ফনেটিক ইউনিজয়
মাতৃমৃত্যুর হার বাড়ছে করণীয় কী!
এ আর সুমন

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মাতৃসেবার গ্রহণ বাড়লেও মাতৃমৃত্যুর হার বেড়েছে। বর্তমানে দেশে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ১৯৬ জন, যা ২০১০ সালে ছিল ১৯৪। এ ছাড়া সিজারিয়ান প্রসবের হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত হারের দ্বিগুণেরও বেশি। গত সপ্তাহে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু ও স্বাস্থ্যসেবা জরিপ-২০১৬’-এর প্রাথমিক ফলাফলে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অধিকাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র মানসম্মত মাতৃস্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে হলে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের বিকল্প নেই। তাই মাতৃমৃত্যু রোধে সরকারকে জনগণকে সম্পৃক্ত করে সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
সদ্য প্রকাশিত জরিপে বলা হয়েছে, ২০০১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশে মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস পেলেও ২০১০ সালের পর থেকে এই ক্ষেত্রে আশানুরূপ উন্নতি দেখা যায়নি। যার ফলাফলে এসেছে মাতৃমৃত্যু বাড়ার খবর। তবে এ সময়ের মধ্যে দক্ষ সেবাদানকারীর সহায়তায় এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের হার বেড়েছে। দক্ষ সেবাদানকারীর সহায়তায় ২০১৬ সালে ৫০ শতাংশ প্রসব সম্পাদন হয়েছে, যা ২০১০ সালে ছিল ২৭ শতাংশ। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের হার ২০১০ সালে ২৩ শতাংশ থাকলেও ২০১৬ সালে তা বেড়ে ৪৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে দক্ষ সেবাদানকারীর সহায়তায় বাড়িতে প্রসবের হার ৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
জরিপের তথ্যমতে, প্রধানত প্রাইভেট হাসপাতাল বা ক্লিনিকের কারণে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের হার বেড়েছে। ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে প্রাইভেট হাসপাতাল বা ক্লিনিকে প্রসবের হার ১১ থেকে বেড়ে ২৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আর সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের হার ১১ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশ হয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সম্পাদিত ১৪ শতাংশ প্রসবের মধ্যে ১৩ শতাংশ হয় উপজেলা বা উচ্চতর পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। এনজিও পরিচালিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের হার ২০১০ সালে ২ শতাংশ থাকলেও এখন তা বেড়ে ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
দেশে সিজারিয়ান প্রসবের হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বলেও জরিপের ফলাফলে জানানো হয়েছে। ২০১৬ সালে সিজারিয়ান প্রসবের হার ছিল ৩১ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ছিল ১২ শতাংশ। সিজারিয়ান প্রসবের ৮৩ শতাংশই হয় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোয়। এ ছাড়া সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৩৫ শতাংশ এবং এনজিওর হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোয় ৩৯ শতাংশ মা সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো দেশের মোট সিরাজিয়ান প্রসবের হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে রাখা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে এ হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত হারের দ্বিগুণ। জরিপে আরও জানানো হয়, রক্তক্ষরণ ও খিঁচুনির কারণে ৫৫ শতাংশ মা মারা যান। ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে এ দুটি কারণে মাতৃমৃত্যুর হার অপরিবর্তিত রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে সাম্প্রতিক দেশকাল-এর সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা হলো। একটি দৈনিক পত্রিকার স্বাস্থ্যপাতার সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মূলত বাল্যবিবাহ, অপরিণত বয়সে মা হওয়া, পুষ্টিহীনতা, গর্ভকালীন সেবার অভাবে গেল কয়েক বছর বেড়েছে মাতৃমৃত্যুর হার। কারওয়ান বাজার এলাকায় রিকশা চালান তিন সন্তানের জনক রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাচ্চা জন্মের সময় মা কেন মরে যাচ্ছে, তা তো জানি না, গ্রামে থাকতে অনেককে দেখছি মারা যেতে। আমার মনে হয় পুষ্টির অভাব আর দরিদ্রতার কারণে গর্ভবতী মায়েরা মারা যান।
মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক লতিফা শামসুদ্দিন জানান, সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মায়ের মৃত্যুর মতো অনাকাক্সিক্ষত বিষয়টি সত্যিই সবার জন্য দুঃখজনক। মৃত্যুহার যদি আগের মতোই থাকে, তাহলে তা মেনে নেওয়া যায় না। সমস্যাটির সমাধান হিসেবে তিনি আরও বলেন, সরকারের নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচিতে কোথায় কী সীমাবদ্ধতা আছে, তা চিহ্নিত করে এখনই দূর করার পদক্ষেপ নিতে হবে। জরিপ প্রকাশিত অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে অনেক এগিয়ে গেছে। আমরা শিশুমৃত্যুর হার কমিয়েছি, প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারির হার বেড়েছে। জরিপে উঠে আসা তথ্য থেকে আমরা সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করে সেসব সমাধানে পদক্ষেপ নিতে পারব।’
জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এনআইপিওআরটি, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও মার্কিন দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি ২০২২ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ১০৫ জনে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, সংস্থাটি বলছে প্রতিদিন সারা বিশ্বে ৮৩০ জন মা মারা যান গর্ভকালীন এবং জন্মদানের সময়। আর এ ক্ষেত্রে ৯৯ শতাংশ মাতৃমৃত্যু হচ্ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে। স্বাস্থ্যসেবা মান নিশ্চিত করাসহ মাতৃমৃত্যুর কারণ খুঁজে বের করা, মায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ডায়াবেটিসের মতো রোগ এবং নারী ও অল্প বয়সী মেয়েদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির কথাও বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

Disconnect