ফনেটিক ইউনিজয়
বিশ্বজিতের খুনি ও বিবিধ প্রশ্ন
আমীন আল রশীদ

গত ১ নভেম্বর পুরান ঢাকার দরজি-দোকানি বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। নৃশংস এই হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আট আসামির মধ্যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, চারজনের মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন এবং অপর দুজনকে খালাস দিয়ে ৬ আগস্ট রায় দেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া ১৩ আসামির মধ্যে যে দুজন আপিল করেন, তাঁরা খালাস পান। আসামিদের সবাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও কবি নজরুল সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন।
দেশে প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকা খুন-ধর্ষণের সঙ্গে বিশ্বজিতের হত্যাকাণ্ডটি একটু ভিন্ন। কেননা এই খুনটি হয়েছিল প্রকাশ্য দিবালোকে এবং পুরো হত্যাকাণ্ডটি গণমাধ্যমের ক্যামেরাবন্দি হয়। এই ঘটনার অনেকগুলো ডাইমেনশন আছে। সেসব নিয়ে আলোকপাতের আগে একনজরে দেখে নেওয়া যাক সেদিন আসলে কী ঘটেছিল?
২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট সরকারবিরোধী অবরোধ কর্মসূচি দেয়। এর সমর্থনে সকাল নয়টার দিকে পুরান ঢাকা জজ কোর্ট থেকে সরকারবিরোধী আইনজীবীরা একটি মিছিল বের করেন। মিছিলটি ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে গেলে একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও কবি নজরুল সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আইনজীবীদের ওপর হামলা চালান। আক্রান্ত আইনজীবীরা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় ধাওয়া খেয়ে পুরান ঢাকার নিউ আমন্ত্রণ টেইলার্সের কর্মী বিশ্বজিৎ দৌড়ে প্রথমে কাছের একটি ভবনের দোতলায় একটি ডেন্টাল ক্লিনিকে আশ্রয় নেন। ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা সেখানে বিশ্বজিতের ওপর হামলা চালান। নির্বিচার কিল-ঘুষি-লাথি চালানো হয়। তাঁর গায়ে লোহার শলাকা দিয়ে আঘাত করা হয়। চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। পথচারীদের কয়েকজন বিশ্বজিৎকে পাশের ন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে ছাত্রলীগের কর্মীরা তাতেও বাধা দেন। প্রাণ বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় উঠে দৌড় দেন তিনি। কিন্তু শাঁখারীবাজারের একটি গলিতে গিয়ে ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে।
দেশব্যাপী আলোড়ন তোলা ওই হত্যা মামলায় ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর রায় দেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪। এতে ২১ আসামির মধ্যে আটজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বিশ্বজিতের এই হত্যাকাণ্ডের ফলে ফের প্রশ্নবিদ্ধ হয় দেশের ছাত্ররাজনীতি। ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ এবং এরপর ১৯৪৭ সালের ‘দেশভাগে’ ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল। ১৯৫২ সালের ‘ভাষা আন্দোলন’, ১৯৬২ সালের ‘শিক্ষা আন্দোলন’, ১৯৬৯ সালের ‘গণ-অভ্যুত্থান’, ১৯৭১ সালের ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ’ এবং আশির দশকে ‘স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন’-এসব জাতীয় আন্দোলনেও ছাত্রসমাজের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। ওই সময়ে ছাত্ররা যা করেছেন, তার নাম ছিল ‘ছাত্র আন্দোলন’। কিন্তু এরপরই ‘ছাত্র আন্দোলন’ শব্দ যুগল ছাত্ররাজনীতিতে রূপ লাভ করে এবং তখন থেকেই অবক্ষয়ের শুরু।
