ফনেটিক ইউনিজয়
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি : চাপের মুখে নিম্ন আয়ের মানুষ
মারুফ আহমেদ

ঢাকার চেয়ে গ্রামের একটি পরিবারের আয় প্রায় তিন গুণ কম। রাজধানী ও দেশের অন্য শহর-গ্রামের জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেও রয়েছে বড় বৈষম্য। অথচ আবাসিক শ্রেণির বিদ্যুতের দাম ঢাকার চেয়ে বেশি হারে বেড়েছে দেশের অন্যান্য জেলায়-গ্রামাঞ্চলে। সব বিতরণকারী কোম্পানির জন্য বিদ্যুতের অভিন্ন দাম নির্ধারণ করায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর থেকে নতুন মূল্যহার কার্যকর হবে।
গত ২৩ নভেম্বর বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করে বিজ্ঞপ্তি জারি করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের দাম গড়ে ৩৫ পয়সা বা ৫ দশমিক ৩০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। এ নিয়ে গত আট বছরে বিদ্যুতের দাম বাড়ল আটবার। ২০০৯ সালে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম যেখানে গড়ে আড়াই টাকা ছিল, এখন তা বেড়ে ৬ টাকা ৮৫ পয়সায় দাঁড়াচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রামের অর্থনীতি শহরের চেয়ে দুর্বল। তাই এত দিন ঢাকার চেয়ে গ্রামে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির হার কম ছিল। এবার সেটি সমান নয় বরং বেড়ে গেছে। গ্রামীণ জীবন ও অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ ছাড়া বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সময়কাল নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে গ্রামাঞ্চলে। বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন জনপ্রতিনিধি জানান, তেলভিত্তিক সেচপাম্প কমে বিদ্যুৎভিত্তিক সেচপাম্পের ব্যবহার বাড়ছে। গত বোরো মৌসুমে ফলন কম হওয়ায় কৃষক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। এবার ঠিক বোরো মৌসুম শুরুর আগে সেচের খরচ বাড়িয়ে দেওয়া হলো। এটি সময়োপযোগী হয়নি। বর্তমানে এ শ্রেণির প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৩ টাকা ৮০ পয়সা হলেও ডিসেম্বর থেকে সেটি ৪ টাকা গুনতে হবে।
নতুন মূল্যহারে আবাসিকে প্রথম ধাপে (০-৭৫ ইউনিট) বিদ্যুতে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ টাকা। দ্বিতীয় ধাপের (৭৬-২০০ ইউনিট) গ্রাহকদের ৫ টাকা ৪৫ পয়সা, তৃতীয় ধাপের (২০১-৩০০ ইউনিট) ৫ টাকা ৭০ পয়সা, চতুর্থ ধাপের (৩০১-৪০০ ইউনিট) ৬ টাকা ২ পয়সা, পঞ্চম ধাপের (৪০১-৬০০) ৯ টাকা ৩০ পয়সা ও ষষ্ঠ ধাপের (৬০০ ইউনিটের বেশি) গ্রাহকদের ১০ টাকা ৭০ পয়সা হারে বিল পরিশোধ করতে হবে।
বিদ্যমান ও নতুন মূল্যহার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্রাহকনির্বিশেষ বিদ্যুতের দাম গড়ে ৫ দশমিক ৩০ শতাংশ বেড়েছে। তবে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আবাসিক গ্রাহকদের জন্য এ হার সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বিতরণকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে এ মূল্যবৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ। অথচ সবচেয়ে কম বেড়েছে ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ও ঢাকা ইলেকট্রিক পাওয়ার সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) গ্রাহকদের। ডিপিডিসির গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম সর্বোচ্চ ২ দশমিক ২৯ শতাংশ ও ডেসকোর গ্রাহকদের সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫২ শতাংশ বেড়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ও নর্দার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম সর্বোচ্চ বেড়েছে ৭ দশমিক ২১ শতাংশ হারে।
এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, গ্রামের গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতা চিন্তা করেই আগে তাদের জন্য বিদ্যুতের মূল্য ও মূল্যবৃদ্ধির হার কিছুটা কম রাখা হতো। এবার অভিন্ন মূল্যহার নির্ধারণ করায় তারা বঞ্চিত হলো। এটি অন্যায্য।
গত বছর বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ‘রাজনীতি, সুশাসন এবং মধ্যম আয়ের আকাক্সক্ষা : বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জসমূহ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীর একটি পরিবার প্রতি মাসে গড়ে ৫৫ হাজার ৮৬ টাকা আয় করে। গ্রামের একটি পরিবারের মাসিক আয় গড়ে ১৮ হাজার ৩৪৯ টাকা।
তবে গত বৃহস্পতিবার মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণাকালে বিইআরসির চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম বলেন, ২০১০ সাল থেকেই সবার জন্য সমান বিদ্যুৎ-সুবিধা নিশ্চিতে সরকার কাজ করছে। তবে মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বেশি হওয়ায় কিছু এলাকায় এর দামও কিছুটা বেশি রাখা হতো। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় সেসব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে লোকসানও বেশি হয়। এ জন্য গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দামে সমতা আনা হয়েছে।
কৃষিকাজে ব্যবহৃত পাম্পের ক্ষেত্রে সব কোম্পানির জন্য ইউনিটপ্রতি দাম ৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া মাসিক ডিমান্ড চার্জ রাখা হয়েছে ১৫ টাকা। এর আগে কৃষিকাজে ব্যবহৃত সেচপাম্প ব্যবহারকারী গ্রাহকেরা ৩ টাকা ৮২ পয়সা পরিশোধ করত।
হাসপাতাল, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ইউনিটপ্রতি খরচ বাড়ছে ৫১ পয়সা। নির্মাণ খাতে ইউনিটপ্রতি ১২ টাকা এবং মাসিক চার্জ ৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষা, ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ৭৩ পয়সা করা হয়েছে। যা আগে ছিল ৫ টাকা ২২ পয়সা। রাস্তার বাতি, পানির পাম্প ও ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি দাম ৭ টাকা ৭০ পয়সা করা হয়েছে।

Disconnect