ফনেটিক ইউনিজয়
কলকাতার ডায়েরি
মফস্বলের বাতিওয়ালা

মফস্বল মানেই সদরের জৌলুসহীন একটা ম্যাঁড়ম্যাঁড়ে জীবন। সাত, আটের দশকের মফস্বল মানে তো কেমন আলো আঁধারের ভৌতিক উপস্থাপন। সন্ধ্যে হলেই বোমা, গুলির দাপটে এপাড়ার লোক ওপাড়াতে যেতে ভয় পায়। এই বুঝি উটকো কোনো উৎপাত ঘাড়ে এসে জোটে- এমন আতঙ্কে সূর্যিমামা পাটে নামতেই লোকজন মানে মানে ঘরে ফিরে আসতে পারলেই বাঁচে। রেললাইনের পূবপাড় ছিল বোমা, গুলি, বন্দুকের স্বর্গরাজ্য। জরুরি অবস্থা আমাদের সামাজিক জীবনে ভয় এবং আরোপিত শৃঙ্খলার যে বাতাবরণটুকুই নিয়ে আসুক না কেন মফস্বলি দিনকালের সন্ধ্যেবেলা কোন ছাড়, ভরা বিকেলটিকেও এইসব বোমাবাজির হাত থেকে নিস্তার দিতে পারেনি। রেল ওয়াগন ঘিরে যেমন ছিল এলাকা দখলের লড়াই, তেমনি ছিল সিনেমাহলকে ঘিরে টিকিট ব্ল্যাকারদের স্বর্গরাজ্য।
আমাদের বাড়ির কাছেই ছিল একটা সিনেমাহল। বাজার চলতি সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত হিন্দি ছবির জন্যে ছিল সেই সিনেমাহলটির তথাকথিত খ্যাতি। খ্যাতির বিড়ম্বনা হিসেবেই ছিল টিকিট ব্ল্যাকারদের বাড়বাড়ন্ত। খানিকটা পাড়া ঘরের মধ্যেকার সিনেমাহল। ওয়াগানব্রেকারদের সংস্কৃতি আর এই সিনেমা হলের টিকিট ব্ল্যাকারদের ভেতরের আদবকায়দাতে তেমন একটা মিল দেখা যেত না। ওয়াগান ব্রেকাররা ছিল পেশাদার অপরাধী। আর আমাদের পাড়ার সিনেমাহলের ব্ল্যাকাররা ছিল নেশাদার অপরাধী। বেকার সমস্যার ক্রমবর্ধমান সময়ের জলছবি। এদের হয়তো সামান্য কিছু বিদ্যে পেটে ছিল। পারিবারিক যোগসূত্রে অপরাধের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই এইসব টিকিট ব্ল্যাকারদের তখনো গড়ে ওঠে নি।
প্রফুল্লচন্দ্র সেন আমাকে একবার বলেছিলেন; মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন কলকাতা শহরের একশোটা পানের দোকানে ডা. বিধানচন্দ্র রায় একটি সমীক্ষা চালিয়েছিলেন। সেই সমীক্ষাতে তিনি দেখিয়েছিলেন, প্রায় নব্বইটি পানের দোকানের মালিক অবাঙালি। বাকি গোটা দশেক দোকানের মালিক হলেন বাঙালি। বিধানবাবুর এই সমীক্ষার চালচিত্র কিন্তু আমাদের মফস্বল শহরগুলির পাড়ার ভেতরে সেই ছয়, সাত এমনকি আটের দশকেও সিনেমাহলগুলির টিকিট ব্ল্যাকারদের পরিচয়ের সঙ্গে মিলবার সম্ভাবনা ছিল না। মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবনে আর্থিক সঙ্কটের ভয়াবহতার সেই যুগসন্ধিক্ষণ কিন্তু মফস্বলি জীবনের মধ্যবিত্ত ট্যাবু ভাঙার কাল। সমরেশ বসু তাঁর সৃষ্টিতে এই সময়কালের ক্রান্তিলগ্নের ছবি আঁকতে গিয়ে বাঙালি জীবনের টালমাটাল অবস্থার চালচিত্র নির্মাণে চটকল শ্রমিক হিসেবে মধ্যবিত্ত বাঙালির যোগদানের কথা লিখেছেন। তারও পরের সময়কালে মফস্বলি মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের একটু বখাটে ছেলেরা তখন ইতিউতি দু’-এক পয়সা কামাতে পাড়ার সিনেমা হলের টিকিটের দিকে চোখ ফেলতে শুরু করেছে আর কী।
