ফনেটিক ইউনিজয়
জেলা পরিষদ নির্বাচন এখতিয়ার ও ক্ষমতা
আমীন আল রশীদ

রাজনীতিবিদেরা ফাঁকতালে এমন সব সত্য কথা বলে ফেলেন, যেগুলো আখেরে বিব্রতকর সত্যকে সামনে নিয়ে আসে। যেমন রংপুর সিটির মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য শরফুদ্দিন আহম্মেদ (ঝন্টু) ২৮ ডিসেম্বর জেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘আজ যে ভোট হচ্ছে, এটা মৌলিক গণতন্ত্রের ভোট। এ ধরনের ভোট আইয়ুব খানের আমলে হয়েছিল। এখানে চেয়ারম্যান, মেম্বাররা ভোট দেন। এটা দামি ভোট। তাই এতে দরদাম করেও ভোট দেওয়া যায়।’
২৮ ডিসেম্বর দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জেলা পরিষদ নির্বাচন হয়। যদিও সেখানে প্রার্থী ছিলেন মূলত আওয়ামী লীগ ও এই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। বিএনপি বা জাতীয় পার্টি এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি বা কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেয়নি।
আইনত নির্দলীয় ও দলীয় প্রতীকে এই নির্বাচন না হলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের দলীয়ভাবেই মনোনয়ন দেয় এবং সংগত কারণেই ২১টি জেলা বাদে বাকি জায়গাগুলোয় আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের লড়তে হয় নিজের দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধেই। ২১টি জেলায় ছিলেন একক প্রার্থী। ফলে তাঁরা নির্বাচিত হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়! তিন পার্বত্য জেলায় আগে থেকেই পরিষদ থাকায় ভোটের আয়োজন করা হয় বাকি ৬১টি জেলায়।
এই নির্বাচনের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল পরোক্ষ ভোট। অর্থাৎ সাধারণ নাগরিকদের ভোটাধিকার ছিল না। পরিষদ চেয়ারম্যান, সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্যপদে ভোট দিয়েছেন স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিরা। সরকার এটিকে ‘ইলেকটোরাল কলেজ’ বলে অভিহিত করেছে। যদিও বিএনপির দাবি, এই নির্বাচন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এ কারণে তারা এই নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে মনোনয়ন বা সমর্থন দেয়নি বলে জানায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে যে ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতি, তার সঙ্গে আমাদের জেলা পরিষদের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। যেমন আমাদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি যেমন সিটি মেয়র, পৌর মেয়র ও কাউন্সিলর, উপজেলা বা ইউপি চেয়ারম্যানদের জনগণ ভোট দেন তাঁদের উন্নয়নের জন্য। সেখানে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত করার কোনো ম্যান্ডেট তাঁদের নেই। অর্থাৎ জনগণ ওই দায়িত্ব তাঁদের দেননি। কিন্তু সরকার আইনের বলে এই দায়িত্ব ওই জনপ্রতিনিধিদের ওপরে চাপিয়ে দিয়ে বলছে তাঁরা ইলেকটোরাল কলেজ। এটি আইনসিদ্ধ হলেও নৈতিক নয় এবং জনগণ যেহেতু স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জেলা পরিষদ গঠনের ম্যান্ডেট দেয়নি, অতএব এটি আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য।
এটি কোনো অর্থেই যুক্তরাষ্ট্রের ইলেকটোরাল কলেজের মতো পদ্ধতি নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে ইলেকটর নির্বাচন করেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য। অর্থাৎ জনগণ তাঁদের নির্বাচনি এলাকায় যে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন, সেই প্রতিনিধিরা তাঁদের জন্য পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবেন, এটিই তাঁদের ম্যান্ডেট। আবার যে দল বেশি ইলেকটোরাল কলেজ জেতে, সাধারণত সেই দল থেকেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এর অন্যথা হওয়ার নজির নেই। সুতরাং আমাদের জেলা পরিষদ নির্বাচনে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিরা ভোট দিলেও সেটিকে ওই অর্থে ইলেকটোরাল কলেজ বলার সুযোগ নেই, যতক্ষণ না তাঁদের জনগণ এই ম্যান্ডেট দেন। তা ছাড়া অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনের যে পদ্ধতি, তার বাইরে গিয়ে জেলা পরিষদে এ রকম পদ্ধতি প্রয়োগের যুক্তিটাই বা কী, তা-ও পরিষ্কার নয়।
