন। কোচিং-প্রাইভেট কিংবা অন্য কোনো ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। এটা সত্যি, এক্ষেত্রে শিক্ষকের শিক্ষকসুলভ ব্যক্তিত্ব ক্ষুণ্ন হয়। টাকার জন্যে শিক্ষক ছাত্র কিংবা অভিভাবকের কাছে নতজানু হন। এভাবে নতজানু হয়ে জ্ঞান বিতরণ করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে না। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ভাবে শিক্ষকের সম্মান অনুযায়ী সম্মানী নির্ধারণ করা হলে কোচিং- প্রাইভেট সংকট ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে। ছাত্র-শিক্ষকের স¤পর্কও মধুর হবে।
কিছুদিন আগে শিক্ষকদের এক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানে জনৈক প্রশিক্ষক বলেছেন, ‘আমি তখন অস্ট্রেলিয়ায় থাকি। একদিন সে দেশের জাতীয় দৈনিকের একটি বিজ্ঞাপনে দেখি আমার শিক্ষকের ছবি এসেছে। তিনি আমার উচ্চতর গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষক। একটি বিমান কো¤পানি শিক্ষকের ছবির নিচে লিখেছে ‘মিস্টার অমুক শিক্ষক আমাদের বিমানে যাতায়াত করেন।’ এটা দেখে প্রশিক্ষক আপ্লুত হয়েছেন। একজন শিক্ষকের সম্মান রাষ্ট্রীয়ভাবে কত উঁচুতে থাকলে এ ধরনের বিজ্ঞাপনে শিক্ষককে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে আসতে পারে! তাঁর সাথে আমরা উপস্থিত শিক্ষকরাও বিস্মিত। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে একজন শিক্ষকের বদলে একজন ক্রিকেটারের ছবি বিজ্ঞাপনে আমরা ব্যবহার হতে দেখেছি। এখন প্রশ্ন, তাহলে একজন ক্রিকেটার কেন শিক্ষকের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো? (ক্রিকেটরকে খাটো করার জন্যে বলছি না। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছি) কারণ, আর্থিক মানদণ্ড, রাষ্ট্রের আনুকূল্য। আমাদের রাষ্ট্র যেভাবে ক্রিকেটারকে মূল্যায়ন করে, সেভাবে শিক্ষককে নয়।
একজন শিক্ষক পৃথিবীর তাবৎ পেশাজীবী গড়ার কারিগর। ক্রিকেটার, আমলা, ব্যাংকার, আইনজীবী, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার-সহ সকল পেশার ব্যক্তিই শিক্ষকের ছাত্র। কথায় কথায় শিক্ষককে অনুসরণীয় ‘আদর্শের প্রতীক’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হলেও বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। আদর্শের প্রতীক রক্ষায় রাষ্ট্রীয় ভাবে কী কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে? স্বাভাবিক ভাবেই, পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামোয় একজন শিক্ষকের সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা থাকার কথা থাকলেও তা হয়নি। মুখে মুখে আদর্শের ধুয়া তুললেও বাস্তবে শিক্ষক হয়েছেন লাঞ্ছিত। এখানেও তবে শিকড় অবহেলিত। শিক্ষার শিকড়ে জল না ঢেলে, কিংবা শিকড় আহত করে আমরা ভালো ফল পেতে পারি কী?
বিভিন্ন সভা-সেমিনারে কিংবা রাজনৈতিক মঞ্চে একটি সাধারণ প্রসঙ্গ আলোচনা হয়। তা হলো- ‘আমাদের শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীরা অনুপস্থিত। মেধাহীনরাই এখন শিক্ষকতায় আসে।’ যদি এতোই বুঝে থাকি, তবে মেধাবীরা যাতে এ পেশায় আসে সেই ব্যবস্থা তো করা যেতে পারে। মেধাহীন শিক্ষকের ছাত্র কীভাবে মেধাবী হয়ে মেধানির্ভর দেশ গড়বে? তাই শিক্ষা যদি জাতির সার্বিক উন্নয়নের চাবিকাঠি হয়, তবে তালা খোলার আগে চাবির প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত। তাই প্রশ্ন, বহুল পঠিত মধুর বচন ‘শিক্ষাই জাতীর মেরুদণ্ড’- এই মেরুদণ্ড রক্ষায় আমরা কী করছি?
