ফনেটিক ইউনিজয়
অনড় আ.লীগ, পথ খুঁজছে বিএনপি
কিভাবে হবে একাদশ সংসদ নির্বাচন
এম ডি হোসাইন

দেশে কি আবারও ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন হবে, নাকি বিএনপিসহ উল্লেখযোগ্য প্রধান দলগুলোকে নিয়ে অংশীদারমূলক ভোটযুদ্ধ হবে? এমন প্রশ্ন এখন অনেকেরই মুখে। আর যদি অংশীদারমূলক স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়, তাহলে নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে, এ প্রশ্নটাও ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। তবে যাই হোক, নির্বাচনী রাজনীতিতে আপাতত কোনো সমঝোতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ নেতারা এক বাক্যেই বলছেন, ‘সংবিধানের বাইরে কিছুই হবে না’। আর বিএনপি নেতারা বলছেন, বিএনপিকে বাইরে রেখে একাদশ নির্বাচন করা ‘সহজ হবে না’।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনের মাসগুলোতে রাজনীতি যে উত্তপ্ত হবে, তা অনেকটাই স্পষ্ট। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, পরিস্থিতি ততই জটিল হবে। কারণ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বরাবরই এদেশের রাজনীতি বিদেশিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। আর প্রতিটা রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনে বিদেশিদের হস্তক্ষেপ ছিল স্পষ্ট। এবারও তা হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এ সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘এখনই আগবাড়িয়ে কোনো মন্তব্য করা যাবে না। তবে বিএনপি যে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবে না, তা শতভাগ নিশ্চিত। কারণ, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন হলে এর ফলাফলের জন্য নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। ফলাফল কী হবে সেটি আগেই জানা যাবে। সেই অর্থহীন নির্বাচনে বিএনপি কখনও যাবে না এবং এবার সেই নির্বাচন হতেও পারবে না।’ তিনি আরো জানান, ‘আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কয়েক মাসের মধ্যেই নির্বাচনী সহায়ক সরকারের ফর্মুলা উপস্থাপন করবেন। এরপর সহায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি প্রয়োজনে আন্দোলনেও যাবে।’
সহায়ক সরকারের বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন হবে না। নির্বাচন হবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে। নির্বাচনকালে শেখ হাসিনার সরকারই সহায়ক সরকারের ভূমিকা পালন করবে।’ এটাই সংবিধানের নিয়ম বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিএনপি অবশ্য এই নতুন ব্যাখ্যায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, ‘এটা ভোটাধিকার হারানো দেশের জনগণের সঙ্গে তামাশা।’ এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এটা ওবায়দুল কাদেরের দলীয় সংজ্ঞা। এই সংজ্ঞা দেশের জন্য প্রযোজ্য নয়।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার নিয়ে তাদের এতো ভয় কেন? তার মানে কোনো সমস্যা আছে। কী যে সমস্যা, সেটা তো দেশবাসী জানে।’
অপরদিকে, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়টি নিয়ে বিএনপি আসলে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তাদের লক্ষ্যটা কি, তা নিয়েই তো জনমনে সন্দেহ রয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে নানান অসত্য তুলে ধরে বিএনপি জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন কিভাবে হবে, তা সংবিধানেই বলে দেওয়া আছে। সংবিধানের বাইরে কিছুই হবে না।’
বিএনপির সহায়ক সরকারের ধারণা প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের এই জ্যেষ্ঠ নেতা আরো বলেন, ‘বিএনপি যে সহায়ক সরকারের কথা বলছে, তাতো আমাদের সংবিধানেই রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, দেশের যে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে। নির্বাচনকালীন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তার মূল দায়িত্ব হচ্ছে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করা। যেন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।’
জানা যায়, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া শিগগির নির্বাচনী সহায়ক সরকারের ফর্মুলা উপস্থাপন করবেন। এ নিয়ে সংবিধানের ভেতরে-বাইরে দুই ধরনের প্রস্তাবনা নিয়েই বিএনপির ভেতরে আলোচনা চলছে। তবে কোনো ধরনের ফর্মুলা উপস্থাপনের আগে লন্ডনে যাবেন খালেদা জিয়া। লন্ডন থেকে এসে সহায়ক সরকারের ফর্মুলা ঘোষণা করবেন তিনি।
এদিকে, আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে, সেটা ধরে নিয়েই নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। অপেক্ষাকৃত কঠিন লড়াইয়ের জন্য উপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচনের দিকে নজর দিচ্ছে দলটি।
তবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের অভ্যন্তরীণ একাধিক বৈঠকে এবারের নির্বাচনী পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্কবাণী দিলেও আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এখনও এটিকে গায়ে মাখাতে রাজি নন। তাদের ধারণা, যত সমস্যাই আসুক, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা সামাল দিবেন। তারা সরাসরিই এমন দাবি করেন, শেখ হাসিনা সব সমস্যা মোকাবিলা করতে সক্ষম। তাদের এমন আত্মবিশ্বাসের কারণ দুটি। এক. ২০১৪ সালের নির্বাচনকালীন কঠিন সময় অতিক্রম। দুই. ২০১৫ সালে তিন মাসের দীর্ঘ আন্দোলন দমন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় বলেছেন, ‘২০১৪ সালে কিভাবে পার করে এনেছি, তা আমিই একমাত্র জানি। এখন আর আমি তা পারব না।’
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘বিএনপিকে বাদ দিয়ে যদি তারা (আওয়ামী লীগ) নির্বাচন করতে চায় করুক না, এতো সোজা না তো।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিএনপি ইজ দ্য লার্জেস্ট পলিটিক্যাল পার্টি ইন দিস কান্ট্রি এবং এই পলিটিক্যাল পার্টিকে বাদ দিয়ে একটা নির্বাচন তারা করেছে, যে নির্বাচনের কোনো লেজিটিম্যাসি তারা পায়নি। ভারতও বলেছে, এটা লেজিটিমেট ইলেকশন হয়নি।’
বিএনপি মহাসচিব আরো বলেন, ‘আমরা বলতে চাই, আবারও যদি তারা বিএনপিকে বাদ দিয়ে সেই অবস্থা তৈরি করে, সরকার সারা বিশ্বে কেন, বাংলাদেশের মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।’
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, ‘বিএনপি না থাকলেও নির্বাচন হবে।’ এর পরিপ্রেক্ষিতেই মির্জা ফখরুল এসব কথা বলেন।
সহায়ক সরকারের রূপরেখা সম্পর্কে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এজন্য মূল ফোকাস থাকবে, কিভাবে একটি নির্বাচন করা যেতে পারে। নির্বাচনটা যেন দল নিরপেক্ষ হয়, সেই নির্বাচনে যেন জনগণ তাদের ভোট দেওয়ার অধিকারটা প্রয়োগ করতে পারে, এই বিষয়টাই হবে প্রধান। নিঃসন্দেহে এদেশের জন্য, জনগণের জন্য ও তাদের অধিকার আদায়ের জন্য সেই ধরনেরই একটা প্রস্তাব দেওয়া হবে।’
তবে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, বিএনপি এখন যে সহায়ক সরকারের দাবি জানাচ্ছে, তা মানতে গেলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সোজা কথা, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে হবে। এক্ষেত্রে ছাড় দেয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

Disconnect