ফনেটিক ইউনিজয়
বাংলাদেশ বইমেলা কলকাতা ২০১৮
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির কড়চা

সেই কবে অন্নদাশঙ্কর তাঁর বাংলাদেশ অনুভূতির কথা লিখতে গিয়ে লিখেছিলেন; “আমার ভালোবাসার দেশ।” আজও এপার বাংলায় বসবাসকারী বাঙালির একটা বড় অংশ বাংলাদেশকে বুকের গহীনে ভালোবাসার দেশ হিসেবেই লালন করেন। “বাংলাদেশ”- এই নামটুকুর সংযোগই এপার বাংলার বহু মানুষের একটা বিশেষ আকর্ষণের বিষয়। মেধাচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষজনের কাছে তো বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বই, পত্র-পত্রিকা, গানের সিডি, ফিল্ম একটি আন্তরিক সমাদরের বিষয়।
তবে কলকাতা শহরে বাংলাদেশের বই সংগ্রহ করা বেশ কসরতের বিষয়। “নয়া উদ্যোগে”র মতো কলকাতাকেন্দ্রিক দু’-একটি হাতেগোনা সংস্থা বাংলাদেশের বই আনে। কিন্তু এদের কাছ থেকে বই কেনার ক্ষেত্রে একটা সাধারণ সমস্যা হলো, বাংলাদেশের বইয়ের সেখানকার টাকার মান অনুযায়ী দাম হয়। কিন্তু কলকাতার দোকানে বাংলাদেশের যে বই পাওয়া যায়, তারা ভারতীয় মুদ্রার নিরিখে সে অনুযায়ী দাম নেন না। বাংলাদেশের এক হাজার টাকা মূল্যের বইটি তারা ভারতীয় এক হাজার টাকা দাম দিয়ে বানরের পিঠে ভাগের মতো কিছু ছাড় দিয়ে থাকেন। ফলে সাধারণ ক্রেতার সমস্যা থেকেই যায়।
তাই এপার বাংলার বাংলাদেশের বইপিপাসু পাঠক চাতকের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকেন বইমেলার দিকে। “বাংলাদেশ বইমেলা” ঘিরে তাদের সীমাহীন প্রত্যাশা। বাংলাদেশের বই, বিশেষ করে পত্র-পত্রিকা এপার বাংলায় সহজলভ্য নয়। এসব নানা কারণে কলকাতা বইমেলাতে যেমন বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন ঘিরে এখানকার মানুষজনদের একটা বিশেষ রকমের উৎসাহ দেখা যায়, তেমনিই উৎসাহ থাকে “বাংলাদেশ বইমেলা”কে ঘিরে। তাই কলকাতার রবীন্দ্রসদন চত্বরে “বাংলাদেশ বইমেলা”  ঘিরে এপার বাংলার মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল চোখে দেখার মতো। কেবল ভিড়ই নয়। সেই মেলাতে কেনাকাটির বহরটি একেবারে খারাপ হয় না।
তবে রবীন্দ্রসদন চত্বরে “বাংলাদেশ বইমেলা”য় আয়োজনের দিক থেকে যে ত্রুটি ছিল, মেলার নতুন জায়গা মোহরকুঞ্জেও সেগুলো থেকে গেছে। বস্তুত বইমেলার আয়োজন উপলক্ষে বাংলাদেশ উপ-দূতাবাস এপার বাংলার এমন কিছু মানুষের সাহায্যকে বড় করে দেখেন, যারা নানা ধরণের বিতর্কে জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে একজন অধ্যাপক তথা এনজিও কর্মীকে বাংলাদেশ উপ-দূতাবাস কর্তৃপক্ষ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। বস্তুত সেই ব্যক্তিটি তাঁর নিজের সংগঠনের প্রচার এবং প্রসারের উদ্দেশে “বাংলাদেশ বইমেলা”কে সবরকমভাবে ব্যবহার করেন বলে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠছে। অথচ বাংলাদেশ উপ-দূতাবাস কর্তৃপক্ষের এ নিয়ে কোনো হেলদোল নেই।
বাংলাদেশের বইমেলা কি কেবলমাত্র বইবিক্রেতাদের? যাদের হাতে পয়সা নেই, অথচ রয়েছে বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রবল উৎসাহ, “বাংলাদেশ বইমেলা” কি তাদের নয়? বাংলাদেশ বইমেলা থেকে সেদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, সামাজিক বিন্যাস এপারের মানুষদের জানার একটা বড় রকমের সুযোগ আছে। এপারের বাংলাদেশপ্রেমী মানুষদের সেই সুযোগ করে দেয়ার এতোটুকু উদ্যোগ কোনো সময় চোখে পড়ে না। এবারের বইমেলাতেও সেই একই চিত্র।
একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশ সরকারই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিদেশ তো দূর, তাদের নিজেদের দেশের মানুষদের কাছেই তুলে ধরতে চাইতো না। কলকাতার বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনে বাংলাদেশের কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকারের স্বীকৃতির দাবি নিয়ে নয়ের দশকের গোড়াতে রীতিমতো হেনস্থার শিকার হতে হয়েছিল অন্নদাশঙ্কর রায়, গৌরকিশোর ঘোষ, ইলা মিত্র, আবদুর রাউফ প্রমুখ এপার বাংলার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের। সরকার পরিবর্তনের পর প্রকাশ্যে        উপ-দূতাবাসের এই নেতিবাচক মানসিকতার বদল হলেও, নিজের দেশের সংস্কৃতি, সামাজিক আচার আচরণ- এপার বাংলার মানুষদের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে বইমেলাকে কাজে লাগিয়ে যে উদ্যোগ নেয়া দরকার, তার ভগ্নাংশও কিন্তু বাংলাদেশ উপদূতাবাস কর্তৃপক্ষের ভেতর দেখতে পাওয়া যায় না।
কলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী কিছু ভিডিও, স্থিরচিত্র প্রদর্শিত হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয়; মোহরকুঞ্জে বাংলাদেশ বইমেলাতে সে ধরনের কোনো উদ্যোগ মেলা কর্তৃপক্ষ নেন না। বস্তুত এই উদ্যোগ না নেয়ার পেছনে সবথেকে বড় ভূমিকা হিসেবে উঠে আসে           উপ-দূতাবাস কর্তৃপক্ষ এপার বাংলার যে লোকগুলির উপর দায়িত্ব অর্পণ করেন, সেই লোকগুলির অবিমৃষ্যকারিতা। যারা বাংলাদেশ বইমেলা উপলক্ষে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক কর্মসূচি বা আলোচনাচক্র ইত্যাদিতে নিজেদের পছন্দের লোকদের সুযোগ করে দিতে এতো বেশি ব্যস্ত থাকেন যে এপার বাংলার মানুষদের কাছে বাংলাদেশের ইতিহাস, রাজনৈতিক বিবর্তন, মুক্তিযুদ্ধ, সাংস্কৃতিক কর্মসূচি ইত্যাদি কিছুই সেভাবে গুরুত্ব পায় না। নজরুল থেকে জসীম উদ্দিন, সুফিয়া কামাল থেকে জাহানারা ইমাম অথবা কলিম শরাফী থেকে সনজিদা খাতুন- কাউকেই জানবার কোনো সুযোগ এপারের বাঙালি “বাংলাদেশ বইমেলা” থেকে পেলেন না।

Disconnect