ফনেটিক ইউনিজয়
রেলওয়ে বাঁচলে মানুষ বাঁচবে

এই নিবন্ধে রেলপথের সমস্যা ও তার সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। ৫ পর্বের ধারাবাহিকটির আজ তৃতীয় পর্ব।

বাংলাদেশের সরকারি দপ্তরগুলোতে প্রায় অবধারিত বেশ কতগুলো ‘নিয়ম’ আছে, যার অন্যতম কাজ না করে টাকা লোপাট, উন্নয়নের কাজ থেকে সিংহভাগ টাকা তছরূপ, নানা ধরনের অজুহাত তৈরি, বিভিন্ন অযোগ্যতা বা অপরিণামদর্শিতার নিত্য-নতুন ব্যাখ্যা হাজির করাসহ পাশ কাটানোর কৌশল। এর মধ্যে সবচেয়ে ‘জনপ্রিয়’ পদ্ধতি হলো যে কোনো বাজেট থেকে টাকা মেরে দেয়া। এই ‘মেরে দেয়া’র কাজটি এমন নয় যে কেবল এই সরকারের আমলে হয়েছে। এটা একটা ধারাবাহিক কর্মোদ্যোগ। সব সরকারের আমলেই হয়েছে।
যে সময় রেলওয়ে খাতকে লোকসানে ফেলে, সড়কপথকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে যাত্রীদের সড়কপথ ব্যবহারে উৎসাহিত করার অভিযোগ উঠছে, সে সময়ে লোকদেখানো রেলপথ উন্নয়ন, জনপ্রিয় করার প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়। মুলত রেলপথের এইসব ম্যান্ডেটরি উন্নয়ন, বিকাশ এবং আধুনিকীকরণের নামে কোটি কোটি বৈদেশিক মুদ্রা প্রকল্প থেকে হাতিয়ে নেয়া হয়। আর অন্যান্য দপ্তরের মত সেই হাতিয়ে নেয়ার ঘটনাগুলো পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর চিরাচরিত ভাষায় বলা হয় ‘যদি প্রকল্পে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে’। ‘সৌভাগ্যবশত’ এইসব ক্ষেত্রে কখনোই ‘প্রমাণ’ পাওয়া যায় না।
এই অঞ্চলে রেলের বহু যুগ পার হয়েছে। কিন্তু কয়েকটি নতুন নির্মাণের বিপরীতে লোকসানের কথা বলে প্রায় দ্বিগুণ রেলপথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সেই সব রেলপথে কোটি কোটি টাকার সরঞ্জাম পড়ে থেকে থেকে নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও রেললাইনের উপর গাছপালা জন্মে রেলের চিহ্ন পর্যন্ত মুছে গেছে। তারপরও প্রতি বছর বাজেটে রেলওয়েকে লাভজনক, গণমুখী করার জন্য বিশেষ বাজেট প্রণয়ন করা হয়। সেই বাজেট বাস্তবায়নের ফলে কি কি উন্নতি হবে তার ফিরিস্তি সবিস্তারে বয়ান হলেও আসল উন্নতি দৃশ্যমান হয় না, হয় বেশুমার লুটপাট। যেমন ধরা যাক রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের স্ট্যান্ড রোড ভিক্টোরিয়া (এসআরভি) স্টেশনের দু’টি ট্র্যাক সংস্কার প্রকল্প প্রসঙ্গে। এই প্রকল্প হাতে নেয়া হয় ২০০৭ সালে। ১৭ কোটি টাকার প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়েছিল ২০১৩ সালে। নির্ধারিত ওই সময়ে প্রকল্পে কোনো কাজ হয়নি জানতে পেরে সম্প্রতি ১৭ কোটি টাকা ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। এ-সংক্রান্ত চিঠি পেয়ে দায়সারাভাবে স্টেশনটি চালুর লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর।
দীর্ঘদিন ধরে এসআরভি স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও এ প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি নজরে আসতেই সময় লেগেছে প্রায় পাঁচ বছর। স্টেশন পুনর্বাসন প্রকল্পের মেয়াদ শেষের পরও তেমন অগ্রগতি না হওয়ায় সেখানে লোডিং-আনলোডিং বন্ধ হয়ে যায়। এক রিপোর্টে বলা হয়েছে- ২০১৬ সালে রেলের পরিবহন বিভাগ এসআরভি স্টেশনের নামে আসা পণ্য সিজিপিওয়াই (চিটাগং পোর্ট ইয়ার্ড) স্টেশনের মাধ্যমে লোডিং-আনলোডিং শুরু করে। রেলের পরিবহন ও বাণিজ্য বিভাগ স্টেশনটি অকার্যকর বলে দাবি করেছে। কিন্তু ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও এসআরভি স্টেশন অকার্যকর থাকায় প্রকৌশল দপ্তরকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে রেলওয়ের বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছেন বিভাগীয় প্রকৌশলী-৩। এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি একটি ট্র্যাক চালু করে বিষয়টি সামাল দেয়ার চেষ্টা চালায় প্রকৌশল বিভাগ। যদিও ভারী মালপত্র খালাস-বোঝাইয়ের জন্য বিশেষায়িত স্টেশনটির অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন জরুরি বলে মনে করছেন রেলকর্মীরা।
