ফনেটিক ইউনিজয়
বিশ্ব এইডস দিবস
আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে এইচআইভি সংক্রমণ
হামিম উল কবির

আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে এইচআইভি সংক্রমণ। এখনই সচেতন হতে না পারলে ভয়ংকর এ রোগে আক্রান্তের হার বাড়তেই থাকবে। দেশে এমন অনেকে আছেন, যাঁরা জানেনও না যে তাঁরা ভয়ংকর এ রোগটিতে আক্রান্ত। তাঁরা নিজের অজান্তেই সংক্রামক এ রোগটি ছড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি ছড়াচ্ছে ০৭ শতাংশ হারে। দেশের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে হিলি পয়েন্টে যৌনকর্মীদের মধ্যে এটা বাড়ছে ২৭ শতাংশ হারে। রাজধানী ঢাকা শহরে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক নিয়ে থাকে, এমন মাদকসেবীদের মধ্যে এইচআইভি ছড়াচ্ছে ৬৪ শতাংশ হারে।
দেশে এইচআইভি/এইডস আক্রান্তের সংখ্যা কম বলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। শিশু থেকে বৃদ্ধ বিভিন্ন বয়সী প্রায় ১২ হাজার মানুষ রোগটিতে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষই রয়েছে প্রায় ১১ হাজার। ১৫ বছরের বেশি বয়সী নারী প্রায় ৪ হাজার। ১৫ বছরের বেশি বয়সী আক্রান্ত পুরুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৭ হাজার।
রোগটি যে কেবল অনিরাপদ যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়াচ্ছে, তা শতভাগ সত্য নয়। বিভিন্নভাবে রোগটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে, যারা গ্রুপে মাদক সেবন করে থাকে, তাদের মধ্যে সংক্রমণের হার অনেক বেশি। যারা একই সিরিঞ্জের মাধ্যমে রক্তনালিতে প্যাথেডিনের মতো মাদক নিয়ে থাকে, তাদের মধ্যে রোগটি আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে। দিন যত অতিবাহিত হচ্ছে, এইচআইভি ভীতিকর একটি রোগ হিসেবে শহর থেকে গ্রাম- সবখানেই ছড়িয়ে পড়ছে। তবে রোগটি নিয়ে চলছে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায় থেকে কঠোর গোপনীয়তা। আক্রান্তরা কেউ কখনোই প্রকাশ করে না যে তারা এইচআইভিতে আক্রান্ত। দেশের রক্ষণশলী সমাজের কারণেই এটি প্রকাশ করা হয় না। এখনো সাধারণভাবে ধারণা করা হয় যে অনিরাপদ যৌনতার কারণেই রোগটি হয়ে থাকে। ফলে আক্রান্তের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে অথবা আক্রান্ত অথবা তার পরিবার একঘরে হয়ে পড়তে পারে। অনেকেই রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে পড়তে পারে সংক্রমিতদের সঙ্গে চললে অথবা একসঙ্গে খেলে, এমন ধারণাও রয়েছে অনেকের মধ্যে।
১৯৮১ সালের জুন মাসে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে প্রথমবারের মতো পাঁচ সমকামীর মধ্যে এইডস ধরা পড়ে। তাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যায়। পরীক্ষায় জানা যায়, এটা জন্মগত কোনো সমস্যা নয়। ১৯৮৬ সালে রোগটির নাম দেওয়া হয় অ্যাকুয়ার্ড ইমিউন ডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোম বা এআইডিএস নাম দেওয়া হয়। রোগটিকে হিউম্যান ইমিউন ডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস বা এইচআইভি হিসেবে অভিহিত করা হয়। এইচআইভি আক্রান্তের পরপরই কোনো লক্ষ্মণ প্রকাশ পায় না। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতে পারেন না তিনি রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি ছোটাছুটি করতে থাকেন বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকের কাছে। সর্বশেষ যখন শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায় এবং কোনো রোগে আক্রান্ত হলে সেরে ওঠেন না, কেবল বাড়তেই থাকে উপসর্গ, ঠিক তখনই চিকিৎসকের সন্দেহ হয়ে থাকে যে তাঁর রোগী এইচআইভিতে আক্রান্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি ব্যাপক। বিদেশ-ফেরত শ্রমিকেরা রোগটি সংক্রমণের এক বড় উৎস। আইসিডিডিআরবির তথ্য অনুসারে ২৫৯ জন অভিবাসী শ্রমিকের মধ্যে ৪৭ জনের এইচআইভি রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে প্রতিবেশী ভারত। ভারতে অন্তত ৫০ লাখ মানুষ রোগটিতে আক্রান্ত। এখান থেকে প্রতিবছর পাচার হয়ে যাচ্ছেন অনেক শিশু ও নারী। তাঁদের বেশির ভাগেরই শেষ পর্যন্ত স্থান হয়ে থাকে ভারতের পতিতাপল্লিগুলোয়। নারীদের অনেকেই ফিরে আসেন এইচআইভি/এইডস সংক্রমিত হয়ে।
১৯৮৯ সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে প্রথম এইচআইভি সংক্রমিত রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর ১৯৯০ সালের মে মাসে চট্টগ্রামে এক ব্যক্তির এইচআইভি ধরা পড়ে। ১৯৯১ সালে এ দেশে প্রথম ৯ জনকে এইডস রোগী শনাক্ত করা হয়। ২০০৫ সালে এ সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৬৫৮-তে। ২০০৫ সাল পযন্ত এইডসে মারা যান ৭৪ জন। ইউএনএইডস, ইউনিসেফ, ইউএনএফপিএর মতো সংস্থাগুলো বলছে, বাংলাদেশে সরকারিভাবে যা বলা হয়, এইচআইভি কিংবা এইডস আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি। এ সংস্থাগুলো ২০০৫ সালেই বাংলাদেশে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৩ হাজার থেকে ২০ হাজার বলা হয়। ইউএনএইডসের হিসাবমতে, বিশ্বে ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত এবং সাড়ে ৩ কোটি মানুষ মারা গেছে রোগটিতে।
বিশ্বব্যাংকের একটি জরিপে দেখা যায়, এ দেশের রয়েছেন দূর পথে চলাচলকারী প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার বাস-ট্রাক-লঞ্চচালক ও তাদের সহকারি। সারা দেশে ছড়িয়ে আছেন ১৫ লাখ রিকশাচালক। বাংলাদেশের জাতীয় এইচআইভি/সেরোলজিক্যাল সার্ভিলেন্স থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে ৫২ শতাংশ বিবাহিত ট্রাকশ্রমিক ও ৭৫ শতাংশ বিবাহিত রিকশাশ্রমিক যৌনকর্মীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করে থাকেন। মাত্র ৩ শতাংশ রিকশাশ্রমিক ও ২১ শতাংশ ট্রাকশ্রমিক এইডস রোগ ছড়ানোর দুটি উপায় জানেন। ৮৬ শতাংশ রিকশাশ্রমিক ও ৩৩ শতাংশ ট্রাকশ্রমিকের এইডস সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই।

Disconnect