ফনেটিক ইউনিজয়
সিপিএ সম্মেলন : কী পেল বাংলাদেশ?
মাসুদুর রহমান
সিপিএ সম্মেলনে উদ্বোধনী ভাষণ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (ফাইল ফটো)
----

রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের একটা বড় প্ল্যাটফর্ম ছিল সিপিএ সম্মেলন। বাংলাদেশ বিদেশি সংসদ সদস্যদের সামনে এই ইস্যু তুলে ধরেছে। এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাড়াও মিলেছে। বিদেশি এমপিরা রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে সিপিএ সম্মেলনে একটি প্রস্তাব গ্রহণের কথা বলেছেন। সিপিএ সম্মেলন থেকে এটা বাংলাদেশের একটা বড় প্রাপ্তি। তবে সংকট সমাধানে কার্যকর অগ্রগতি পর্যন্ত এই চাপ ধরে রাখতে পারলে তবেই তা সত্যিকার অর্থে কাজে লাগবে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশের আওতাধীন দেশগুলোর ক্লাব হলো কমনওয়েলথ। গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার প্রভৃতি অভিন্ন মূল্যবোধের কারণে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সংসদ সদস্যরা ‘কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন’ (সিপিএ) গঠন করেন। সিপিএ আয়োজিত এটা ৬৩তম ‘কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি কনফারেন্স’ (সিপিসি)। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম সংসদীয় ফোরাম কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে ৪৪টি দেশ এই সম্মেলনে অংশ নিয়েছে। এসব দেশের জাতীয় ও প্রাদেশিক সংসদের ৫৬ জন স্পিকার, ২৩ জন ডেপুটি স্পিকার, সংসদ সদস্যসহ ৫৫০ প্রতিনিধি এ সম্মেলনে যোগ দেন।
এর আগে ৬২তম সিপিএ সম্মেলন বাংলাদেশে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে এটার আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। ফলে এবারের সম্মেলন আয়োজন করে বাংলাদেশ। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সিপিএ সদস্যপদ লাভ করে।
অনেকে বলে থাকেন, এখন ঔপনিবেশিক আমল নেই। ফলে জোট হিসেবে কমনওয়েলথের মূল্য অনেক কমে গেছে। তবে এটার একটা অন্য রকম মূল্য আছে। সেটা হলো, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে ধারণ করার মূল্য। কমনওয়েলথ একবার পাকিস্তানকে বহিষ্কার করেছিল। কমনওয়েলথ অ্যাকশন গ্রুপ (সিমেগ) নামের একটি বডি আছে। এই গ্রুপ দেশগুলোর কমনওয়েলথ মূল্যবোধ আছে কি না, তা যাচাই করে। ওই সময়ে সামরিক শাসন জারি হওয়ায় পাকিস্তানকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় সিমেগ। কমনওয়েলথ তা অনুমোদন করে। ফলে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি ভীষণ বিনষ্ট হয়। গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, স্থিতিশীলতা, জনগণের ক্ষমতায়ন, সমৃদ্ধি অনেক কিছুই নির্ভর করে। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশের কাছে কমনওয়েলথের মূল্য অপরিসীম। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি আঙ্গিকে এই মূল্য বিবেচ্য।
সিপিএ সম্মেলন আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয় সে ব্যাপারে একটা চাপ অনুভব করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিপিএ সম্মেলনে তাঁর ভাষণে গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতি জোর দিয়েছেন। তিনি সংসদীয় কূটনীতি প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন একতরফা অনুষ্ঠানের পর পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেকটাই বিযুক্ত হয়ে পড়েছিল। সেই সম্পর্ক জোড়া দিতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। সিপিএ সম্মেলন আয়োজন করে দৃশ্যত বাংলাদেশ অঙ্গীকার করল যে এই দেশ আগামী দিনে গণতান্ত্রিক ধারায় চলবে। ফলে সিপিএ আয়োজন একদিকে বাংলাদেশকে তুলে ধরার সুযোগ হলেও বাংলাদেশের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করেছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও চর্চা শক্তিশালী করে বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জে উত্তীর্ণ হতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সম্মেলনে দাঁড়িয়ে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন কামনা করেছেন। এর আগে জাতিসংঘেও তিনি এই ধরনের সমর্থন চেয়ে রোহিঙ্গা সংকটকে বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন। সিপিএ সম্মেলনেও প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের লক্ষ্যে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এক বিশেষ অধিবেশনে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা এবং তার জের ধরে কীভাবে রোহিঙ্গাদের ঢল বাংলাদেশে নেমেছে, সেটা তুলে ধরেন। ২৫ আগস্টের পর থেকে ছয় লাখ ২২ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। এদের সাময়িক আশ্রয় দেওয়া হলেও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান জরুরি। এ ক্ষেত্রে বিষয়টি অব্যাহতভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে রাখার প্রয়োজন রয়েছে বলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়।
বর্তমান বিশ্ব জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের কারণে বিভিন্ন হুমকির মধ্যে বাস করছে। বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ হুমকিটা অনেক বেশি। বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও জনসংখ্যা ১৬ কোটি, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান। সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের কারণে বাংলাদেশের সুনাম থাকলেও বিশ্বব্যাপী উগ্রবাদের উত্থানের সঙ্গে বাংলাদেশের ওপর তার প্রভাবের আশঙ্কা কেউই উড়িয়ে দিচ্ছেন না। হলি আর্টিজানের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার পর এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব বিভিন্নভাবে পড়েছে। অনেক বিদেশি ব্যবসায়ী তাঁদের বৈঠক বাংলাদেশ থেকে স্থানান্তর করে নেন। বাংলাদেশিদের অনেক দেশের ভিসা পেতে সমস্যা হয়েছে। তার বিপরীতে এই ধরনের বড় মাপের আন্তর্জাতিক ইভেন্টের আয়োজন হলে, বাংলাদেশের প্রতি আস্থার সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ¦ল হবে। সিপিএ সম্মেলনের আয়োজন সেই মানদণ্ডেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সম্মেলনের খবর প্রকাশের মাধ্যমে বিশ্ব মিডিয়ায় বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে। সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশের মানুষের উদার ও সহনশীল পরিচিতি সম্মেলনের ডেলিগেটদের মাধ্যমে ছড়াবে। বাংলাদেশের পণ্য, বাণিজ্য ও ব্যাপ্তি সম্পর্কেও বিশ্বের মানুষ জানতে পারবে। এসব বিবেচনায় সিপিএ আয়োজন বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক।

Disconnect