রিপোর্টে আরও বলা হয়- “রেলের পরিবহন ও বাণিজ্যিক বিভাগের নথিতে দেখা গেছে, এসআরভি স্টেশনটি অকার্যকর থাকায় ২০১৬ সালে এ স্টেশনের কার্যক্রম সিজিপিওয়াইতে স্থানান্তর করা হয়। এতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ২৬ জুন পর্যন্ত আয় হয়েছে ৩ কোটি ৯৯ লাখ ৯৭ হাজার ১৫০ টাকা। এসআরভি স্টেশন সচল থাকলে পণ্যের পরিমাণ ও সরকারের আয় আরো বাড়ত”।
এই খাত থেকে যেভাবে যে কায়দায় চুরি হয়েছে সেটা অভিনব কোনো পথ নয়, বরং চিরাচরিত চুরির উপায়। কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে সেই চুরি উদ্ঘাটন করে রাষ্ট্রের মহামূল্য সম্পদ রক্ষা করতে পারত। তা তারা করেননি। তারা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করে অনির্দিষ্টকাল ধরে তদন্ত পরিচালনা করেছেন। কেন এমন ঘটে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষ জানেন, এসব নতুন কিছু নয়। আসলে কোনো সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুর্নীতিবাজ হলে নিচের স্তরের প্রায় সকল কর্মকর্তা সৎ হলেও তাতে খুব একটা ইতরবিশেষ পার্থক্য হয় না। আর কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা বিভাগের অধিকাংশ লোকজন দুর্নীতিবাজ হলে সেখানে তদন্ত করে কোনো লাভ হয় না। ওই প্রতিষ্ঠানটি তখন রাইসমিলের হলারের মত হয়ে দাঁড়ায়। তাতে যা-ই ঢালা হোক নেই হয়ে যাবে। রেলওয়ের দশা হয়েছে সে রকম। এর ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত আগাগোড়া দুর্নীতিবাজ লোকজনে ঠাসা। এখানে অপরাধের বিচার এবং শাস্তির বিষয়গুলোতে এত দীর্ঘসূত্রিতা যে এইসব অপরাধ বা দুর্নীতি বাংলাদেশে প্রায় নিয়মিত ঘটনা। এখানে চুরিটা শুরু হয় একেবারে শীর্ষদেশ থেকে।
ঢাকা-পায়রা রেলপথ নির্মাণের লক্ষ্যেই যুক্তরাজ্যের ডিপি রেলের প্রতিষ্ঠা। প্রতিষ্ঠানটির জনবল মাত্র ১১। আর পরিশোধিত মূলধন ১০০ পাউন্ড, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার টাকা। রেলপথ নির্মাণের কোনো অভিজ্ঞতাও এখন পর্যন্ত নেই ডিপি রেলের। যদিও ভুঁইফোড় এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই ঢাকা-পায়রা রেলপথ নির্মাণে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ৭৫০ কোটি ডলার বা প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির নকশা প্রণয়ন, অর্থায়ন, লাইন নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে ডিপি রেল। নির্মাণকাজে সহযোগিতা করবে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিআরসি)।
