ফনেটিক ইউনিজয়
ভোলায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়নি
মারুফ আহমেদ

ভোলায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়নি, বরং ভোলায় যে গ্যাস পাওয়া গেছে, তাতে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাস মজুতের পরিমাণ বেড়েছে। দ্বীপজেলাটির এই ক্ষেত্রের মজুত এক ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে প্রাক্কলন করেছে তেল-গ্যাস উত্তোলনে ও অনুসন্ধানে একমাত্র রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাপেক্স। এর আগে এ ক্ষেত্রে দশমিক ৬৬৫ টিসিএফ গ্যাস রয়েছে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছিল।
১ নভেম্বর সকালে ভোলায় একটি নতুন কূপ থেকে গ্যাসের প্রবাহ শুরু হয়। এই কূপটি শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্রের প্রথম কূপ থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার এবং তৃতীয় কূপ থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে খনন করা হয়। এটি খনন করে রাশিয়ার কোম্পানি গ্যাজপ্রম। এর আগে গত ২৩ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল্লাহ বলেন, ভোলায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এতে প্রায় দশমিক ৭ টিসিএফ গ্যাস রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের একাধিক কর্মকর্তারা জানান, যে কূপ থেকে গ্যাস উদ্গীরণের কারণে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল, তা মূলত শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র এলাকারই অন্তর্গত। তাই নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে এমনটি বলা যায় না। তবে গ্যাসের নতুন উৎস সন্ধানে শিগগিরই বর্তমান ক্ষেত্রটির সংলগ্ন এলাকায় আরেকটি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হবে।
এ প্রসঙ্গে বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নওশাদ ইসলাম বলেন, ভোলায় খননকৃত নতুন কূপের গ্যাস-প্রবাহ বিশ্লেষণ করে শাহবাজপুরের গ্যাসের মজুত পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন শাহবাজপুর পূর্ব কূপ খনন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শাহবাজপুরে ১ টিসিএফ গ্যাস রয়েছে। এ ক্ষেত্রের আকার ও কাঠামো ভালোভাবে মূল্যায়নের জন্য আরও উন্নয়ন কূপ খনন করা প্রয়োজন। নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধানে আমরা আরেকটি কূপ খনন করব।
বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মরতুজা আহমেদ চিশতী এবং বর্তমানে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা জানান, ভোলায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র থাকার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হওয়ার ঘোষণাটি অনেকটাই অপরিপক্ব। একই কাঠামোতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে বলা হলে বিদ্যমান ক্ষেত্রের মজুত কম দেখাতে হবে। একই কাঠামোতে গ্যাসের উন্নয়ন কূপ খনন করা হয়, অনুসন্ধান নয়। কিন্তু উন্নয়ন কূপকে অনুসন্ধান কূপ বলা দুঃখজনক। জ্বালানি প্রকৌশল বিবেচনায় সেখানে নতুন গ্যাসক্ষেত্র থাকার সম্ভাবনা কম।
তাঁরা বলেন, একটি কাঠামোকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত এলাকায় বিদ্যমান গ্যাসের গোটা মজুত নিয়েই একটি গ্যাসক্ষেত্র। যে এলাকায় নতুন কূপ থেকে গ্যাস-প্রবাহ শুরু হওয়ায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তা আগে আবিষ্কৃত এলাকার মধ্যেই রয়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র ৬৯ কিলোমিটারজুড়ে রয়েছে। ক্ষেত্রের কেন্দ্র থেকে পূর্ব-পশ্চিমে ৪ কিলোমিটার ব্যাসার্ধেও এটির অস্তিত্ব আছে বলে ধরা হয়। নতুন খননকৃত কূপটি শাহবাজপুর ক্ষেত্রের কেন্দ্র থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটারের মধ্যেই অবস্থিত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন গ্যাসের সন্ধান পাওয়া দেশের জন্য নিশ্চিতভাবেই সুখবর। তবে একই কাঠামোতে একাধিক কূপ দেখনো হলে অতিরিক্ত অর্থ খরচের পথ তৈরির পাশাপাশি প্রকৌশলগত ত্রুটিও তৈরি হয়। আর এক গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে কিংবা কাছাকাছি আরেকটি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয় না। যেটি হয়, তা মূলত সংস্কার বা উন্নয়ন কূপ।
খননকাজের সঙ্গে জড়িত বাপেক্সের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, নতুন কূপে গ্যাসের চাপ পাওয়া গেছে ৫ হাজার পিএসআই। এটি শাহবাজপুরের অন্য কূপগুলোর কাছাকাছি চাপ। এর মাধ্যমে এটি নিশ্চিত যে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্রটির আকার আগের ধারণার চেয়ে বড়।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নওশাদ ইসলাম বলেন, সাধারণত একটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়। শাহবাজপুর এলাকায় ত্রিমাত্রিক জরিপ চালিয়ে আমরা দুটি পৃথক ভূস্তরে গ্যাস জমা রয়েছে বলে ধারণা করেছিলাম। তাই ওই স্তরের গ্যাস সন্ধানের জন্য আমরা অনুসন্ধান কূপই খনন করেছিলাম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই স্তরে যে গ্যাস রয়েছে, তা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের উপযুক্ত নয়।
এদিকে বাপেক্স জানিয়েছে, ভোলা উত্তর নামে আরেকটি কূপ আগামী ডিসেম্বর মাসেই খনন করবে গ্যাজপ্রম। এটি শাহবাজপুর ক্ষেত্র থেকে ২০ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে। এই দুই কূপ খননের বিনিময়ে তারা পাবে ৩ কোটি ৩২ লাখ মার্কিন ডলার।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ টিসিএফ উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত রয়েছে। দৈনিক পৌনে ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহ করছে। গ্যাসের মজুত ক্রমেই কমছে। এ অবস্থায় বাপেক্স গ্যাস অনুসন্ধানে ১০৮টি কূপ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সেই পরিকল্পনার আওতায় প্রথম কূপ খনন করা হয় ভোলার শাহবাজপুরে।

Disconnect