ফনেটিক ইউনিজয়
কেন এই অপচয়!

সেদিন শুনলাম এক বিয়েতে নাকি ছোটখাটো প্রোগ্রাম। ছোটখাটো বলা হলেও এনগেইজমেন্ট আর আক্দ মিলে বেশ বড় মাপের ও জাঁকজমক করে অনুষ্ঠান হয়েছে মোট ১০টি। ভাবা যায়! আমার তো এক বিয়েতে যেয়ে তারপর বৌভাতে যেতে হলেও মাথার ওপর বাজ পড়ে। কি পরে যাবো, সেই চিন্তাটা খুব মামুলি। কিন্তু দুশ্চিন্তা হলো সময় ও কাজকে ম্যানেজ করা। যানজট নামের মামদো ভূতের দেশে ওরা পারে কি করে এতগুলা অনুষ্ঠান আয়োজন এবং অংশগ্রহণ করতে?
সেই ১০ প্রোগ্রামের শুরুটা ‘মিলাদ মাহফিল’ দিয়ে। প্রোগ্রামের হিসেবে ৯ নম্বরে যেয়ে আটকে গেছি, সান’গীত (সাবধান! ‘সংগীত’ বললে আবারও কিন্ত ‘মিডল ক্লাস’ ‘সেকেলে’ কিংবা ‘খ্যাত’ মানুষের খাতায় নাম লিখাবেন)। ম্যাহেন্দী, ব্রাইডাল শাওয়ার, ব্যাচেলর্স নাইট, হালদী ১, ২ (হলুদ না, হাল’দী), নিকাহ (‘বিয়ে’ বললে আপনি বেজায় হাসির খোরাক যোগাবেন!) তারপর রিসেপশন; মানে বৌভাত। হলো ৯টা। আর শেষটা যে কি! আপনি চেষ্টা করে দেখতে পারেন, পান কিনা! হিন্দি সিরিয়াল অনুসরণ শেষ করে আমরা আজকাল নাকি পাকিস্তানি সিরিয়াল চোখ বেঁধে হৃদয়ের কোটরে ভরে নিয়েছি। তাই ১০টার জায়গায় ২০টা হলেও অবাক হবো না। আমরা খুবই উদারমনা, ‘কুল’ জাতি হয়েছি কিনা আজকাল!
যাই হোক, সেতো না হয় গেল এলাহী বড়লোকদের বিয়ে। তাদের পয়সা ফেলার জায়গা নাই; তাই তারা ফেলুক ১০ জায়গায় মানলাম! কিন্তু এই মধ্যবিত্তের কেন এই ‘ঘোড়ারোগ’? শুনলাম মধ্যবিত্তের ঘরেও নাকি আজকাল শুধু একদিনের প্রোগ্রামে ৫/১০ লাখ টাকার ডেকোরেশন হয়! তারপর আছে খাওয়ার খরচ, হল ভাড়া। বুঝি না, একে কি আমাদের অর্থনৈতিক দাসত্ব বলবো, নাকি নৈতিকতার অবক্ষয়? আমি আমার সন্তানের বিয়ে জাঁকজমকভাবে দেবো, সে চাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক; কিন্তু এই অহেতুক খরচের বহর যখন আমার পুরা সমাজ, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের ভেতর অসুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে শিক্ষক হিসেবে তা মানতে এবং দেখতে আমার কষ্ট হয়।
আপনার বিয়ে শাদীর অনুষ্ঠানগুলোর বৈভবের এই কুৎসিত ‘নিষ্কলুষ’ লোক দেখানো প্রতিযোগিতায় হয়তো জিতে গেছেন, আজও হয়তো আলোচনা হয় আত্মীয়-স্বজনের মুখে মুখে আপনার এলাহী শান-শওকতের বাহার নিয়ে, কিন্তু হেরে গেছে, বলতে গেলে অনেকটা মরেই গেছে হাজারও মধ্যবিত্ত পরিবার। এরা আপনারই আত্মীয়-স্বজন।