এক রিপোর্টে জানা গেছে, “২০১৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর লন্ডনে কোম্পানিজ হাউজে লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয় ঢাকা-পায়রা রেল লিমিটেড (ডিপি রেল), যার নিবন্ধন নম্বর ০৮৮২০৯৭৩। কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের মূল্য দশমিক শূন্য ১ পাউন্ড বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ টাকার সমান। মোট ১১ জনবলের মধ্যে একজন কোম্পানি সচিব হিসেবে নিযুক্ত। বাকিরা সবাই পরিচালক। তাদের বেশির ভাগেরই নিয়োগ ২০১৬ সালের ২ এপ্রিল ও তার পরে। পরিচালকদের মধ্যে আনিসুজ্জামান চৌধুরী নামে একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতও রয়েছেন। অন্যরা ব্রিটিশ নাগরিক (বণিকবার্তা, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৬)।” এ নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানটির কোনো মাথাব্যথা আছে বলে আজ অব্দি দেখা যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনবছর বয়সী এই ডিপি রেলের ব্রিটেনে কোনো কর্মকাণ্ড নেই। প্রতিষ্ঠানটিকে তাই কার্যক্রমহীন বা ডরম্যান্ট কোম্পানি হিসেবে মূল্যায়ন করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠান এনডোলে। তারা বলছে, প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের মধ্যে পাঁচজন সক্রিয়। এছাড়া একজন সক্রিয় কোম্পানি সচিব রয়েছেন। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ডিপি রেলের আর্থিক বিবরণীতে দেখা গেছে, এ দুইবছরই কোম্পানির মূলধন ১০০ পাউন্ডে অপরিবর্তিত রয়েছে। কি দারুণ ইনোভেশন আমাদের রেল দপ্তরের।
পায়রা সমুদ্রবন্দরসহ এ এলাকা ঘিরে গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করছে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ। ঢাকা-পায়রা রেলপথ প্রকল্পটিও তাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। কী যোগ্যতার ভিত্তিতে ডিপি রেলকে কাজ দেয়া হয়েছে তার জবাবে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বলেন, “কাজ শুধু ডিপি রেলকে দেয়া হয়নি। তাদের সঙ্গে রয়েছে রেললাইন নির্মাণে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান চীনের সিআরসি। মূলত তারাই (সিআরসি) নির্মাণকাজ করবে। অর্থ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করবে ডিপি রেল। নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এত বড় প্রকল্প আনকোরা কোনো প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করানোর প্রশ্নই আসে না। আমার বিশ্বাস, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ডিপি রেলের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা যাচাই-বাছাই করেই সমঝোতা চুক্তি করেছেন (প্রাগুক্ত)।”
ব্যাস! মিটে গেল ঝামেলা! মন্ত্রি যখন বলেই দিয়েছেন- ‘এত বড় প্রকল্প আনকোরা কোনো প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করানোর প্রশ্নই আসে না। আমার বিশ্বাস, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ডিপি রেলের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা যাচাই-বাছাই করেই সমঝোতা চুক্তি করেছেন।’ তখন আর এ নিয়ে প্রশ্ন তোলে কার ঘাড়ে ক’টা মাথা? তার পরও প্রশ্ন তুলতে হবে। কেননা এই রেল খাতের প্রত্যেকটি পাথরে, প্রত্যেকটি স্লিপার, নাট-বোল্টু, প্রতিটি চাকায় চাকায়, ইঞ্জিনের ধোয়ায় এদের মানুষের রক্ত ঘামের টাকা মিশে রয়েছে। দেশের প্রত্যেকটি মানুষের জানার অধিকার আছে কেন তাদের কষ্টের টাকায় এইসব ছিনিমিনি? রেলকে এভাবে দিনের পর দিন কোমায় না রেখে চিরতরে বন্ধ করে দিলেই তো পারে। যেহেতু সেটা পারছেন না, তাই রেলকে টিকিয়ে রাখার জন্য এর প্রত্যেকটি খাতে আয়-ব্যয়ের হিসেব জনগণকে জানাতে হবে। রেলকে প্রাণ সঞ্চার করার জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ব্যয়ের পাশাপাশি জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। কেবলমাত্র তবেই রেল বাঁচবে। জনগণ বাঁচবে। চলবে...

Disconnect