ফনেটিক ইউনিজয়
পুরোনো ছকেই আবদ্ধ শ্রমিকের বেতন-বোনাস
ইমদাদ হক

গত রোজার ঈদে আনন্দ ছুঁয়ে যায়নি নারায়ণগঞ্জের ২১টি রপ্তানিমুখী গার্মেন্ট কারখানার শ্রমিকদের। সেই ঈদে বেতন পাননি এসব কারখানার শ্রমিকেরা। আর বোনাস তো পরের ব্যাপার। আড়াই মাস পর আবার এল ঈদুল আজহা। তবে শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি খুব একটা। ঈদের মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকলেও মেলেনি বেতন-ভাতা। গার্মেন্ট কারখানার মালিকদের কাছে বেতন-ভাতার দাবি জানানো হয়েছে বারবার। সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও দিয়েছেন মালিকেরা, কিন্তু বাস্তবে শ্রমিকেরা এখনো পাননি বেতন-ভাতা-বোনাস। শ্রমিকনেতারাও আগেরবারের মতোই কয়েক দিন ধরে মিছিল, মিটিং ও সমাবেশ করে আসছেন। দায়সারা গোছে কর্তৃপক্ষও রুটিন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে। ফল সেই শূন্যই। এমন অবস্থায় নগরের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে এ রকম ঘটনা নতুন নয়। প্রায় প্রতি ঈদের আগেই, দেশের কোথাও না কোথাও ঘটে বেতন-বোনাস না দেওয়ার ঘটনা। শ্রমিকেরা ন্যায্য দাবি আদায়ে মাঠে নামেন। সৃষ্টি হয় এই শিল্পে অস্থিতিশীলতা। এই ঈদেও প্রায় ৪০০টি কারখানায় বেতন-বোনাস নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।
শিল্প পুলিশ বলছে, রাজধানী ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, আশুলিয়া, চট্টগ্রাম মূলত দেশের শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এসব এলাকায় সব মিলিয়ে শিল্পকারখানার সংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার। এর বেশির ভাগই পোশাক কারখানা। পোশাক খাত-সংশ্লিষ্ট সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) হিসাবমতে, দেশে পোশাক কারখানার সংখ্যা প্রায় চার হাজার। তবে প্রকৃত সংখ্যাটা এর চেয়েও কয়েক হাজার বেশি। বেশির ভাগ কারখানায় এই ঈদেও বেতন-বোনাস নিয়ে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র।
জানা গেছে, ২৪ আগস্টের মধ্যেই পোশাকশ্রমিকদের কোরবানির ঈদের উৎসব ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল বিজিএমইএ। পাশাপাশি আগস্ট মাসের বেতনের ৭৫ শতাংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও ছিল। কোনোটাই মানা হয়নি। এর ফলে কয়েক দিন ধরে সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে।
সর্বশেষ অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যমতে, গত অর্থবছরেই পোশাকশিল্প থেকে দেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ২২ হাজার নয় মিলিয়ন ডলার। যা মোট রপ্তানি আয়ের ৯৬ দশমিক ৪ শতাংশ। আর বিশ্বের পোশাকশিল্পে এখনো শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এ খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৪২ লাখ লোকের। তাই প্রশ্ন উঠেছে, বারবার কেন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি? কেন প্রতিবছর বিভিন্ন ইস্যুতে এই সেক্টরে অসন্তোষ, আন্দোলন বা অসহিষ্ণুতা? কেন প্রতি ঈদের আগে বেতন-ভাতার দাবিতে রাস্তায় নামতে হয় শ্রমিকদের?
