ফনেটিক ইউনিজয়
বি শে ষ সা ক্ষা ৎ কা র-১
‘সভ্যতা সম্পর্কে প্রচলিত সংজ্ঞাগুলো নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা প্রয়োজন’
সাক্ষাৎকারে অরুন্ধতী রায়

গত ২০ জুন খ্যাতনামা ভারতীয় লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট অরুন্ধতী রায় পুরস্কারজয়ী মার্কিন স্বাধীন অনুষ্ঠান ডেমোক্র্যাসি নাউ-এর সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী কথা বলেন। সেখানে তার নতুন উপন্যাস ‘দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ ও তার বাস্তবতা তুলে ধরেন অরুন্ধতী। আলোচনায় প্রাসঙ্গিকভাবেই উঠে আসে সমকালীন ভারতের রাজনীতি ও সমাজে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার উত্থানের বিষয়টি। সাক্ষাৎকারে অরুন্ধতী আবারো প্রশ্নবিদ্ধ করেন ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে, যাকে ‘বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র’ বলে দাবি করা হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক দেশকালের পাঠকদের জন্য পুরো সাক্ষাৎকারটি কয়েকটি পর্বে তুলে ধরা হচ্ছে। সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন রক্তিম ঘোষ

অ্যামি গুডম্যান: এটা ডেমোক্রেসি নাউ। আমি অ্যামি গুডম্যান।
নেরমীন শেখ: আর আমি নেরমীন শেখ। দেশের এবং গোটা পৃথিবীর সব শ্রোতা ও দর্শক বন্ধুদের আমরা স্বাগত জানাচ্ছি।
আজকে আমরা আগামী এক ঘণ্টা কাটাবো প্রসিদ্ধ ভারতীয় লেখক অরুন্ধতী রয়ের সঙ্গে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’, যা সাহিত্য জগতে আলোড়ন তুলেছিল, তা প্রকাশের পর বিশ বছর কেটে গেছে। বুকার পুরষ্কার পাওয়া এই বইটা যখন ৬০ লাখ কপি বিক্রি হয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ে পরিণত হলো, তখন অরুন্ধতী উপন্যাস লেখা থেকে সরে আসেন। তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ এবং তাঁর নিজের দেশ ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থানের একজন মুখ্য সমালোচক হয়ে উঠেন। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘দ্য ইন্ড অফ ইমাজিনেশন’, ‘ফিল্ড নোটস অন ডেমোক্র্যাসি: লিসেনিং টু গ্রাসহোপারস’ এবং ‘ক্যাপিটালিজম অ্যা ঘোস্ট স্টোরি’। ২০১০ সালে প্রকাশ্যে কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবির পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য এবং ‘কাশ্মীর ভারতের অবিভাজ্য অংশ’ এই ভারতীয় দাবির বিরোধিতা করে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহে অভিযুক্ত হয়ে সম্ভাব্য গ্রেফতারির সম্মুখীন হয়েছিলেন।
অ্যামি গুডম্যান: দুবছর আগে অরুন্ধতী রায় রাশিয়ায় গিয়ে এনএসএ-র তথ্য ফাঁসকারী এডওয়ার্ড স্নোডেনের সঙ্গে দেখা করার সময় খবরের শিরোনামে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পেন্টাগনের তথ্য ফাঁসকারী ড্যানিয়েল এল্সবার্গ এবং অভিনেতা জন কুসাক। স্নোডেনের সঙ্গে তাঁদের কথোপকথনের ভিত্তিতে তিনি জন কুসাকের সঙ্গে যৌথভাবে একটি বই লেখেন, যার নাম ‘থিংস দ্যাট ক্যান এন্ড ক্যাননট বি সেইড’।
বর্তমানে ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’ প্রকাশের কুড়ি বছর পর অরুন্ধতী রায় আবার উপন্যাসে ফিরে এসেছেন এবং সম্প্রতি প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস’। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট তাঁর এই উপন্যাসটির প্রশংসা করে লিখেছে, ‘এটা এক অসাধারণ সৃষ্টি, একটা গল্প যা একই সঙ্গে আন্তরিক এবং আন্তর্জাতিক, ঠাট্টা এবং চূড়ান্ত অবমাননায় ভারী হয়ে উঠেছে। একটা কাহিনী, যা পৃথিবীর সবচেয়ে ভঙ্গুর মানুষটিকেও নাড়িয়ে দেয়, যখন তা আক্রমণ
