ফনেটিক ইউনিজয়
সৃজনশীল পাঠে অবারিত কোচিং বাণিজ্য
এম ডি হোসাইন

কোচিং বাণিজ্যের হাত থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থায় সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হলেও, এ পদ্ধতিই এখন বড় ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর পর অবারিত হয়েছে প্রাইভেট আর কোচিং বাণিজ্য; এমনটাই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর পর শিক্ষার্থীদের নোট গাইড-নির্ভরতা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে কোচিং-প্রাইভেটের প্রতি ঝোঁক ও নির্ভরতা। সেই সঙ্গে বেড়েছে মডেল টেস্ট বাণিজ্য। এ ব্যবসায় এখন যুক্ত হয়েছে স্বয়ং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে কোচিং বাণিজ্য বন্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কঠোর নির্দেশনাও মানছেন না শিক্ষকেরা। বরং অতিরিক্ত ক্লাস আর মডেল টেস্টের নামে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কোচিংবাজ শিক্ষকেরা ক্লাসে না পড়িয়ে কৌশলে শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে নিতে সৃজনশীল পদ্ধতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছেন। নিরুপায় হয়ে বিত্তশালী পরিবারের শিক্ষার্থীরা এ জোয়ারে গা ভাসালেও নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা পড়েছেন বিপাকে।
শিক্ষাবিদেরা বলছেন, সৃজনশীল পদ্ধতি মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে অনেক অনেক বেশি কার্যকরি ও সহজে আয়ত্তকরণযোগ্য। শ্রেণিকক্ষে ভালো করে পড়ালে এ জন্য প্রাইভেট বা কোচিংয়ের কোনো প্রয়োজন নেই। তাদের ভাষায়, এ পদ্ধতিতে কিছু কৌশল অবলম্বন করে পড়াতে হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীল পদ্ধতিকে কঠিন বিষয় বলে উপস্থাপন করছেন। ফলে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত শিক্ষণ না পেয়ে বাধ্য হয়ে ছুটছে কোচিংয়ের সান্নিধ্যে। অভিযোগ উঠেছে, বেশির ভাগ শিক্ষকই সৃজনশীল পদ্ধতিকে শিক্ষার্থীদের জন্য আতঙ্ক হিসেবে উপস্থাপন করছে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যেও তৈরি করেছে এক ভীতিকর পরিবেশ। ফলে শেষ রক্ষা হিসেবে যেকোনো মূল্যে কোচিংয়ের সান্নিধ্যে যেতে শিক্ষার্থীরাও মরিয়া হয়ে উঠেছে। পুরো ব্যবস্থাটিকে এমন এক স্থানে নিয়ে দাঁড় করানো হয়েছে যে কোচিং, টিউশন ছাড়া এ ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের জন্য অকল্পনীয় হয়ে উঠছে। আবার সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হলেও শিক্ষকেরা সে মতো শিক্ষার্থীদের না পড়িয়ে মুখস্থ বিদ্যার ধারা অব্যাহত রাখছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান বলেন, সৃজনশীল পদ্ধতি পরীক্ষার প্রশ্ন পাঠ্যবইনির্ভর। একজন শিক্ষার্থী যদি ভালোভাবে পাঠ্যবই পড়ে, তাহলে তার কোচিংয়ে পড়ার প্রয়োজন নেই।
ঢাকার বাইরের অনেক শিক্ষক জানান, তাঁরা নিজেরা কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে চালিয়ে নিলেও গ্রামের সাধারণ অল্পশিক্ষিত অভিভাবকদের এ সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। ফলে গ্রামের শিক্ষার্থীরা এখনো সৃজনশীল বিষয়ে ভীতিজনক অবস্থায় রয়েছে। এ নিয়ে চলছে এক তালগোলে অবস্থা। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কুরে কুরে খাচ্ছে অনেককে। বাধ্য হয়ে প্রাইভেট-কোচিং ও নোট-গাইডের নামে বাজারে আসা বিভিন্ন ধরনের সহায়ক পুস্তকের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। তারা জানায়, আগে যেখানে একটি বিষয়ে একটি গাইড কিনলে চলত, এখন সেখানে এক বিষয়ে অনেক সহায়ক বই কিনতে হয় প্রশ্নের ধরন সম্পর্কে ধারণা লাভের জন্য। অভিভাবকেরা জানান, যেসব বিষয়ে সৃজনশীল চালু হয়েছে, সেসব বিষয়ে নোট-গাইড কেনেনি, এ রকম শিক্ষার্থী সম্ভবত কেউ নেই।
তবে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, শিক্ষা নিয়ে আর কোনো ব্যবসা চলবে না, কারণ কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে আইন করা হচ্ছে। দেশের যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোচিং বাণিজ্য হচ্ছে। তা অচিরেই বন্ধ করতে হবে। গাইড ও নোট বই বন্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। শিক্ষকদের মহান এই পেশাকে কলুষিত করে যেসব শিক্ষক কোচিং বাণিজ্য করে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে প্রায় পৌনে দুই লাখ কোচিং সেন্টার রয়েছে। সকালে, বিকেলে, রাতে এমনকি স্কুল-কলেজ চলাকালীনও শিক্ষকদের কোচিং সেন্টারে ক্লাস নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
রাজধানীর কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোচিং থেকে যেসব শিট-নোট প্রদান করা হয়, তা কোচিং করে না এমন শিক্ষার্থীদের না দেওয়ার জন্যও কঠোরভাবে শাসিয়ে দেওয়া হয়। এসব শিট কোচিংয়ের বাইরে কোনো শিক্ষার্থীর হাতে গেলে কোচিংয়ের শিক্ষার্থীদের এর জন্য শাস্তিও পেতে হয়। খাতা দেখার সময় ‘কোচিংবাজ’ শিক্ষকেরা তাঁদের গৎবাঁধা প্রশ্নের উত্তর না পেলে নম্বর কমিয়ে দেন। অন্যভাবে লেখা উত্তর ভালো মানের হলেও তা ওই সব শিক্ষকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। রাজধানীর ভিকারুননিসা, মতিঝিল আইডিয়াল, হলিক্রসসহ বেশ কয়েকটি স্কুলের একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা সব বিষয়ের জন্যই কোচিং করে থাকে। এসব কোচিংয়ে সৃজনশীল পদ্ধতির প্রশ্নের উত্তরের শিট দেওয়া হয় এবং এ শিটে থাকা নির্দিষ্ট উত্তর পরীক্ষার খাতায় লিখলেই ভালো নম্বর দেওয়া হয়। অথচ সৃজনশীল পদ্ধতিতে এ ধরনের কোনো মুখস্থ বিষয়ই থাকার কথা নয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোচিং বাণিজ্যের জন্য সৃজনশীল পদ্ধতি একটি নামমাত্র পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে। বাস্তবিক অর্থে এ পদ্ধতি আগের মুখস্থনির্ভর পদ্ধতির স্থানেই রয়েছে।
শিক্ষাবিদেরাও বলছেন, কোচিং বাণিজ্য বন্ধ না করে সৃজনশীল পদ্ধতি কার্যকর করাও বেশ কষ্টসাধ্য হবে। বিশেষ করে নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং করানোর মতো বিষয় বন্ধ না হলে মুখস্থ বিদ্যার ওপর থেকে নির্ভরতা কাটানো আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও ঘোর সংশয় তৈরি হয়েছে।

Disconnect