এই ছবিটাই সবটুকু ছিল না। দুপুর গড়ালেই দম আটকে আসা সময়কে অতিক্রম করতে ছিলেন মফস্বলের বাতিওয়ালারা। ছিলেন ধীরেনদা, দুলালদা, বিজয়দা, অসীমদারা। এইসব বাতিওয়ালাদের জন্যেই সেদিনের তমসাময় সময় থেকে উত্তরীত হতে পেরেছিল মফস্বল। মফস্বলের সেই বাতিওয়ালা অসীমদার কথা আজ একটু বলা যাক।
অসীম সরকার। নৈহাটির বাতিঘর “সরস্বতী বুক স্টলে”র প্রাণ পুরুষ। যখন চারিদিকে ঘন অন্ধকারে আমরা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ি, তখন এই অসীমদার মতো মানুষেরাই দেন আলোর সন্ধান। অসীমদার গ্রাসাচ্ছাদন হয় বই বেচে। তাবলে তিনি কিন্তু আর দশটা মামুলি ব্যবসায়ীর মতো নন। অসীমদা ছাত্রদের বন্ধু, গবেষকদের পরম সহায়। গরিব, মেধাবী বিদ্যার্থীর একান্ত আশ্রয়। আবার আমাদের ছোটকাল থেকে এই বুড়োকাল পর্যন্ত দেখে আসছি, মফস্বলে প্রেমে পড়া ছেলে মেয়েদের নিজস্ব ভরসার স্থলও অসীম সরকার নামক এই চিরনবীন মানুষটি।
বাংলার শিল্প সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র আজকের বাংলাদেশের পাবনা টাউনে রয়েছে অসীমদার শেকড়। তাই হয়তো অসীমদার মনের বিশালত্বের সঙ্গে একমাত্র তুলনা চলে চলনবিলের ব্যাপ্তির। চলনবিল যেমন কতোশত বিলকে নিজের শরীরের ভিতরে ধারণ করে শান্ত, সমাহিত, আমাদের এই অসীমদাও তেমনিই; “একের অনলে বহুরে আহুতি দিয়া জাগায়ে তুলিল একটি বিরাট হিয়া।” অসীমদার মুখের হাসি দেখলে আমার মনে হয় চলনবিলের টলটলে জলে ফুটে রয়েছে থোকা থোকা লাল শাপলা।
অসীমদার এই বাতিঘর থেকে সমরেশ বসুর বাড়ি ছিল ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে। কতো কর্মব্যস্ত দিনে একটানা লিখতে লিখতে ক্লান্ত সমরেশ বসু যে একটু হাওয়া বদলের তাগিদে, চলে আসতেন প্রিয় অসীমের কাছে- তার কোনো হিসেব-নিকেশ নেই। অসীম সরকার ছিলেন বলেই বাঙালি সমরেশ বসুর প্রায় হারিয়ে যাওয়া লেখাগুলিকেও তাঁর রচনাবলীর এক মলাটের ভিতরে আজ দেখতে পাচ্ছেন। অসীমদার এই কাজকে সমরেশ বসু রচনাবলীর সম্পাদক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ও সানন্দে স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন।