প্রসঙ্গক্রমে একটা বাস্তব শোনা গল্প শেয়ার করছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক অধ্যাপক রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছেন। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অনুষ্ঠানে এসেছে। অনুষ্ঠান শেষে গেইটের বাইরে বেরুতেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। বাধ্য হয়ে অধ্যাপক গেইটের পাশে ছাউনিতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। বৃষ্টি কমলে তবেই যাবেন। কিছুক্ষণ পর গ্যারেজ থেকে একটি দামি প্রাইভেট কার বের হয়ে অধ্যাপকের গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। গাড়ির দরজা খুলে একজন নেমে এসে স্যারের পা ছুঁয়ে সালাম করলেন। স্যার বললেন, আমি কিন্তু আপনাকে ভালো ভাবে চিনতে পারিনি বাবা! ছাত্রটি শশব্যস্ত হয়ে বললো, স্যার আমি আপনার অমুক ব্যাচের ছাত্র মোশারফ। আমি অমুক সচিবালয়ে অমুক দায়িত্বে আছি। স্যার বললেন, আচ্ছা, খুব ভালো। খুশি হলাম। ছাত্র বললো, স্যার দাঁড়িয়ে আছেন যে? কারো অপেক্ষায় আছেন? স্যার বললেন, হ্যাঁ, বৃষ্টি কমার অপেক্ষায়। ছাত্র একটু অবাক ভঙ্গিতে বললো, বলেন কী স্যার! আপনার প্রাইভেট গাড়ি নাই? স্যার শুধু বললেন ‘না’। ছাত্র বললেন, স্যার আমার ব্যক্তিগত আরও একটা গাড়ি আছে। আপনি অনুমতি দিলে আপনাকে নামিয়ে দিয়ে আসবে। শিক্ষক বললেন, না মোশারফ; তা লাগবে না। এদেশের শিক্ষকরা ‘কদমবুসি নিয়েই বেঁচে থাকে।’
জাপানে সরকারের অনুমতি ছাড়া শিক্ষককে গ্রেফতার করা যায় না। আর আমাদের দেশে শিক্ষককে কানে ধরে উঠবস করানো কিংবা মাথায় মল ঢেলে আমরা পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠি। হ্যাঁ, খারাপ শিক্ষক যে নেই তা বলছি না। অবশ্যই আছেন। অপরাধকারী যেই হোন শাস্তি পাবেন। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। অথচ আমরা আইনের তোয়াক্কা করি না। ফ্রান্সের আদালতে কেবল শিক্ষকদেরকে চেয়ারে বসার অনুমতি দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষককে ভিআইপি’র মর্যাদা দেয়া হয়। চীনে সব থেকে মর্যাদাপূর্ণ পদ শিক্ষকতা। কোরিয়ায় শিক্ষকরা মন্ত্রীদের সমান সুযোগ পান। এসবের বিবেচনায় আমাদের শিক্ষকরা   কোথায় আছেন ? প্রতিবছর আমাদের শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিরা উন্নত বিশ্বে সরকারি খরচে ভিজিটে যান ঐ দেশের শিক্ষা কাঠামো, শিক্ষকের রাষ্ট্রীয় অবস্থান স¤পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করে সরকারকে রিপোর্ট দেয়ার জন্যে। আমার মনে হয়, রিপোর্টে সব থাকে। কেবল শিক্ষকদের অবস্থান এবং রাষ্ট্রীয় ভাবে শিক্ষকের মূল্যায়নের ফিরিস্তি রিপোর্টে থাকে না।
একদিন টিভি টক শোতে জনৈক আমলা খুব আফসোস করে বলেন, ‘কীভাবে শিক্ষকেরা মানসম্মত পাঠদান করবে বলেন? খোঁজ নিয়ে দেখেন শিক্ষকের বাড়িতে বইয়ের সংগ্রহ নাই। পারিবারিক লাইব্রেরি নাই।’ শুনে ভালো লাগলো। কিন্তু পরে আবারও শিক্ষকের আর্থিক দীনতার চিত্র ভেসে উঠলো চোখের সামনে। একজন আমলা সারা বছর বিভিন্ন অজুহাতে যে পরিমাণ আর্থিক থোক বরাদ্দ কিংবা ভাতা পান। বই কেনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ কিছুটা পেলেও প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকগণ বছরে তার সিকি পরিমাণও  পাচ্ছেন বলে মনে হয় না।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রে একজন প্রাথমিক শিক্ষকের মাসিক বেতন নাকি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের সমপরিমাণ। তাহলে এবার বিবেচনা করুন শিক্ষকের মান এবং দীনতার অবস্থা। যে দেশে একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের বেতন এবং শিক্ষকের বেতন সমান হয়; কিংবা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে একজন নিম্ন মাধ্যমিক/ মাধ্যমিক পাস গাড়ির চালকের বেতন এবং একজন বিএ, এমএ পাস শিক্ষকের বেতন সমান হয় তখন ‘কোয়ালিটি এডুকেশন’ আমরা কীভাবে প্রত্যাশা করবো?
শিক্ষক দিয়ে আদমশুমারির কাজ করানো হয়। কার বাড়িতে কয়টা পাকা, কয়টা কাঁচা লেট্রিন আছে তা গণনা করেন শিক্ষক। এমনকি ভোটগ্রহণের কাজেও শিক্ষক দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষক যেহেতু আদর্শের প্রতীক, সেহেতু তাঁর কোনো ভুল থাকা চলবে না। শিক্ষক সাদা কাপড়ের মতো। তার গায়ে কোনো দাগ থাকা চলবে না। সাদা কাপড় দাগমুক্ত রাখতে বিশেষ যতœ প্রয়োজন। সেই উদ্যোগ কেন আমরা নিচ্ছি না!
আমরা আলোকিত সমাজ চাই। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হোক দেশ, এই প্রত্যাশা সকলের। কিন্তু শিক্ষার আলো বিস্তারে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তাদের জীবনমান উন্নয়নে এতো অনীহা কেন? দূর হোক এই অনীহা। শিক্ষকের মনে হতাশা না থাকুক। শিক্ষা হোক আনন্দময়, স্বতঃস্ফূর্ত। পিতা-মাতার পরেই যিনি সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার মন্ত্র শেখান। পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে তাঁর যথাযথ মূল্যায়ন হোক। তবেই এদেশে মানসম্মত শিক্ষার প্রসার ঘটবে।

Disconnect