ছাত্রদের ব্যবহার করে রাজনীতিবিদেরা যেমন রাজনীতি শুরু করলেন, তেমনি ছাত্ররাও দেখলেন ছাত্রত্বের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখে রাজনীতি করেই ফ্ল্যাট-গাড়ির মালিক হওয়া যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় কঠোর অধ্যবসায়ের পর, জুতার তলা খোয়ানোর পরও যেখানে একটি ভালো চাকরির নিশ্চয়তা নেই, সেখানে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে নিজের ‘দক্ষতা’ ও ‘প্রয়োজনীয়তা’ প্রমাণ করতে পারলেই অর্থবিত্ত সুনিশ্চিত। যে ছাত্র হয়তো কোনো দিন এসি বাসে চড়েই চট্টগ্রামে যাননি বা যাওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা যাঁর পরিবারের ছিল না, তিনিই হয়তো এখন ছাত্ররাজনীতিতে নাম লিখিয়ে দামি গাড়িতে চড়ছেন, এমনকি হেলিকপ্টারেও উড়ছেন। সুতরাং ছাত্ররাজনীতি এখন একটি বিশাল ব্যবসাও বটে।
যাঁরা দেশ পরিচালনা করেন, যাঁরা একসময় ছাত্রনেতা ছিলেন, তাঁরাও কখনো রাজপথে এভাবে চাপাতি নিয়ে ছাত্রদের দৌড়ানো নিরুৎসাহিত করেন না। বরং বিরোধী মত দমনে তাঁরা এই ছাত্রদেরই ব্যবহার করেন। বিরোধী রাজনীতিকেরাও সরকারবিরোধী আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি মনে করেন ছাত্রদেরই। সরকারবিরোধী আন্দোলনে তাঁরা কে কতটা পেট্রলবোমা ছুড়তে পারলেন বা কত বড় মিছিল করতে পারলেন, তার ওপরই নির্ভর করে ক্ষমতায় গেলে তাঁরা কে কী পাবেন।
কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন আর নেতৃত্ব শেখার কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই। যেসব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হয়, তারও অধিকাংশ দলীয় চিন্তাচেতনার মোড়কে আবদ্ধ। ছাত্র সংসদ নির্বাচন কী জিনিস, তা বোধ হয় দেশের মানুষ ভুলেই গেছে। ছাত্রদের শিক্ষাবিষয়ক দাবিদাওয়া নিয়ে কথা বলার কোনো গোষ্ঠী নেই। কিছু বামপন্থী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা এ নিয়ে কথাবার্তা বলার চেষ্টা করলেও তাঁদের কণ্ঠ তত উচ্চকিত নয়। মূলধারার রাজনীতির দাপটে এই ক্ষীণ কণ্ঠস্বর অনেক সময় কর্তৃপক্ষের কানেও পৌঁছায় না বা পৌঁছালেও সংশ্লিষ্টরা তাতে কান দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেন না।
আজকের বাস্তবতা হলো, ছাত্র বা যুব-তরুণদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে এখন কারও পক্ষে নেতা হওয়া সম্ভব নয়। এমপি তো অনেক বড় ব্যাপার, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়াও অসম্ভব। সুতরাং রাজনীতি ও ক্ষমতার নামে যেসব বখে যাওয়া তরুণের চাপাতির কোপে বিশ্বজিতের মতো পথচারীরা প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হন, সেই তরুণদের বিপথে যাওয়ার দায়ভার কার? ওই বখে যাওয়া তরুণদের অভিভাবকেরা কি দায় এড়াতে পারেন? কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়েই কি তাঁদের দায়িত্ব শেষ? তাঁর সন্তান কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কী করেন, কাদের সঙ্গে মেশেন, কী বোধ, চেতনা ও দর্শনে তিনি পরিণত বয়সে পা দিচ্ছেন, সেদিকে খেয়াল কে রাখবেন, শিক্ষক?
যে শিক্ষকদের একাংশ বিবিধ চৌর্যবৃত্তিতে লিপ্ত, বাড়তি সুযোগ-সুবিধার আশায়, বড় পদ লাভের লোভে রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করেন, এমনকি মারামারিও করেন, সেই শিক্ষকেরা একজন বিপথগামী তরুণকে কী করে সুপথে আনবেন? শোনা যায়, এখন রাজনৈতিক নেতাদের মতো অনেক শিক্ষকও তাঁদের নিজেদের পদ-পদবি ধরে রাখতে বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে ক্ষমতাবান হতে বা ক্ষমতা ধরে রাখতে তাঁদের ছাত্রদের মধ্য থেকেই কিছু ক্যাডার পোষেন।
যে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিই দেওয়া হয় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের পরিচয় আছে কি না, সেই বিবেচনায়-সেই শিক্ষার্থীরা হাতে চাপাতি নিয়ে বিশ্বজিতদের পেছনে ধাওয়া করলে তাতে আর বিস্ময়ের কী আছে? কিন্তু আমাদের বিচারব্যবস্থা শুধু ওই ধাওয়াকারী ছাত্রদেরই বিচারের ক্ষমতা রাখে। যাঁদের কারণে তাঁরা হাতে চাপাতি নিলেন, সেই অভিভাবক, শিক্ষক বা রাজনীতিকেরা আড়ালেই থেকে যান। সেই শিক্ষকেরাই ক্লাসে নীতিকথা বলেন। সেই রাজনীতিকেরা উন্নয়নের কথা বলেন। সেই অভিভাবকেরাই হয়তো নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড করে বেড়ান। অথচ তাঁর সন্তান যে রাজপথে চাপাতি নিয়ে দৌড়ান, সে খবর রাখার সময় নেই তাঁদের।

Disconnect