ফনেটিক ইউনিজয়
বাড়ছে নারী নির্যাতন, বিচারহীনতাই নেপথ্যে
স্বয়ম মজুমদার

নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, নারীর ক্ষমতায়নসহ নানা ধরনের ইতিবাচক স্লোগান প্রতিনিয়ত উচ্চারিত হলেও বাংলাদেশে নারী নির্যাতন ক্রমাগত বাড়ছে। যুক্ত হচ্ছে নির্যাতনের নতুন নতুন প্রকরণ। শারীরিক-মানসিক থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই নারী নিষ্পেষনের শিকার হচ্ছে। নারী নির্যাতকের আর্থ-সামাজিক অবস্থান পৃথক করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ সমাজের প্রতিটি স্তরেই এ নির্যাতকরা রয়েছে। নারী নির্যাতিত হচ্ছে নারীর হাতেও। কিন্তু এর কারণ খুঁজতে গেলে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোটিকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এমনকি সময়ের অন্যতম আলোচিত ঘটনা তনু হত্যারও কোনো সুরাহা এখনো হয়নি। এ কারণে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই নারী নির্যাতন বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারী নির্যাতন কে করছে না? বখাটে থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সব শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্বকারীকেই পাওয়া যাবে নির্যাতকের ভূমিকায়। সর্বশেষ গত ৯ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক শিক্ষার্থীকে নিপীড়নের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। নারী নির্যাতিত হচ্ছে ঘরে-বাইরে সর্বত্র। পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে সম্প্রতি এক ধরনের সচেতনতা তৈরি হলেও এর মাত্রা কমছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, বিবাহিত নারীদের ৮০ শতাংশই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে নিজের সঙ্গী কিংবা অন্য কোনোভাবে শারীরিক, মানসিক, যৌন কিংবা অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে ৫০ শতাংশই হন শারীরিক নির্যাতনের শিকার। মানসিক নির্যাতনের প্রসঙ্গ এলে এর মাত্রা সহজেই অনুমেয়। ২০১৫ সালে মাত্র নয়দিনব্যাপী পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে বিবিএস এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে, যেখানে মাত্র ২১ হাজার ৬৮৮ জন নারীর তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে। পরিসর হিসেবে এটি অনেক ছোট। প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় আগের তুলনায় নারী নির্যাতনের কমেছে বলে দাবি করেছিল বিবিএস।
অবশ্য সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের দাবির সঙ্গে মিলছে না অন্য বেসরকারি সংস্থার তথ্য। ২০১৫ সালের জুনে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নারী নির্যাতন বৃদ্ধির ভয়াবহ রূপ। এতে জানানো হয়, ২০১৪ সালে ব্র্যাকের নিরীক্ষাধীন এলাকায় ২ হাজার ৮৭৩টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু এক বছরের মাথায় ২০১৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ ব্র্যাকের নিরীক্ষাধীন ৫৫টি জেলায় এক বছরের ব্যবধানে নারী নির্যাতন বেড়েছে ৭৪ দশমিক ৩ শতাংশ, যেখানে ৮৮ শতাংশ ক্ষেত্রেই নির্যাতনকারী একজন পুরুষ।
দেশব্যাপী নারী নির্যাতন বৃদ্ধিও বিষয়টি উঠে এসেছে বাংলাদেশ পুলিশের তথ্যেও। বিভিন্ন থানায় দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে পুলিশের তৈরি করা তুলনামূলক অপরাধ পরিসংখ্যানের তথ্যমতে, ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে নারী নির্যাতন বেড়েছে প্রায় ৫০ দশমিক ৬ শতাংশ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীটির তথ্যমতে, চলতি বছরের মে মাসেই দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে মোট ১ হাজার ৭১৯টি। এ সবই হচ্ছে তুলনামূলক সাহসী নারীদের নির্যাতনের পরিসংখ্যান, যারা অন্তত মামলা পর্যন্ত যাওয়ার সাহসটা করেন। এর বাইরে রয়ে গেছেন অসংখ্য নারী।
এ সম্পর্কে আইনজীবী শাহরিয়ার বিন আলী  বলেন, ‘মামলার সংখ্যা থেকে নারী নির্যাতনের হার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নেওয়া সম্ভব নয়। কারণ অনেকেই সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন কারণে বিচার চাইতে আসেন না। তারপরও পুলিশের পরিসংখ্যানে যে তথ্য উঠে এসেছ, তা নিঃসন্দেহে আশঙ্কাজনক।’
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নির্যাতিত নারী বিচার চাওয়ার বদলে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। গত কয়েক বছরে শুধু ইভটিজিংয়ের শিকার হয়েই অনেক নারীকে আত্মহত্যা করতে দেখা গেছে, যা এখনো থামেনি। গত ১৩ জুন এ সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জানায়, ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আড়াই বছরে মোট ৭৫৪টি ইভটিজিংয়ের ঘটনা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এর মধ্যে ৪০টি ঘটনায় নির্যাতিত নারীকে আত্মহত্যা করতে দেখা গেছে। এখানে বলা প্রয়োজন, নারীর বিপরীতে ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধ যেখানে হরহামেশা ঘটছে, সেখানে ইভটিজিংয়ের ঘটনা ব্যাপক রূপ ধারণ না করা পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমে সেভাবে ঠাঁই পায় না।
পরিসংখ্যান দিয়ে শেষ করা যাবে না। বরং প্রশ্ন করা যেতে পারে, নারী কিভাবে নির্যাতিত হচ্ছে না? কিংবা নির্যাতকের তালিকায় কে নেই? দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশের মানুষের কাছে জাতীয় বীর হিসেবে পরিচিত ক্রিকেটাররাও এ তালিকার বাইরে নয়। সর্বশেষ এ তালিকায় যুক্ত হয়েছেন পেসার মোহাম্মদ শহীদ। তার স্ত্রী সম্প্রতি বিসিবিতে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন। একইভাবে শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে নারী নির্যাতকের ভূমিকায় গত আড়াই বছরে জাতীয় দলের চারজন ক্রিকেটারের নাম উঠে এসেছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি তো দূরের কথা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
ক্রিকেটারদের প্রসঙ্গটি টানতে হলো, কারণ মোটাদাগে এ থেকেই নারী সম্পর্কে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিটি স্পষ্ট হয়ে যায়। নির্যাতনের অভিযোগ ওঠা কোনো ক্রিকেটার যখন নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ ছাড়াই জাতীয় বীর হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন, তখন সমাজ মানস পৃথকভাবে চিহ্নিত করার প্রয়োজন পড়ে না।
সার্বিকভাবে বিচারহীনতার সংস্কৃতিই নারী নির্যাতন বাড়ার কারণ বলে মনে করছেন আইন ও বিচার সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, অপরাধ করলেও শাস্তি পেতে হবে না, এ বিষয়টি মানুষের মধ্যে একরকম স্থায়ী রূপ পাচ্ছে। এটি অব্যাহত থাকলে নারী নির্যাতন বন্ধে সরকারি-বেসরকারি সব প্রচার ও উদ্যোগ অর্থহীনই থেকে যাবে। সবার আগে বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমেই সমাজের বড় একটি অংশকে নির্যাতক হওয়া থেকে নিরস্ত করা সম্ভব।

Disconnect