ফনেটিক ইউনিজয়
ষোড়শ সংশোধনী: সাংবিধানিক শূন্যতার প্রশ্ন
আমীন আল রশীদ

বিপদগ্রস্ত মানুষের সবশেষ ভরসার জায়গা বিচার বিভাগ। আরও স্পষ্ট করে বললে উচ্চ আদালত। যে কারণে বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় ভারসাম্য বজায় রাখতেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিকল্প নেই। বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলা হলেও, রাজনৈতিক বা সামরিক কোনো সরকারই চায় না বিচার বিভাগ পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করুক। কারণ প্রায় সব সরকারের আমলেই আমরা বিচার বিভাগের কাঁধে বন্দুক রেখে বিরোধী ও ভিন্নমত দমন করতে দেখেছি।
বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের এই খবরদারির অসংখ্য উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। সবশেষ বিচারকদের আচরণ ও শৃঙ্খলাবিধি প্রণয়ন ইস্যুতে সরকারের সঙ্গে বিচার বিভাগের যে সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, এখনও তার সুরাহা হয়নি। এ বিষয়ে এক শুনানিতে খোদ প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘সরকার নিম্ন আদালত নিয়ন্ত্রণ করছে, এখন তারা উচ্চ আদালতও কব্জায় নিতে চায়।’
এরকম বাস্তবতায় গত ৩ জুলাই সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে ‘অসাংবিধানিক’ উল্লেখ করে তা বাতিল সম্পর্কিত হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। বাহাত্তরের মূল সংবিধানে বিচারকদের অপসারণ সম্পর্কিত ৯৬ অনুচ্ছেদের বিধান ছিল। কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অসদাচরণ বা অসামর্থের প্রমাণ পাওয়া গেলে এবং সংসদের মোট সদস্যের অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য অপসারণের পক্ষে ভোট দিলে রাষ্ট্রপতির আদেশে ওই বিচারককে অপাসরণ করা যাবে। কিন্তু পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে জিয়াউর রহমান এই অনুচ্ছেদ বদলে দেন এবং বিচারকদের অপসারণের ভার ন্যস্ত করেন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের উপর। কিন্তু এর বহু বছর পরে উচ্চ আদালত পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করলেও ৯৬ অনুচ্ছেদ বহাল করেননি। অর্থাৎ বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা থেকে যায় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতেই। এ অবস্থায় সংবিধানে ষোড়শ সংশোধনী এনে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা পুনরায় সংসদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এই সংশোধনী বাতিল হয়ে যাওয়ায় ৯৬ অনুচ্ছেদ ষোড়শ সংশোধনীর আগের অবস্থায় ফিরে গেলো কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আইনবিদদের অনেকেই এ ব্যাপারে একমত যে, সর্বোচ্চ আদালত যেহেতু ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দিয়েছেন, অতএব এখন থেকে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা আগের মতো সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতেই ন্যস্ত হয়েছে। এখানে কোনো ধরনের সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হয়নি। কিন্তু গত ৮ জুলাই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় দেওয়া বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, এ বিষয়ে জাতীয় সংসদই সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি বলেন, ‘বাহাত্তরের গণপরিষদ যে সংবিধান প্রণয়ন করেছে, সেই সংবিধানের ধারা আমরা ফেরত আনতে চাই। সেটা কিভাবে আদালত অসাংবিধানিক বলেন?’ তিনি আরো বলেন, ‘উচ্চ আদালত সামরিক সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন। তাহলে সামরিক একনায়কদের করা আইন (জিয়াউর রহমানের সময়ে পঞ্চম সংশোধনীতে যুক্ত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল) কিভাবে সাংবিধানিক হয়?’
প্রধানমন্ত্রী আরো অভিযোগ করেন, ‘আইনজীবী ও সুশীল সমাজের একটি সংঘবদ্ধ চক্র তালগোল পাকাতে চায়। একটি শূন্যতা তৈরি করতে চায় বলেই তারা এই ইস্যুটি নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে সংসদ। ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের ব্যাপারে এই সংসদই সিদ্ধান্ত নেবে।’ এ বিষয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে দলীয় নেতা ও সংসদ সদস্যদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘উচ্চ আদালতের রায় নিয়ে সংসদের বাইরে কথা বললে, সেটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হতে পারে।’
প্রধানমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী, যদি ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের বিষয়ে সংসদই সিদ্ধান্ত নেয়, অর্থাৎ যদি বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের ওপরেই ন্যস্ত রাখা হয়, তাহলে প্রমাণ হবে যে, সংসদ সর্বোচ্চ আদালতের রায় মানেনি। আবার সংসদ যে ধরনের সিদ্ধান্তই নিক না কেন, তা গ্রহণের মধ্যবর্তী সময়ে যদি কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অসদাচরণ বা অযোগ্যতার অভিযোগ ওঠে, তাহলে তার তদন্ত কে করবে, সংসদ না সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল? এমন প্রশ্নও উঠছে। ফলে একটা সাংবিধানিক শূন্যতা রয়ে গেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ এখন হয় আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান যুক্ত করে সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করতে হবে, অন্যথায় দ্রুত এ বিষয়ে সংসদে সিদ্ধান্ত নিয়ে ষোড়শ সংশোধনীর ফলে এই অনুচ্ছেদে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, সেটি বহাল রাখতে হবে।
নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে এই টানাপোড়েন অস্বাভাবিক নয়। কারণ সব সরকারই চায় বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করতে। পক্ষান্তরে বিচার বিভাগ চায় শাসন বিভাগের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরতে। বাস্তবতা হলো জনগণের প্রতিনিধি আইনসভা বা সংসদ সব ক্ষমতার উৎস হলেও বিচার বিভাগ কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনসভারও নিয়ন্ত্রক। বিশেষত সংবিধানের অভিভাবক, রক্ষক এবং চূড়ান্ত ব্যাখ্যার অধিকারী হিসেবে।
ষোড়শ সংশোধনী বাতিলকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য ইতিবাচক উল্লেখ করে সম্প্রতি বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, তারা ক্ষমতায় গেলে বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় স্থাপন করা হবে। বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা ক্ষমতায় যাওয়া এবং থাকার জন্য এরকম মুখরোচক অনেক কথাই বলেন। সাধারণ মানুষ তাদের সব কথা বিশ্বাস যে করে, তাও নয়। সাধারণের মনে আশঙ্কা রয়েছে, রাজনীতিবিদরা যা কিছুই বলেন বা করেন, তার অধিকাংশই ক্ষমতাকেন্দ্রিক। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা বা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা তাদের বিবেচনায় থাকে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণও রয়েছে।

Disconnect