ফনেটিক ইউনিজয়
পথে পথে
‘সমাজের যত অসাম্য বৈষম্য দূর করতে চাই’
দীপংকর গৌতম

কর্মব্যস্ত দুপুরে এক পত্রিকা অফিসে হঠাৎ দেখা হয়ে যায় হালকা লিকলিকে উজ্জ্বল স্বপ্নবান এক তরুণের সাথে। চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে এই তরুণ কাজ করেন বরিশাল শহরে। লাল-সবুজ নামে একটা মাসিক পত্রিকার সম্পাদকসহ অনেক কাজের কাজী তিনি। নাম তাহ্সীন উদ্দীন। শোনা হলো তার বিচিত্র সব কাজের কথা।
‘তখন বরিশাল জিলা স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। ক্লাসে সজীব নামে আমার এক সহপাঠী দুষ্টামি করছিল। কিন্তু স্যার মনে করলেন আমি দুষ্টামি করেছি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে আচ্ছামতো পিটালেন। বাসায় গিয়ে স্যারের নামে একটি রম্য লিখলাম। আর সেটা দেখলেন আমার খালামণি। খালামণিই তখন একটি পত্রিকা বের করার বুদ্ধি দিলেন। পরে ছোট মামার সহযোগিতায় ফটোকপি করে পত্রিকার প্রথম সংখ্যা বের করলাম’। এভাবেই কথাগুলো বলেছিলেন ছোটদের ‘মাসিক লাল সবুজ’ পত্রিকার সম্পাদক  ও দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার ফিচার লেখক তাহ্সীন উদ্দীন।
ছোটবেলা থেকেই শান্ত স্বভাবের তাহ্সীন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। তার ধ্যান-জ্ঞানের পুরোটাজুড়েই ‘লাল সবুজ’ পত্রিকাটি। সাংবাদিকতায় অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে ইউনিসেফের মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার ফিচার পাতায়ও নিয়মিত লেখেন তাহ্সীন।
২০১০ সালে বরিশাল জিলা স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র তাহ্সিন টিফিনের জমানো টাকা আর মামার সহযোগিতায় ‘মাসিক লাল সবুজ’ পত্রিকার কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে পত্রিকার সংখ্যা বাড়তে লাগল। ৩০০ টাকায় বের হলো ৫০ কপি মাসিক ‘লাল সবুজ’। ২০১০ সালের মে মাসে প্রকাশিত প্রথম সংখ্যার পাঠক আর লেখক ছিল অবশ্য বরিশাল জেলা স্কুলের ছাত্ররাই। তবে সাড়ে নয় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে এখন ‘লাল সবুজ’র মুদ্রণ সংখ্যা তিন হাজারের বেশি। বের হয় চার রঙের। পুরো ৮ পাতাজুড়ে শিশুদের জন্য থাকে আকর্ষণীয় সব বিষয়। আছে অফিস, যেখানে নিয়মিত মিটিং ও কাজ করে চলেছে একঝাঁক ক্ষুদে লেখক ও পত্রিকা সম্পাদনার দল। এ ছাড়া ক্ষুদে লেখক তৈরিতে প্রতিবছর চার মাসব্যাপী কর্মশালার আয়োজন করছে তারা।
শুধু লেখালেখির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় ‘লাল সবুজ’র লেখকরা। বয়সে ছোট হলেও সামাজিক দায়বদ্ধতার চেতনা তৈরি হয়েছে তাদের। ২০১২ সালে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ঈদের নতুন জামা উপহার দিতে একটি স্বচ্ছ বাক্সে সামর্থ্যবানদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে দলটি। এভাবে বাড়তে থাকে আরো নানা নতুন উদ্যোগের ধারণা। এভাবে দিন দিন সামাজিক নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সব মহলের প্রশংসা পায় মাসিক ‘লাল সবুজ’র সারথীরা।
২০১৫ সালে ‘লাল সবুজ সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন তাহসান। বিভিন্ন বয়সী উদ্যমী তরুণদের নিয়ে নানা কাজ করছে এ সংগঠনটি। ঈদে ও শীতে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের  পোশাক ও খাবার বিতরণ, পিঠা উৎসব আয়োজন, ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে বরিশালের বিভিন্ন বিল বোর্ড ও নামফলকের অশুদ্ধ বানান শুদ্ধ করার উদ্যোগ, বৃদ্ধাশ্রমের নিবাসীদের নিয়ে ভালোবাসা দিবস পালন, প্রতিটি ওয়ার্ডকে আদর্শ ওয়ার্ডে রূপান্তরিত করতে ‘প্রজেক্ট স্বপ্ন নগর’, বিজয় দিবস উপলক্ষে সড়কে আলপনার মতো নানা কাজ করে যাচ্ছে লাল সবুজ সোসাইটি।
এসব কাজ করতে বিভিন্ন বাধা আসে না? এমন প্রশ্নের জবাবে তাহ্সীন বলেন, স্বপ্নের পথে এগোতে গেলে বাধা তো আসবেই। এসব বাধা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে চলার নামই সফলতা। আমি সবকিছু ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে চেষ্টা করি। বাধার কথা বলতে গেলে এমন অনেক ঘটনা আছে। কিন্তু আমি মনে করি এসব বাধা পেরুনোর শক্তিই আমাদের সাফল্যের শিখরে নিতে সহায়তা করবে। সম্প্রতি তার নতুন প্রজেক্ট শুরু হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে তিনি ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে গড়ে তুলেছেন প্রজেক্ট অপরাজিতা। প্রত্যেক স্কুলের মেয়েদের আত্মরক্ষার জন্য তিনি দক্ষ প্রশিক্ষকদের দিয়ে মার্শাল আর্ট শেখান। এখন তার অপরাজিতার শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক হাজার।
তাহ্সীন আরো বলেন, লাল সবুজ পত্রিকার কারণে বরিশাল তো বটেই বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। অনেক মানুষ, অনেক কিছু সম্পর্কে জানতে পেরেছি। শিখেছি জীবন কতটা সুন্দর, কতটা আনন্দময়। আর সব থেকে বড় অর্জন অনেক মানুষের ভালোবাসা। সত্যিই এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না। এই ক্ষুদে কর্মবীরকে জিজ্ঞেস করি তার স্বপ্নের কথা। তিনি বলেন,  সমাজের যত অসাম্য-বৈষম্য দূর করতে চাই। এটাই আমার স্বপ্ন।

Disconnect