ফনেটিক ইউনিজয়
পাঠকের কলাম
শারদ ভাবনা: সম্প্রীতির শিক্ষা বিকশিত হোক
সুমিত বণিক

শারদীয় উৎসব এদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই ভাব-গাম্ভীর্য ও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে, দুর্গা শব্দের অর্থ যিনি দুর্গতি নাশ বা সংকট থেকে পরিত্রাণ করেন। অন্যমতে, দুর্গম নামক অসুরকে বধ করেছিলেন বলে তাকে দুর্গতিনাশিনী বলা হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাঁকে মহাশক্তির একটি আধার মনে করেন। তাঁর অন্যান্য নামসমূহ হলো, চণ্ডিকা, যোগমায়া, অম্বিকা, বৈষ্ণবী, মহিষাসুরসংহারিণী নারায়ণী, মহামায়া, কাত্যায়নী ইত্যাদি। দেবী দুর্গার অনেকগুলি হাত। তাঁর অষ্টাদশভূজা, ষোড়শভূজা, দশভূজা, অষ্টভূজা ও চতুর্ভূজা মূর্তিও দেখা যায়। তবে দশভূজা রূপটিই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। তাঁর বাহন সিংহ। মহিষাসুরমর্দিনী-মূর্তিতে তাঁকে মহিষাসুর নামে এক অসুরকে বধরত অবস্থায় দেখা যায়।
ভক্তের ভক্তি, শ্রদ্ধা, আর প্রার্থনায় মনের আর্তি জানানোর এ উৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজস্ব পার্বণ হলেও সেটি এখন আর শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন সমগ্র বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটি অংশ। অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে সরকারও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ এ আয়োজনে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করে থাকে। সেই সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তৎপর থাকে যে কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে প্রতিহত করতে। অপ্রিয় হলেও প্রকৃত বাস্তবতা হলো, এতসব আয়োজন সত্ত্বেও কোথাও কোথাও দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। যেমন সম্প্রতি নীলফামারীর ডোমারে দুর্গাপূজা উপলক্ষে লক্ষ্মী প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত বাংলাদেশে পূজা উদযাপন পরিষদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সারা দেশে পূজা মণ্ডপের সংখ্যা ৩০ হাজারেরও বেশি। ২০১৭ সালে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে পূজামণ্ডপে এ সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার ৭৭টি। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ৩৯৫। তাদের ভাষ্য, পূজার মণ্ডপ বাড়লেও, নিরাপত্তা ব্যবস্থা সেভাবে বাড়েনি। যার ফলে বাংলাদেশে পূজারীর সংখ্যা দিন-দিন কমে যাচ্ছে।
গতবছর বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে শারদীয় দুর্গোৎসবকে আরও আড়ম্বরভাবে উদযাপনের জন্য বঙ্গভবন, গণভবন, নগরভবন ও জেলা পর্যায়ের সরকারি ভবনগুলোতে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। সেই সাথে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে দাবি করা হয়েছিল, পূজায় তিনদিনের সরকারি ছুটি ঘোষণার পাশাপাশি দেশের সব কারাগারে উন্নত খাবার পরিবেশন, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট বাতিল করে হিন্দু ফাউন্ডেশন গঠন, উৎসব চলাকালে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষাসহ নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত রাখা এবং পুজোর সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বে একজন অন্যতম সুবিবেচক ও মানবতার ধারক হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, হিন্দু ধর্মাবলম্বী নেতৃবৃন্দের এসব দাবি তাঁরই হাত ধরে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।
আমরা স্বপ্ন দেখি বাংলার শান্তিকামী, অসম্প্রদায়িক, শুভবোধসম্পন্ন মানুষের পদচারণায় মুখরিত হবে এ বারের শারদীয় দুর্গোৎসব। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এ স্লোগান মানুষে মানুষে ভাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতির শিক্ষাকে আরো বিকশিত করবে। সংকীর্ণতার জাল ছিন্ন করে উন্মেষ ঘটবে মুক্তচিন্তার। সবশেষে ধর্মীয় সকল উৎসবই হোক সম্প্রীতির বন্ধনকে আরো দৃঢ় করার অন্যতম মাধ্যম।

Disconnect