এইসব কাজ যে অসীমদা করেন, তার পিছনে তার কোনো ব্যবসায়িক অভিসন্ধি থাকে না। খানিকটা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতোই এইসব কাজ বছরের পর ধরে করে চলেছেন। কেবল নৈহাটি নয়, আশপাশের মফস্বলি মানুষজনদের ভিতরে যাদের একটু লেখালেখির শখ আছে, তাদেরই বড় আপনার জন এই অসীম সরকার, বড় রকমের ভরসাস্থল। এই তো দেখলাম, কিছুদিন আগে এক রাজনৈতিক কর্মী তাঁর এলোমেলো কিছু লেখা এক জায়গায় করে পকেটের টাকা খরচ করে একটা বই করেছেন। বইটির মাথামুণ্ডু কিছু নেই। তিনি হয়তো কোনোদিন কোনো খবরের কাগজে চিঠি লিখেছিলেন, সেই চিঠিও যেমন সেই বইতে আছে, আবার আছে প্রায় স্কুল ম্যাগাজিনে হাত পাকানো লেখার ধাঁচের কিছু লেখা। সেই ভদ্রলোক অনুরোধ করেছেন অসীমদাকে বইটির প্রকাশক হতে, চলনবিলের উত্তুরে হাওয়ার ঢলকের মতো হাসি হেসে এককথাতে রাজি অসীমদা। অমন একটা অদরকারী বইয়ের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত হলে তার ব্যবসাতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে কি নাÑ এসব নিয়ে ভাববারই অবসর নেই সদা হাস্যময় মানুষটির। অসীমদার যুক্তি হলো; একজন মানুষ অনুরোধ করেছে, আর আমি তাঁর অনুরোধটা রাখবো না? এড়িয়ে যাবো? ধুস, তা আবার হয় নাকি!
এমন টাই অসীমদা। তার এই ‘এমন’ আচরণ কিন্তু আজ অসীমদার প্রায় প্রৌঢ়ত্বের কালেই নয়। সেই সাতের দশকের গোড়ার দিকে বা মাঝের দিকে যখন বোমা, গুলি, বন্দুকের ভয়ে সূর্যিমামা পশ্চিমে হেললেই আমরা বাড়ির ভিতরে সিঁদোতাম, সেই সময়কাল থেকেই। যুগ যুগ ধরে মফস্বলের গরীব, মেধাবী ছাত্রদের ভরসাস্থল অসীমদা। টাকার অভাবে বই কিনতে পারছে না, তাই অমুকের পড়া আটকে আছে? কাকপক্ষী টের পেল না, সেই ছাত্র বা ছাত্রীর কাছে অসীমদার স্নেহচ্ছায়া পৌঁছে গেল। আর্থিক বা সামাজিকভাবে অসহায় ছাত্রদের প্রতি এই দরাজহাতের ধারাবাহিকতা বছরের পর বছর ধরে বজায় রেখে চলেছেন। অথচ কোনো প্রচার নেই। ওর ডান হাত কি করে, সেটা ওর বাহাতকে জানতে দেন না। অনেক মানুষের ভিতরেই হয়তো সহযোগী মানসিকতা থাকে। কেউ কেউ হয়তো অসহায় মানুষের প্রতি আর্থিক সহায়তাও করেন, কিন্তু তাঁদের সেই সহায়তার প্রচারে স্বয়ং গোয়েবলসও বোধহয় লজ্জা পাবেন। অসীম সরকারের মানুষের প্রতি সহমর্মিতার হাতের কোনো প্রচার নেই। আত্মপ্রচার- এই শব্দটিই বোধহয় অসীম সরকারের জীবনের সবথেকে অপছন্দের শব্দ। তিনি কাজ করেন নীরবে-নিভৃতে।
