ফনেটিক ইউনিজয়
রিজার্ভ চুরি : ৯ বার পেছাল প্রতিবেদন দাখিলের সময়
আবেদ মেহেদী

বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার রিজার্ভ চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের প্রায় সবাইকে চিহ্নিত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঁচ বিভাগের ১৪ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। তাঁরা সবাই ব্যাংকের কম্পিউটার সুইফট সিস্টেম হ্যাকিংয়ের পট তৈরিতে কোনো না কোনোভাবে ভূমিকা রেখেছেন বলে জানা গেছে। এদিকে সিআইডির তদন্ত শেষ না হওয়ায় ১৭ জানুয়ারি প্রতিবেদন দাখিলের নতুন দিন ধার্য করেছেন আদালত। এ নিয়ে প্রতিবেদন দাখিলের সময় ৯ বার পেছাল।
জানা যায়, সংশ্লিষ্ট ১০৮ জনকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদসহ প্রয়োজনীয় তদন্ত শেষে সিআইডির কর্মকর্তারা নিশ্চিত হয়েছেন উল্লিখিত বিষয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের যে ১৪ জন জড়িত আছেন, তাঁদের মধ্যে অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের চারজন, পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের চারজন, আইটি অপারেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের চারজন, ফরেন রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের দুজন এবং ব্যাংক অফিস অব দ্য ডিলিংস রুমের একজন কর্মকর্তা রয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিএম পদের কয়েকজন কর্মকর্তা, যে প্রকল্পের মাধ্যমে সুইফট হ্যাক করা হয়, ওই প্রকল্পের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সাবেক গভর্নরের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি ও প্রধান তদন্ত তদারক কর্মকর্তা মো. শাহ আলম বলেন, রিজার্ভ চুরির আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট সিস্টেম সুরক্ষিত ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কিছু বিদেশি মিলে এমনভাবে কাজ করেছেন, যার ফলে পুরো সার্ভার অরক্ষিত হয়ে পড়ে। তিনি জানান, চলতি বছর ৩১ জানুয়ারি হ্যাকারদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার সুইফট সিস্টেম। বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা সুইফট সিস্টেম দুর্বল করতে সর্বাত্মক সহায়তা করেছেন, হ্যাকিংকে ত্বরান্বিত করেছেন, সর্বোপরি অপরাধে জড়িয়েছেন, তাঁদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য এখন সিআইডির হাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা এর সঙ্গে জড়িত, তাঁদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মো. শাহ আলম বলেন, ‘এরই মধ্যে ২৩ বিদেশিকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা আমাদের টাকাগুলো বের করে নিয়ে গেছে। তবে ওই ২৩ বিদেশি ছিল অপারেটর। তাদের মাধ্যমে টাকাগুলো মূল পরিকল্পনাকারীদের হাতে চলে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ভুয়া হিসাবধারী বিদেশি ওই চক্রের অন্তত ২৫ জনকে শনাক্ত করতে কাজ চলছে।
এদিকে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘আরটিজিএস’ প্রকল্পের মাধ্যমে সুইফট হ্যাক করা হয়। ওই প্রকল্পটা না আনা হলে এখানে হ্যাকিংয়ের মতো ঘটনা ঘটত না। জানা গেছে, এ বিষয়ে এরই মধ্যে ওই প্রকল্পের পরিচালকসহ ব্যাংকের শতাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সিআইডি।
প্রসঙ্গত, রিজার্ভ চুরি ঘটনার ৪০ দিন পর গত ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মতিঝিল থানায় মামলা করেন। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ (সংশোধনী আইন-২০১৫)-এর ৪ ধারা এবং ২০০৬ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৪ ধারা ও দণ্ডবিধির ৩৭৯ ধারায় হওয়া ওই মামলার তদন্ত করছে সিআইডি।
