ফনেটিক ইউনিজয়
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায়ও আস্থার সংকট
হামিদ সরকার

২০১৬ সালের পুরো বছরটাই কেটেছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে। জাতীয় সংসদে বিরোধী দল বা প্রধান বিরোধী দল কেউই এ সময়ে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি দেয়নি। তবে এমন সুযোগ অর্থনীতির জন্য কোনো বড় সুখবর বয়ে আনতে পারেনি। কারণ রাজনীতিতে আস্থার সংকট চলছে। রাজনীতির চলতি স্থিতিশীলতার স্থায়িত্ব নিয়ে সবার ভয়। সেই সঙ্গে বিনিয়োগ টানতে বা শিল্পায়নে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অভাব ও সুশাসনের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। সরকারকে সাড়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে পৌঁছাতে হলে সেই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ বিষয়গুলো মাথায় নিয়ে নতুন বছরের শুরুতেই পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে ইতিবাচক দৃষ্টির কথা বলছেন ব্যবসায়ী অর্থনীতিবিদেরা।
২০১৬ সাল অর্থনীতির জন্য একটি বড় সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়ে গেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. এ বি এম মির্জা আজিজুল ইসলাম। তাঁর মতে, সেই সুযোগ সরকার কাজে লাগাতে পারেনি। বলা হচ্ছে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ ছাড়াবে। কিন্তু যে সূচকগুলোর ওপর ভর করে এই জিডিপি নির্ধারণ, সেগুলোর বিচার-বিশ্লেষণ করলে অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) উচ্চ প্রবৃদ্ধি হলেও তা যথেষ্ট কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজ করার পরিবেশের তেমন উন্নতিও হয়নি। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস-সংকট রয়ে গেছে। নতুন সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়লেও এর নতুন সংযোগে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস ও বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বিষয়ে সর্বশেষ রিপোর্টে বাংলাদেশের অবস্থান প্রায় একই রকম রয়ে গেছে।
সামগ্রিকভাবে সামষ্টিক অর্থনীতিকে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি দিয়ে বিচার করা হয়। বৈশ্বিক বিচারে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক বলে মনে করছেন বিশ্বব্যাংকের লিড অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তাঁর মতে, ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধি কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়ে পরিসংখ্যানের বিভ্রান্তি রয়েছে।  কর্মসংস্থানের তেমন উন্নতি হয়নি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০১৬ সাল শেষে বিদেশে বাংলাদেশি জনশক্তির স্থিতি আগের বছরের চেয়ে সাত লাখ বেড়েছে। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া জনশক্তির বড় অংশ থাকে সৌদি আরব, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী কর্মসংস্থান কমেছে। তেলের বড় দরপতন হয়েছে। এসব দেশের অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে। তার পরও কেন মানুষ এসব দেশে পাড়ি জমাচ্ছে, প্রশ্ন রাখেন তিনি। তিনি আরও বলেন, দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায় বিদেশগামী হচ্ছেন অনেকে। বেসরকারি খাতে কেন কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ আসছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে ড. জাহিদ হোসেন বলেন একটি সহায়ক বিনিয়োগ পরিবেশের অভাবের কথা। তিনি আরও বলেন, দেশে সামগ্রিকভাবে সহায়ক বিনিয়োগ পরিবেশে ঘাটতি আছে। একজন বিনিয়োগকারী যদি দেশের মধ্যে বা বিদেশে পণ্য বিক্রি করা নিয়ে স্বস্তিতে না থাকেন, তাহলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেবেন না। বিনিয়োগ পরিবেশের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা একটি বড় বিষয়।
সরকার বলছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশের ঘরে থাকবে। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা তা কোন দৃষ্টিতে দেখছেন, জানতে চাইলে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বারের পরিচালক ও বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তা মাহমুদুর রহমান সুমন বলেন, সরকারের দেওয়া হিসাব থেকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা সুখবর পাওয়া গেলেও, নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তা দেখা যাচ্ছে না।          
কর্মসংস্থান নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ রয়েছে ২০১৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বরভিত্তিক। জরিপ অনুযায়ী, প্রায় দুই বছরে ছয় লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মানে, বছরে কর্মসংস্থান হয়েছে তিন লাখের মতো। এর আগের বছরগুলোতে যা ১০ লাখের বেশি ছিল। প্রতিবছর ১৮ থেকে ২০ লাখ মানুষ শ্রমশক্তিতে যোগ হয়। বিদায়ী বছরে নিট হিসাবে সাত থেকে আট লাখ মানুষ বিদেশে গেছে। হালনাগাদ তথ্য না থাকলেও বাকি লোকের একটা বড় অংশের কর্মসংস্থান দেশে হয়নি বলে ধারণা করা যায়। তিনি বলেন, সরকারি ভাষ্যমতে জনশক্তি রপ্তানি বাড়লেও রেমিট্যান্স কমে গেছে ব্যাপক হারে। গত জুলাই-নভেম্বর সময়ে রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ১৬ শতাংশ। আর বিদায়ী বছরে রেমিট্যান্স কমেছে ১১ শতাংশ।
এসব দিক মাথায় রেখে নতুন বছরকে কাজে লাগাতে রাজনৈতিক আস্থার সংকট কাটানোর ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে বলছেন ব্যবসায়ী-অর্থনীতিবিদেরা। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এখন বহুমুখী রপ্তানি খাত গড়ে তোলার গুরুত্ব অপরিসীম। খুঁজে বের করতে হবে সম্ভাবনার খাতগুলোকে; যার ওপর ভিত্তি করে উন্নত দেশের দিকেই এগিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ। নতুন বছরে অর্থনীতির বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে সম্ভাবনাময় খাতগুলোর বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন তাঁরা।

Disconnect