ফনেটিক ইউনিজয়
সপরিবার বঙ্গবন্ধু হত্যা
১৫ ও ১৬ আগস্ট জাতির ইতিহাসে কলঙ্কিত দুটি দিন
ড. মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান মানিক

বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলতেই তাঁকে টুঙ্গীপাড়ায় কবরস্থ করা হয়
৪২ বছরেরও বেশি সময় পার হলো। তবু আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, ষড়যন্ত্রকারী চক্র কী কারণে বঙ্গবন্ধুর মরদেহ রাজধানী ঢাকায় কবরস্থ না করে সুদূর টুঙ্গীপাড়ায় কবরস্থ করেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর দিবালোকের চেয়েও স্বচ্ছ। সমগ্র বাঙালি জাতির সর্বকালের গৌরব বাঙালি জাতীয়তাবাদের অবিসংবাদিত মহান নেতা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামটি ধূলিস্যাৎ করার হীন উদ্দেশ্যেই ঘাতকেরা তাঁকে টুঙ্গীপাড়ায় কবরস্থ করেছিল।
এ কথায় কোনো দ্বিধা বা দ্বিমত নেই যে ঘাতক চক্র ভেবেছিল টুঙ্গীপাড়ার মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে বঙ্গবন্ধুকে চিরদিনের জন্য বনবাস দিয়ে তাঁকে বাঙালি জাতির ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে। সমগ্র বাঙালি জনগোষ্ঠীর মুক্তি, সংগ্রাম, বিদ্রোহের প্রতীক, স্বাধীনতার প্রতীক বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করে তাঁকে ঢাকা শহরে সমাহিত করলে তাঁর সমাধিই হবে সংগ্রামী জনতার তীর্থ কেন্দ্র। তাই চিহ্নিত ষড়যন্ত্রকারী চক্র তাদের হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেই জাতির জনককে টুঙ্গীপাড়ায় কবরস্থ করে। তখন থেকেই বঙ্গবন্ধুর নামটি সযত্নে মুছে ফেলার চেষ্টা শুরু হয়।
বঙ্গবন্ধুকে অবমাননাকর অবস্থায় কবরস্থ করা হয়েছিল- এ কথা আজ সর্বজনবিদিত। এ প্রসঙ্গে বিদগ্ধ সাংবাদিক এবং ব্যক্তিগতভাবে আমার অতি প্রিয় গদ্যকার আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মন্তব্য ও মূল্যায়ন প্রণিধানযোগ্য। (যদিও তাঁর মন্তব্য বর্তমান প্রবন্ধের আলোকে দীর্ঘ হয়ে যাবে, তবু প্রাসঙ্গিকতার প্রয়োজনে তা উল্লেখ না করে পারছি না)।
আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন যে, ইত্তেফাক-এর সম্পাদক জনাব তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হঠাৎ ১৯৬৯ সালের ১ জুন রাওয়ালপিন্ডিতে মৃত্যবরণ করেন। তাঁর মরদেহ রাওয়ালপিন্ডি থেকে বিমানে ঢাকায় আনা হয়। সবাই চেয়েছিলেন মানিক মিয়াকে এ দেশের একজন শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে যথাযোগ্য স্থানে সমাহিত করতে। অনেকে বললেন যে, সোহরাওয়ার্দীর কবরের কাছাকাছি মানিক মিয়াকে কবরস্থ করা হোক। এ জন্য সরকারি অনুমতি প্রয়োজন হলো। দেশে যেহেতু সামরিক আইন বলবৎ ছিল, সেহেতু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের অনুমতি চাওয়ার বা নেওয়ার প্রয়োজন হলো। এ ব্যাপারে মরহুম মানিক মিয়ার পরিবারের সদস্যরা চেষ্টা করেও সফলকার্য হননি। অর্থাৎ সামরিক আইন প্রশাসক অনুমতি প্রদান করতে রাজি ছিলেন না। এ প্রসঙ্গে বাকি বক্তব্য গাফ্ফার চৌধুরীর চিরপরিচিত সাবলীল গদ্যে নিম্নরূপ :
মানিক মিয়ার তেইশ নম্বর ধানমন্ডির বাসায় মরদেহের পাশে বঙ্গবন্ধু বসা ছিলেন। আমাকে বললেন, সামরিক প্রশাসককে ফোনে ধরো। আমি ফোন ডায়াল করলাম। শেখ মুজিবের নাম করতেই মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটরকে ফোনের কানেকশন দেওয়া হলো। দুজনের মধ্যে কিছুক্ষণ কথাবার্তা হলো। বুঝতে পারলাম, পাকিস্তানি মেজর জেনারেল বঙ্গবন্ধুর অনুরোধ রাখতেও গড়িমসি করেছেন। মুজিব ফোনের মধ্যেই রেগে বললেন : ‘আমি আমার নিজের লাশের জন্য কবরের জায়গা চাচ্ছি না। চাচ্ছি বাংলাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ সন্তানের জন্য। আপনি অনুমতি দিতে পারছেন না বেশ। বাংলার মাটিতে বাংলার মানুষের কবরের জন্য আপনাদের কাছে ভিক্ষা চাইতে আমি রাজি নই। যেদিন পারব সেদিন নিজেরাই মনুমেন্ট তৈরি করব।’ (আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ইতিহাসের রক্তপলাশ : পনেরো আগস্ট-পঁচাত্তর, পৃষ্ঠা ৩২)
এরপর গাফ্ফার চৌধুরী যা বর্ণনা করেছেন তা প্রকৃত অর্থেই মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক : মুজিব ফোন রেখে দিলেন। তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার জন্য ভাবি না। বাংলার কোনো গ্রামে, ধানক্ষেতের পাশে কিংবা বাঁশবাগানে কবর হলেই চলবে। কবরে শুয়ে যেন বাংলার মাটির স্বাদ পাই, বাংলার পাখির গান শুনি আর বাংলার সোনালি ধানের ঘ্রাণ পাই।’
আজ এসব লিখতে বসে নিজের কাছেও মনে হচ্ছে রূপকথার মতো। ১৯৬৯ সালের ২ জুন ঢাকায় মানিক মিয়ার মরদেহের পাশে বসে কথাগুলো বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু। মাত্র ছয় বছরের মধ্যে তাঁর এই কথা এমন অক্ষরে অক্ষরে সত্য হবে, সেদিন কল্পনাও করিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে তাঁকে হত্যা করে টুঙ্গীপাড়ায় নিয়ে কবর দেওয়ার নামে কোনো রকম মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে বাংলার মানুষকে জানাজা পড়ার সুযোগ দেওয়া তো দূরের কথা, ‘ইন্নালিল্লাহ’ পাঠ করার সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। কিন্তু আমি জানি, রুদ্ধবাক প্রত্যেক বাঙালির অন্তরে আজ গুমরে উঠছে একটি ধ্বনি, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’। আর বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশাও হয়েছে বাস্তব। তিনি এখন নিজের গ্রামের মাটিতে শুয়ে আছেন। তাঁর কবরের ঘাস ধুয়ে দেয় ভোরের শিশির। গান শোনায় বাংলার পাখি। বাংলাদেশ থেকে ছয় হাজার মাইল দূরে বসে যখন ভাবি এসব কথা, বঙ্গবন্ধুর কথা, তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই গানটি আমার মনে পড়ে, ‘মুক্তিদাতা, তোমার ক্ষমা/ তোমারই দয়া/ রবে চির পাথেয়/ চির যাত্রার’। (প্রগুক্ত বই পৃষ্ঠা ৩২)। (চলবে)

Disconnect