সূত্র জানায়, তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের যাদের অপরাধের প্রমাণ মিলেছে, সিআইডির ভাষায় এরা ‘কালপ্রিট’। হ্যাকিংয়ের পুরো নীলনকশা চূড়ান্তকরণ ও বাস্তবায়ন করেছে এ চক্রটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের আটজনের কাছে সুইফটের ইউজার আইডি ছিল। এদের মধ্য থেকে একজনের আইডি হ্যাক করে রিজার্ভ চুরির ঘটনা ঘটানো হয়।
সূত্র জানায়, কিছু অচেনা লোক হ্যাকিংয়ের ঘটনার আগে ও পরে বাংলাদেশ ব্যাংকে ঢোকার সময় নিজেদের নাম-ঠিকানা রেজিস্টার খাতায় লিপিবদ্ধও করেনি। সিআইডি সূত্র বলছে, চুরির আগে অপরিচিত রহস্যজনক অনেক লোক বাংলাদেশ ব্যাংকে ঢুকেছে, তাদের নাম খাতায় এন্ট্রি নেই কেন, এ বিষয়ে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ ছাড়া হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরির ঘটনা জানার পরও সেই তথ্য ৪০ দিন কেন গোপন করে রাখা হলো, সে বিষয়েও তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ড. আতিউর রহমানের সঙ্গে কথা বলেছে। গত ১৯ ডিসেম্বর সকাল ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত প্রায় দেড় ঘণ্টা আতিউর রহমানের ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে সিআইডির চার সদস্যের একটি দল তাঁর সঙ্গে কথা বলে। এ সময় সিআইডির সদস্যরা তাঁর কাছে রিজার্ভ চুরির ঘটনার আগের ও পরের অবস্থা, চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারে তিনি কী ব্যবস্থা নিয়েছেনÑএ প্রসঙ্গে জানতে চেয়েছেন এবং সুইফট সিস্টেমসের কারিগরি দিক নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন।
সূত্র জানায়, সিআইডিকে ড. আতিউর রহমান বলেছেন, ‘আমাদের সুইফট সিস্টেমসে ‘ম্যালওয়্যার’ নামের একটি শক্তিশালী ভাইরাস বসিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের কার্যক্রম মনিটরিং করে তারপর রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরি করা হয়েছে। বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনাটি ছিল একেবারেই নতুন। এই ব্যাপারে আমাদের কোনো ধারণাই ছিল না। তার পরও ঘটনা জানার সঙ্গে সঙ্গে রিজার্ভের অর্থ উদ্ধারে আমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করি। এর ফলে শ্রীলঙ্কায় যাওয়া দুই কোটি ডলার আমরা দুই দিনের মধ্যেই ফেরত আনতে সক্ষম হই। একই সঙ্গে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আমি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে এসব অর্থ ছাড় করা বন্ধ করার অনুরোধ করি। সেই অনুরোধ ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকে যাওয়ার পরও তারা অর্থ ছাড় করে দেয়। এ ঘটনায় রিজাল ব্যাংকের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের প্রমাণ পেয়েছে সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে তাদের ২ কোটি ১০ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া দেড় কোটি ডলার ফেরত পেয়েছে। আরও প্রায় আড়াই কোটি ডলার আটক করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, ওই সময় রিজাল ব্যাংক দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে রিজার্ভের অর্থ পুরোটাই ফেরত পাওয়া যেত।’
এদিকে সিআইডির গত আট মাসের তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের চক্রটিকে শনাক্ত করা সম্ভব হলেও মূল পরিকল্পনাকারীদের অনেকেই এখনো রয়েছে আড়ালে। যাদের নিখুঁত পরিকল্পনায় কয়েকটি ধাপে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হ্যাকারদের মাধ্যমে সরানো হয়। এ ছাড়া বিদেশি যে চক্রটি এ কাজের সঙ্গে জড়িত, তাদের মধ্যে ২৫ জনের বিষয়ে অনেক তথ্য এখনো বের করতে পারেনি সিআইডি। যারা নিজের নাম-ঠিকানা গোপন করে অন্যের ছবি ব্যবহার করে হ্যাকিংয়ের অর্থ ওই সব হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর করেছে। এদিকে রিজার্ভ চুরিতে জড়িত ফিলিপাইনের ১৬ জন ও শ্রীলঙ্কার ৭ জনের বিরুদ্ধে যদি ওই সব দেশের মানি লন্ডারিং এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলাও হয়, তার পরও বাংলাদেশের আইনে তাঁদের বিরুদ্ধে চার্জশিট হবে বলে জানা গেছে।

Disconnect