ছেলে-মেয়েকে সাজিয়ে গুছিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান করতে সাধ তো হয় সবার। সবারই বিয়ে নিয়ে স্বপ্ন থাকে। যে স্বপ্ন বুনি আমরা সবাই সেই ছোটকাল থেকে। স্বপ্ন বুনি সেই একদিনের রাজকন্যা কিংবা রাজপুত্র হবার। স্বপ্ন বুনি সন্তানকে সাজিয়ে-গুছিয়ে সুন্দর করে বিয়ে দেবার। কিন্তু আজকাল এই চিরচেনা স্বপ্নকে জাঁকজমক আর নতুনত্বের নামে যে ‘এলাহী রূপে’ নিয়ে গেছি, তাতে স্বপ্ন চলে গেছে অনেকেরই সাধ্যের বাইরে।
বলতে পারেন, সাধ্যে না কুলালে করবেন না। যেমন আয় তেমনি তো ব্যয়টা হওয়া উচিত। পরম আদরের মেয়েকে বিদায় দিচ্ছে বাবা-মা, কলিজাটা তো ওইখানে ভেঙে খান খান। সেই মুহূর্তে মেয়ের শখ, ছেলে-মেয়ের ইচ্ছা, কিংবা ‘ছেলে-মেয়ের মুখ’ রাখার জন্য বাবা-মা যদি এখনকার দিনের এই অহেতুক খরচের বোঝাটা মাথায় চেপে নেন, তাকে অবাস্তববাদী বলে দেয়াটা খুব একটা অনুচিত হবে বলে আমি মনে করি না।
আমার অবাক লাগে ভাবতে, এই ছেলে-মেয়েগুলোর বিচার বুদ্ধির মাত্রা নিয়ে। এরাতো জানে তাদের বাবা-মার সামর্থ্য কতটুকু। কেমন করে পারে একের পর এক বায়না জুড়ে দিতে? অথবা আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিতে অনুষ্ঠানের চাকচিক্য আমি কতটুকু চাই। বিবেকের বলিহারি।
বিয়ে সমাজের ধারক ও বাহক। দু’টা মানুষের সঙ্গে সঙ্গে দু’টো পরিবারের আত্মীয়তার বন্ধন কিংবা বলা যায়, এক নতুন পরিবার। বিয়ের অনুষ্ঠান মানে তো আনন্দেরই হবার কথা। আগে মা-খালাদের দেখতাম বিয়েতে যাবার আগে আলমারি থেকে কাতান নামাতেন, লকার থেকে গয়না নামিয়ে বেশ সেজে-গুজেই যেতেন। বেয়াই বাড়ির আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে পরিচয় হবে তাই পার্লারেও যেতেন কেউ কেউ। অনুষ্ঠানের গতানুগতিক দৃশ্য ছিল, দু’পক্ষের মুরুব্বিরা পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এর সঙ্গে ওর সঙ্গে। পরিবারের সবাই যেয়ে বর বউকে দোয়া শুভেচ্ছা দিয়ে আসছেন। ব্যাকগ্রাউন্ডে সানাই বাজছে। পোলাও কোরমা খাওয়া হচ্ছে। সবার সাথে দেখা হওয়া ওটাই মুখ্য। আর বউ দেখাটা ছিল মহাআকর্ষণ। বউ লাল শাড়ি পরে যেন লাজুক মুখে সাক্ষাৎ পরী।
আর এখন, ওমা একি! বর বউ দেখবো কি? অপেক্ষায় থাকলে নির্দিষ্ট সময়ে হ্যালির ধূমকেতুও দেখতে পাবেন; কিন্তু অতিথি আসনের সামনের কাতারে বসেও মিলবে না বর-বউয়ের দেখা! দেখবেন কিভাবে? স্টেজের সামনে দুইপক্ষ থেকে আসা ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ মানে ডিএসএলআর ক্যামেরা আর ফটোগ্রাফারদের ইয়া বিশাল বিশাল ছাতা দিয়ে সব ঢাকা। এখনকার বিয়ের প্রোগ্রামে কাজীর চেয়ে এই ডিএসএলআর ক্যামেরাওয়ালাদের দাম বেশি। কাজী না এলেও বিয়ে হবে, কিন্তু ফটোগ্রাফার ছাড়া বিয়েÑ অসম্ভব।