সেবার এই নিভৃত সাধনে অসীম সরকার একজন সিদ্ধ পুরুষ। বিদ্বেষ বলে শব্দটি তাঁর জীবন অভিধানে নেই। কাউকে তিনি কটু কথা বলেছেন- এই মফস্বল ছেচে এমন একটি মানুষকেও হাজির করতে পারা যাবে না। অথচ বিড়ম্বনা কি তার জীবনে আসে না? আসে বলেই বোধহয় অসীম সরকারদের মতো মানুষদের জীবনলীলার পোষ্টাই হয়! এই ক’দিন আগে লাগোয়া মফস্বল শহরের এক তথাকথিত বিদূষী দোকানদার অসীম সরকারকে একটা বই এনে দেওয়ার হুকুম দিলেন। সেই বিদূষীর আবার মফস্বলী কেতায় অপর্ণা সেনের ‘পরমা’র সঙ্গে সাদৃশ্য আছে বলে দুষ্ট লোকেরা বলে থাকে। ছায়ার চরিত্রকে কায়ায় দেখেও অসীমদাদের মতো মানুষদের কোনো হেলদোল হয় না বলেই আজ সদরের সঙ্গে সমান তালে টেক্কা দেয় আমাদের মফস্বল। তাই পরমাদির স্বামী যখন স্ত্রীর হুকুম তামিল করতে অসীমদার আলোখানাতে বই নিতে আসে, সেই ক্রেতার ঔদাসীন্য পীড়া দেয় মানুষের মতো মানুষ অসীম সরকারকে।
মফস্বলের ক্লান্ত ডানাতে ঘরে ফেরার গান শোনা যায়। তরুণ বিদ্যার্থীর মেধাবী পদচারণাতে যেমন অসীমদার দরবারের সব আলো জ্বলে ওঠে, তেমনিই মফস্বলি ‘পরমা’দের খুঁড়িয়ে চলা থপথপে পায়ের আওয়াজে সেখানে ধুলোও জমে। অসীমদা যেমন জানেন জ্বলে ওঠা আলোকে দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছড়িয়ে দিতে, তেমনিই জানেন মফস্বলি পরমাদের ক্লেদাক্ত ধুলোকে এক লহমায় ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিতে। আলো যেমন ছড়ায়, তেমনই হয়তো কখনো কখনো ছড়িয়ে পড়ে ক্লেদ। তবে ভরসা এটাই যে, কোথাও একটু কালো দেখলে আলো জ্বালাটা যে অসীম সরকারদের জীবনের ব্রত। তাই তো জেগে জৌলুসে। আর সেই আলো জ্বালান মফস্বলের বাতিওয়ালা অসীম সরকাররা।
সদরের চাকচিক্য অসীম সরকারের ভিতরে কোনোদিন ছিল না। বোধকরি শহুরে চাকচিক্য এই অসীম সরকারদের মতো অতি বিরল প্রজাতির মানুষদের ভিতরে থাকেও না। আর এঁরা শহুরে চাকচিক্যের পরোয়ায় বুঝি বা করেন না বিন্দুমাত্র। তাই অসীমদার চেহারা চরিত্তির ভিতরে নেই কোনো শহুরে ঠাটবাট। অতি সাধারণ জামাকাপড়। এতোকাল সাইকেল নিয়ে যাতায়াত করেছেন। হালে বয়সের কারণে পায়ের সমস্যা। তাই কিছুটা বাধ্য হয়েই বাইকে যাতায়াত করেন।অসীম সরকার তাঁর গোটা জীবনটা দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, ব্যবসা করে ও একজন ভালো মানুষ হওয়া যায়। এই যে আমাদের মধ্যবিত্ত মানসিকতাতে শিক্ষক, সরকারী কর্মচারী ইত্যাদিদের আমরা যতোখানি সামাজিক মর্যাদা দিই, সম্ভ্রমের আসনে বসাই, তার বিন্দুমাত্র দিই না ব্যবসায়ীদের- ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে সেই প্রচলিত ধারণাটা ভেঙে চুরে তছনছ করে দিয়েছেন অসীম সরকার। নিজের ব্যবসায়ী তকমাটা একটা সামাজিক স্বীকৃতির ভিতরে এনে মানুষের শ্রমের অধিকারকেও একটা বড় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন অসীম সরকার এবং তাঁর মতো মানুষেরা।

Disconnect