যেমন পরিষ্কার নয় জেলা পরিষদ প্রতিনিধিদের দায়িত্ব। জেলা পরিষদ আইনে এই প্রতিষ্ঠানের ৮০টি কাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি বাধ্যতামূলক এবং বাকিগুলো ঐচ্ছিক। ১২টি বাধ্যতামূলক কাজের মধ্য রয়েছে জেলার সব উন্নয়ন কার্যক্রম পর্যালোচনা; উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার গৃহীত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা; সাধারণ পাঠাগারের ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ; বৃক্ষরোপণ; জনসাধারণের জন্য উদ্যান, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি। আর ঐচ্ছিক কাজের মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সমাজকল্যাণ, জনস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক কল্যাণসহ নানা কর্মকাণ্ড। কিন্তু এর সব কাজই অন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোও করে থাকে। ফলে কোনটি পৌরসভা করবে আর কোনটি জেলা পরিষদ করবে- আইনে তার পরিষ্কার ব্যাখ্যা নেই।
এই নির্বাচনে যাঁরা জেলা পরিষদের সদস্য হিসেবে জয়ী হয়েছেন, তাঁরাও তাঁদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে পরিষ্কার নন বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। তাঁদের মর্যাদা কী হতে পারে, তা-ও জানা নেই তাঁদের। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত সদস্য আসাদুজ্জামান আসাদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দায়িত্বের বিষয়টি আমরা সেভাবে ওয়াকিবহাল নই। এই পদের কাজ কী, তা-ও জানি না। এই নিয়ে সরকার হয়তো প্রজ্ঞাপন জারি করে আমাদের ক্ষমতা ও দায়িত্ব-কর্তব্য ঠিক করে দেবে। সরকার যখন নির্বাচন দিয়েছে, নিশ্চয়ই দায়িত্বও স্পষ্ট করবে।’
বরগুনা জেলা পরিষদের সংরক্ষিত নারী (৫ নম্বর ওয়ার্ডের) সদস্য ফৌজিয়া খানম বলেন, ‘আমাদের কাজ কী, সেটা জানি না। জেলা পরিষদ যেহেতু বড় একটি পরিসর, নিশ্চয়ই কাজ তেমনটি হবে। আর নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে কিছু না কিছু সম্মান তো নিশ্চয়ই পাব।’
তবে জেলার সব উন্নয়ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করার কথা জেলা পরিষদ আইনে বলা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। জেলার অবকাঠামো উন্নয়ন বিশেষ করে রাস্তা-সেতু-কালভার্ট ইত্যাদি বানানোর দায়িত্ব মূলত স্থানীয় সরকার এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের। স্থানীয় সরকারের বাইরেও বিভিন্ন ভবন নির্মাণ করে গণপূর্ত বিভাগ। তাদের অংশীদার হয়ে কাজ করে পৌরসভার মতো প্রতিষ্ঠান। সুতরাং এসব জায়গায় গিয়ে জেলা পরিষদ কখনো নাক গলাবে বা মতামত দেবে, তার সম্ভাবনা কম।
আবার অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে জেলা পরিষদ প্রতিনিধিদের ক্ষমতার ভারসাম্য কী হবে, তা-ও পরিষ্কার নয়। যেমন ঢাকায় দুটি সিটি করপোরেশনে দুজন মেয়র রয়েছেন। একইভাবে অন্যান্য সিটি করপোরেশনেও মেয়র রয়েছেন। প্রশ্ন হলো, এই মেয়ররা কি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের ওপরে নাকি তাঁদের অধীন? যদি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানরা সিটি করপোরেশনের কাজে তদারকি করেন, সেখানে কোনো স্বার্থের সংঘাত তৈরি হবে কি না? ফলে দ্রুত জেলা পরিষদ আইনের একটি বিধিমালা করে বিষয়গুলো পরিষ্কার না করলে অস্পষ্টতা থেকেই যাবে।
সবশেষে দরদামের প্রশ্ন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হলেও জেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক টাকা ছড়াছড়ির অভিযোগ ওঠে প্রার্থীদের বিরুদ্ধে। নগদ টাকার পাশাপাশি মোটরসাইকেল উপহারের কথাও শোনা গেছে। চেয়ারম্যান ও সাধারণ সদস্যপদে ভোটারপ্রতি ১০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে বলেও গণমাধ্যমে খবর এসেছে। এই যখন বাস্তবতা, এ রকম দরদাম করে যে নির্বাচন হলো, সেই জেলা পরিষদ স্থানীয় সরকারের উন্নয়নে আখেরে কী ভূমিকা রাখবে? জেলা পরিষদগুলো কি আসলেই শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা রাখবে নাকি শেষমেশ এগুলো দলীয় অফিসে পরিণত হবেÑসেদিকেও দেশবাসীর নজর থাকবে।

Disconnect