গত এক দশকের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সময়ে দেশের পোশাক খাত একটি ‘দুষ্টচক্রের’ মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই চক্রের নির্মমতায় পিষ্ট হচ্ছেন লাখ লাখ শ্রমিক। যা হাজার হাজার উদ্যোক্তা ও পোশাক খাতের সুবিধাভোগী অন্য খাত-উপখাতের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা। এই বৃত্তের নিষ্ঠুরতায় স্বস্তি মেলেনি, বরং সঙ্গী হয়েছে উদ্বেগ ও শঙ্কা।
শ্রমিকনেতাদের অভিযোগ, সারা বছর গার্মেন্টস মালিকেরা ঠিকমতো বাণিজ্য করেন। কেবল ঈদ এলেই শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধে সংকট সৃষ্টি হয়। দেখা দেয় মালিকদের আর্থিক সংকট। কিন্তু এর কোনোটাই বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই। তাঁরা মালিকপক্ষের এ টালবাহানাকে ‘শ্রমিক শোষণের আরেকটি কৌশল’ বলে মনে করছেন।
শ্রমিকনেতারা অভিযোগ করেন, এভাবে ন্যায্য মজুরি থেকে শ্রমিকদের বঞ্চিত করেই মালিকেরা সম্পদের পাহাড় গড়ছেন। আর্থিক সংকটের কথা বললেও ঈদ উদযাপন করতে তাঁরা দেশের বাইরে পরিবার নিয়ে ঘুরছেন। শ্রমিকদের দেখিয়েই সরকার থেকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা আদায় করছেন মালিকেরা। নতুন কর্মসংস্থানের নামে আমদানি-রপ্তানিতে ভ্যাট-ট্যাক্স রেয়াতের সুযোগ নিচ্ছেন। কিন্তু এর বিপরীতে শ্রমিকেরা ন্যায্য মজুরিটুকুও পাচ্ছেন না।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশের পোশাক খাতের শ্রমিকদের শ্রম কেবলই বেঁচে থাকার তাগিদে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এখানে সবচেয়ে কম মজুরি দেওয়া হয়। অথচ নিয়মিত মেলে না ন্যূনতম এই মজুরিটুকুও। বিভিন্ন সময় মজুরির দাবিতে তাঁদের রাস্তায় নামতে হয়। খেতে হয় পুলিশের লাঠির বাড়ি। অথচ শ্রমিক অসন্তোষ থাকলে শিল্পের বিকাশ ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবু তাঁরা বিভিন্ন অজুহাতে শ্রমিকদের কম মজুরিতে খাটাতে চান। সময়মতো মজুরি, বোনাস প্রদানে গড়িমসি করেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সুপারিশ ছিল, পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণের।
শ্রমিকনেতাদের দাবি, এখন পর্যন্ত ২০ শতাংশেরও কমসংখ্যক কারখানা উৎসব ভাতা পরিশোধ করেছে। বেতন-ভাতা দেয়নি ৫ শতাংশ কারখানাও। এ অবস্থায় শ্রমিকেরা এবারও ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার উপক্রম হয়েছেন। এ বিষয়ে মালিকদের আন্তরিকতার অভাবকেই দায়ী করছেন তাঁরা। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে শ্রমিকনেতাদের এ দাবির সঙ্গে খানিকটা অমিল রয়েছে শিল্প পুলিশের তথ্যে। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৪০ শতাংশেরও বেশি কারখানায় বেতন-ভাতা পরিশোধ হয়েছে। আর ৮০ শতাংশ কারখানায় শ্রমিকদের প্রাপ্য পরিশোধের তথ্য জানিয়েছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) এবং পোশাকশিল্প মালিক প্রতিনিধিদের সংগঠন বিজিএমইএ।
এ প্রসঙ্গে শ্রমিকনেত্রী মোশরেফা মিশু সাম্প্রতিক দেশকালকে বলেন, পোশাক খাতের শ্রমিকদের সঙ্গে বেতন-ভাতা নিয়ে মালিকদের প্রতারণা রুটিন ওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। ঈদের সময় যার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ দেখা যায়। দাবি আদায়ে কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে শ্রমিকেরা শিকার হন দমনপীড়নের। পুরো ব্যবস্থাই শ্রম অধিকারবহির্ভূত।
অবশ্য বরাবরের মতোই পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে দাবি করেছেন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। তিনি জানান, সব কারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করা হচ্ছে। ঈদের আগেও বেতনসহ বোনাস দেওয়া হচ্ছে। বেশির ভাগ কারখানায় পরিশোধ করা হয়েছে। বাকিগুলোতেও দু-এক দিনের মধ্যেই পরিশোধ করা হবে।
শ্রম ও শ্রমিকবান্ধব নীতিমালার অভাব পরিস্থিতিকেও দায়ী করছেন বিশ্লেষকেরা। সেই সঙ্গে রয়েছে মালিকদের অতিমাত্রায় মুনাফার মানসিকতা ও পেশাগত দক্ষতার অভাব। এ ছাড়া অপেশাদারি ব্যবস্থাপনা, শ্রমবান্ধব ট্র্রেড ইউনিয়ন না থাকা এবং অর্থনীতিবান্ধব কূটনৈতিক কৌশলের অনুপস্থিতিকেও পরিস্থিতির উন্নয়ন না হওয়ার পেছনে দায়ী করা হচ্ছে। এর ফলে মালিকেরা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ নিচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, শ্রমিকদের দক্ষতা-সংকটও রয়েছে। তাঁদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মানসম্পন্ন ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে ওঠেনি এখনো। আবার উদ্যোক্তাদেরও রয়েছে অভিজ্ঞতা ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা। পোশাক খাতকে সুষ্ঠু ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিবেশও এ শিল্পের বিকাশে বাধা। ফলে মালিকেরা কাক্সিক্ষত মুনাফা অর্জন করতে ব্যর্থ হন অনেক সময়। আবার অনেকে পা দেন দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফাঁদে। এর প্রভাব পড়ে শ্রমিকদের বেতন-ভাতায়।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, সময়ের সঙ্গে পোশাক খাতের মালিকেরা বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন ঠিকই। তবে আস্থায় নিতে পারেননি শ্রমিকশ্রেণিকে। একটা পর্যায়ে এসে শ্রমিকেরাও আস্থা হারিয়েছেন মালিকদের প্রতি। মালিক-শ্রমিকের এই দ্বন্দ¦ চরম অবিশ্বাসে পরিণত হয়েছে কারখানার ভেতর। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে পোশাক খাতের অস্থিরতা কাটবে না।

Disconnect