ফটোগ্রাফারই এখন পুরো অনুষ্ঠানের ডিরেক্টর। তারাই নির্ধারণ করেন বর-বউয়ের পাশে বসে কতক্ষণ কথা বলতে পারবেন। স্টেজে উঠে আজকাল বর-বউ দেখে আগে-পরে গোছগাছ করে বসে একটা ছবি তোলেন। এরপর ক্যামেরাওয়ালাদের সহকারী হাতের ইশারায় আপনাকে নেমে যেতে বলবেন, আপনিও নেমে যেতে বাধ্য, কারণ পেছনে লম্বা লাইন।
আবার সবার সামনে বর-বউয়ের ছবি তোলার হিড়িক। কাঁধে হাত মাথায় হাত, সামনে কাত পেছনে কাত, হাতে হাত; কত-শত ভঙ্গিমায় কি অবলীলায় যে ছবি তোলা হচ্ছে; ভাবতে পারবেন না! কোথায় যে গেল সেই লাজুক লাজুক মুখের পরীর মতো বউগুলা।
নারী উন্নয়ন এবং নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে গলা ফাটিয়ে ফেলছি একেকজন। নারীর এগিয়ে চলার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তার আত্মবিশ্বাস, আত্মপ্রত্যয় আর দূরদর্শিতা। জেন্ডার ডাইভার্সিটি নিয়ে গবেষণা করা দেখে ভীষণ খুশি হই। যখন দেখি মেয়েরা ফেসবুক টুইটারকে পুঁজি করে স্বাবলম্বী হচ্ছে, টুকটাক কাজ দিয়ে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হয়ে উঠছে, তখনও খুশি হই। আমার মনে হতে থাকে, এইতো শুরু। কিন্তু আমার আশার মুখে কেউ যেন কষে চড় দেয়, যখন দেখি ব্যবসা সফল সেই মেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়- তার সারা জীবনের লক্ষ্য আজ অর্জিত হলো। কারণ তিনি তার বিয়ের জন্য সব্যসাচীর লেহেঙ্গা কিনতে পেরেছেন। সেই লেহেঙ্গা কেনার সময়ক্ষণ, ডিজাইনারের সঙ্গে ছবি এবং তার নিচে ক্যাপশন ‘ফাইনালি আই হ্যাভ এচিভড হোয়াট আই ড্রেমট থ্রু আউট মাই লাইফ’! মানে? তার ব্যবসা, তার আত্মপ্রত্যয়ী হওয়ার গল্প, যা কিনা তাকে গর্বিত করার কথা ছিল, কথা ছিল তার গল্প অনুপ্রেরণা জাগাবে আর দশটা মেয়েকে-সবকিছু ছাপিয়ে তার সফলতা হলো সব্যসাচীর লেহেঙ্গা কিনতে পারা! দূরদর্শিতা হায়, তুমি কাঁদো নীরবে।
যার যা ইচ্ছা করুক, খালি মনে হয়, এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সমাজ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মধ্যবিত্তের বাড়ছে ঋণের বোঝা। উচ্চবিত্তরাও যে সবাই কতটুকু সাদা টাকায় করছেন তাই বা কে জানে! কেমন করে ভুলে যাই এদেশের শতকরা কতভাগ লোক উচ্চবিত্তের তালিকায় পড়ে আর কতভাগ নিম্ন কিংবা মধ্যবিত্তের কোটায়। কেমন করে ভুলে যাই এই দেশে আমরা এমনই অনুকরণপ্রিয় সংবেদনশীল জাতি যেখানে ‘পাখি ড্রেস’ না পাওয়ায় অভিমানী কিশোরী আত্মহত্যা করে। বাবা-মা ‘বাইক’ দিতে না পারলে চোখের মণি সাত রাজার ধন ছেলে ঘুমের ওষুধ খেয়ে নির্বিকারভাবে বাবা-মায়ের স্বপ্নকে হত্যা করে। সেখানে ‘বিয়ে তো একবারই হয়’ সেøাগানের মোড়কে মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে দেবার খেলা কী পরিণাম বয়ে আনতে পারে সে হিসেব কষা কি কঠিন কিছু?

Disconnect