ফনেটিক ইউনিজয়
তবু শঙ্কা কোরবানির বর্জ্য অপসারণ নিয়ে
এ আর সুমন
গত বছর এভাবেই রক্তমিশ্রিত পানিতে সয়লাব হয়েছিল ঢাকা
----

গত বছর কোরবানির ঈদের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া কিছু ছবির কথা নিশ্চয় ভুলে যাননি যে ছবিতে রাজধানী ঢাকার রক্তাক্ত রাজপথ আর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া বর্জ্যরে প্রকট চিত্র ফুটে ওঠে। আর তা দেখে শঙ্কিত হয়েছিলেন নগরবাসী। মূলত কোরবানির বর্জ্য সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনার অভাব আর যত্রতত্র কোরবানি করার কারণে সমস্যাটি সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সঙ্গে যুক্ত হয় বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা। আবারও কোরবানির ঈদ চলে এসেছে, জনমনে তাই এবারও শঙ্কার আভাস দেখা দিয়েছে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে। তবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বলছে, গতবারের চেয়ে আরও কম সময়ে, ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই এবার বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্য রয়েছে তাদের।
ঈদুল আজহা সামনে রেখে রাজধানীর ২৩ স্থানে বসেছে কোরবানির পশুর হাট। এর মধ্যে রয়েছে ২২টি অস্থায়ী ও একটি স্থায়ী হাট। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৯টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৩টি হাট বসেছে। একমাত্র স্থায়ী হাট গাবতলীতেও কোরবানির পশু কেনাবেচার ধুম পড়েছে। তবে কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি নিয়ে আরও তৎপর হওয়ার কথা জানিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। ৩৬ ঘণ্টার আগেই এবার বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্য রয়েছে, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
এবার রাজধানীজুড়ে ১ হাজার ১৭৪টি পশু জবাইয়ের স্থান ঠিক করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) আছে ৬২৫টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ৫৪৯টি।     
ধারণা করা হচ্ছে, এবার রাজধানীতে প্রায় ৫ লাখ পশু কোরবানি দেওয়া হবে। এর মধ্যে উত্তরে ২ লাখ ২১ হাজার এবং দক্ষিণে ২ লাখ ৭৫ হাজার। অন্যদিকে গতবারের মতো এবারও রাস্তাঘাট ও খোলা স্থানে পশু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থান ও বাড়ির আঙিনা ছাড়া অন্য কোথাও পশু কোরবানি করা যাবে না।
বর্তমানে বর্জ্য অপসারণে সিটি করপোরেশনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। বর্জ্য অপসারণের জন্য ঈদের দিন দুপুর থেকে ঢাকা দক্ষিণে নিয়মিত কর্মীসহ ১১ হাজার ২০০ জন শ্রমিক কাজ করবেন। অন্যদিকে উত্তরে নিয়মিত কর্মীসহ ১ হাজার ৯৯৮ জন এবং এর সঙ্গে বাড়তি ঠিকাদারি ভিত্তিতে ১ হাজার ৭৫ জন শ্রমিক কাজ করবেন। আর কেউ নির্দিষ্ট স্থানের বাইরে কোরবানি দিতে চাইলে তাঁদের নিজ দায়িত্বে পশুর বর্জ্য সিটি করপোরেশনের গাড়িতে তুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন করপোরেশনের কর্মকর্তারা।
কোরবানির ঈদ উপলক্ষে জনস্বার্থে ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। কোরবানির পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণে সহযোগিতার জন্য ডিএসসিসির ওয়েবসাইটে গিয়ে অভিযোগ করা যাবে। এই অভিযোগ সঙ্গে সঙ্গে মুঠোফোনের খুদে বার্তার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের কর্মকর্তার কাছে চলে যাবে। প্রতিটি ওয়ার্ডের গলিতে ভ্যানগাড়িতে পানির ট্যাংকের মাধ্যমে ১ হাজার ২০ লিটার জীবাণুনাশক স্যাভলন মেশানো পানি ছেটানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে, বর্জ্য অপসারণের পর ছেটানো হবে ৩৪১ ড্রাম ব্লিচিং পাউডার। ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক মো. শফিকুল আলম সাম্প্রতিক দেশকালকে জানান, এবার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই বর্জ্য অপসারণ করতে প্রস্তুত আছি আমরা। তবে ধারণা করছি ৩৬ ঘণ্টা বা এর আশপাশের সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণ সম্ভব হবে।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, মক্কা নগরীতে কোরবানির জন্য নির্ধারিত স্থান রয়েছে। জায়গাটি স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয়। ভালো ব্যবস্থাপনার ফলে দুর্গন্ধ ছড়ানো, রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটা, পশুর চামড়া বিনষ্ট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। কোরবানির পশুর চামড়া মানসম্মত হওয়ায় দক্ষ হাতে চামড়া ছাড়ানো হলে অযথা আর্থিক ক্ষতিও এড়ানো যায়। আমাদের দেশেও এমন ব্যবস্থার তাগিদ দেন এ পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সংগঠক।
ডিএসসিসি বর্জ্য অপসারণের জন্য হটলাইন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের পরেও পশুর বর্জ্য পড়ে থাকলে নাগরিকেরা হটলাইন সেবার সাহায্যে বর্জ্য অপসারণ করতে পারবেন। আর হটলাইনে ফোন করলেই ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত কর্মীরা আবর্জনা সরানোর উদ্যোগ নেবেন। নাগরিকেরা ০৯৬১১০০০৯৯৯ নম্বরে ফোন দিলেই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বর্জ্য অপসারণে পৌঁছে যাবে বলে জানানো হয়েছে। সিটি করপোরেশন বলছে, কোরবানির বর্জ্য অপসারণে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ঈদের দিন বৃষ্টি থেকে জলাবদ্ধতা তৈরি হলে আমাদের একটি ইমার্জেন্সি টিম প্রস্তুত থাকবে। তারা জলাবদ্ধতা অপসারণের চেষ্টা করবে।
শারীরিক অসুস্থতার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বর্তমানে দেশের বাইরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে বিদেশে যাওয়ার আগেই এ বিষয়ে মেয়রের দেওয়া নির্দেশনা মোতাবেক বর্জ্য অপসারণে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানান ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এম এ রাজ্জাক।
ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণ করে নগরবাসীকে বর্জ্যমুক্ত করার সব প্রস্তুতি ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে। গত বছরের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এবার ঈদে বৃষ্টির জমা পানিতে পশু কোরবানি না করার জন্য নগরবাসীর প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়েছেন। সাঈদ খোকন বলেন, যদি কোরবানির আগে বা পরে বৃষ্টি হয়, তাহলে কোরবানির পানি সরে যাওয়া পর্যন্ত নগরবাসীকে অপেক্ষা করতে হবে। আর তা না হলে শুকনো স্থানে পশু কোরবানি করতে হবে।
সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নগরবাসীর বাসায় বাসায় ব্লিচিং পাউডার, বর্জ্যরে ব্যাগসহ অন্যান্য পরিচ্ছন্নতা সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হবে। এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে এসব পরিচ্ছন্নতা সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও বাড়ি মালিক সমিতির সদস্যদের মাধ্যমে যথাযথভাবে পশু কোরবানির জন্য নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে সিটি করপোরেশন।

Disconnect