করে উপমহাদেশের সব থেকে বড় খলনায়কদের। এর রাগের উত্তাপ এবং সমবেদনার গভীরতা আপনাদের ভীত করে তুলবে।’ ভারতীয় সাহিত্য সমালোচক নীলাঞ্জনা রায় উপন্যাসটির প্রশংসা করে বলেছেন, ‘বুলডোজারে গুঁড়িয়ে যাওয়া পৃথিবীর এক বিষাদ সঙ্গীত।’  
আগামী এক ঘণ্টার জন্য অরুন্ধতী রায় আমাদের সঙ্গে স্টুডিওতে যোগ দিয়েছেন।
অরুন্ধতী, ডেমোক্রেসি নাউ-এ আপনাকে আবারো স্বাগত জানাচ্ছি।
অরুন্ধতী রায়: ধন্যবাদ, অ্যামি। এখানে আসতে পেরে খুব ভালো লাগছে।
অ্যামি গুডম্যান: কেমন লাগছে উপন্যাসে ফিরে আসতে পেরে? ‘দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ বইটির জন্য আপনি অনেক বছর ধরে লিখেছেন। এর প্রকাশ নিয়ে আপনার কেমন অনুভূতি হচ্ছে বলুন।
অরুন্ধতী রায়: আসলে উপন্যাসটি বাস্তবে এবং আমার কল্পনায় সবসময়ই ছিল। এটাই আমার আসল ঘর। কিন্তু এটা এমন এক ঘর, যার ছাদ উড়ে গেছে। আপনি জানেন, সবসময় এটা আমার সবটুকু শুষে নেয়- উপন্যাস। আমার যা যা দক্ষতা থাকতে পারে, এর সবটুকুই আসলে এই লেখায় উঠে এসেছে। তাই কাছ থেকে আমি একে অনুভব করি। যদি জীবদ্দশায় আপনার বহু বছর ধরে সবকিছুকে অপব্যয় করার, আপনার সম্পূর্ণ মস্তিষ্ক থেকে পায়ের নখ আর আপনার চুল, দাঁত আর আপনার গলব্লাডার, সবটুকু মিলে একটা জিনিস সৃষ্টির সুযোগ দুবার আসে, এজন্য আপনার খুশি হওয়া উচিত। বিষয়বস্তু যাই হোক না কেন, আপনি জানেন, এ থেকে যা বেরিয়ে আসবে, তা হবে সুন্দর কিছু, যেমনটা আমার করার সুযোগ ছিল।
অ্যামি গুডম্যান: আপনি বলেছেন, উপন্যাস লেখা উপাসনা করার মতোই একটা বিষয় বলে আপনার মনে হয়।
অরুন্ধতী রায়: হ্যাঁ।
অ্যামি গুডম্যান: কেন?
অরুন্ধতী রায়: আমার কাছে এটা চেষ্টার প্রতি মনোনিবেশ করার যোগ্য হয়ে ওঠার ধারণা। যে প্রবন্ধগুলো আমি লিখেছি, তার সবগুলোই ছিল ভারতে যে অবস্থা বিরাজমান, তার উপর জরুরি হস্তক্ষেপ। প্রতিটা ক্ষেত্রেই আমি একটা প্রবন্ধ লিখেছি। আপনি জানেন, এগুলো অনেক সমস্যা তৈরি করতে পারতো। আমি নিজেকে আরেকটা প্রবন্ধ না লেখার প্রতিশ্রুতি দিতাম। কিন্তু আমি তা লিখেছি। সেগুলো ছিল যুক্তি। আর সেগুলো জরুরিও ছিল। সেগুলোর নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিল, একটা পার্থিব গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। কিন্তু যখন আমি উপন্যাস লিখি, সেটা আমার কাছে যুক্তির বিপরীত। অনেকটা এক জগৎ সৃষ্টি করার মতো। জানেন, এটা অনেকটা এমন সব কাজ করা, যা যা দিয়ে আপনি একটা পৃথিবী তৈরি করতে পারেন, যেখানে আপনি চান মানুষ বিস্মিত হোক!
নেরমীন শেখ: বেশ, আপনি বইটার নাম রেখেছেন ‘দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস’, এই নাম রাখা এবং তার সঙ্গে বইটাকে উৎসর্গ করা নিয়ে কিছু বলুন। বইটা উৎসর্গ করা হয়েছে ‘সহানুভূতি না পাওয়াদের প্রতি’।
অরুন্ধতী রায়: গোপনে আমরা সবাই কিন্তু এমনটাই। যদি আমরা তা প্রকাশ না করি তাহলেও। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রকাশ করেন, বাকিরা করেন না। কিন্তু আমার মনে হয় পুরো পৃথিবীটাই বর্তমানে সহানুভূতি না পাওয়াদের দলে রয়েছে। জানেন, অনেকেই মনে করছেন নামটা বিদ্রুপাত্মক, আসলে নামটা কিন্তু বিদ্রুপাত্মক নয়। আমার মনে হয়, মুলগতভাবে মানুষ হিসেবে বর্তমানে আমাদের সুখ অর্জনের পথ, প্রগতির পথ বা সভ্যতা সম্পর্কে প্রচলিত সংজ্ঞাগুলো নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা প্রয়োজন। আপনি জানেন, এই বইয়ের গল্পটা তাদের নিয়ে, যারা বোঝেন যে, এটা একটা ভঙ্গুর বস্তু। সুখে থাকার মানে কোনো ভবন বা প্রতিষ্ঠান নয়, যা চিরকাল থাকবে। এটা ভঙ্গুর। যখন সম্ভব আপনি এটাকে উপভোগ করতে পারেন, আর আপনি তাকে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত জায়গাতেও খুঁজে পেতে পারেন।  চলবে...

Disconnect