ফনেটিক ইউনিজয়
বি শে ষ সা ক্ষা ৎ কা র
‘গণতন্ত্র সংকটে পড়ার পাশাপাশি অল্পমাত্রার গৃহযুদ্ধের ক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে’

সাইফুল হক, দেশের বিশিষ্ট বামপন্থী নেতা এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক। সম্প্রতি তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন ও অন্যান্য বিষয়ে কথা বলেন সাম্প্রতিক দেশকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাছির জামাল

দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আছেন। বাংলাদেশে চলমান রাজনীতিকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গভীর সংকটকাল পার করছে। বিদ্যমান রাষ্ট্র, শাসকশ্রেণি তথা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অন্তর্গত দ্বন্দ্ব-সংঘাত, বিরোধ-বৈরিতা দেশে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আসলে বাংলাদেশের চলমান রাজনীতি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বিমুখী অবস্থানে পর্যবসিত হয়েছে। তাদের মধ্যে বিরোধ-বৈরিতা, রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাজি থাকলেও আদর্শগতভাবে বড় ধরনের কোনো পার্থক্য নেই। সাধারণভাবে বাংলাদেশে এখন শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে ক্ষমতার হাতবদলের প্রতিযোগিতা চলছে। যেকোনো মূল্যে এক দল ক্ষমতায় থাকতে চায়, আরেক দল ক্ষমতায় যেতে চায়। আগামী সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একধরনের উন্মত্ত প্রতিযোগিতা লক্ষ করছি। এই প্রতিযোগিতা আমাদের গণতান্ত্রিক ধারাকেই কেবল ব্যাহত করবে।

অনেকে বলছেন, দেশে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন করার চেষ্টা চলছে।
দেশে ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন করা সম্ভব নয়। জনগণ আরেকটি ৫ জানুয়ারি গ্রহণ করবে না। সরকার ওই রকমভাবে সমগ্র রাষ্ট্রশক্তিকে ব্যবহার করে নির্বাচন করতে চাইলে গণবিরোধী দলে পরিণত হবে। আর এবার ক্ষমতায় যেতে না পারলে বিএনপি অস্তিত্বের সংকটে পড়বে।

তাহলে বাংলাদেশের জন্য তো আগামী একাদশ নির্বাচনটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ...
আগামী নির্বাচন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব না হয় এবং জনগণ যদি একটি ভীতিহীন পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারে, তাহলে এই রাষ্ট্র একটি অভূতপূর্ব সংকটে পড়বে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র সংকটে পড়ার পাশাপাশি এতে একটি ‘লো ইনটেনসিটি’ বা অল্পমাত্রার গৃহযুদ্ধের ক্ষেত্রও কিন্তু তৈরি হচ্ছে। তাতে কেবল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, সবার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।

এ থেকে উত্তরণ কীভাবে সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
এ ব্যাপারে আমরা নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) প্রস্তাব দিয়েছি। গত ৩০ আগস্ট আমাদের সঙ্গে ইসির যে সংলাপ হয়েছে, তাতে ২৩ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। আমরা সেখানে বলেছি যে নির্বাচনকালীন একটি ‘তদারকি সরকার’ গঠন করা দরকার। ইসি নিজেই তদারকি সরকার হিসেবে কাজ করতে পারে। আর প্রধান নির্বাচন  কমিশনারের (সিইসি) কাছে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে। শুধু জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো ছাড়া বাকিগুলো ইসির প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। অনেক বিতর্ক এড়িয়ে তারা এ ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা কীভাবে সিইসির কাছে ন্যস্ত হবে, এ জন্য কী প্রধানমন্ত্রীকে ছুটিতে পাঠানো হবে, না তিনি পদত্যাগ করবেন কিংবা অন্যকিছু করবেন, তার জন্য আলোচনা করে সমাধান খুঁজে বের করা যেতে পারে।

বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী তো তা সম্ভব নয়...
আসলে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা হয়ে গেলে সংবিধান বাধা নয়। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সাংবিধানিক বাধাগুলো দূর করা সম্ভব। অতীতে এর বহু নজির রয়েছে। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতেই সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি দেশের উপরাষ্ট্রপতি হয়ে রাষ্ট্রপতি হতে পেরেছিলেন।

বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের সময় সংসদ বহাল থাকার বিধান রয়েছে...
আসলে বর্তমান সংসদের সাংবিধানিক বৈধতা রয়েছে বলা হলেও এর কোনো রাজনৈতিক বা নৈতিক বৈধতা নেই। নির্বাচনী তফসিল ঘোষিত হলে সংসদ ভেঙে দেওয়া দরকার। সংসদ ভেঙে না দিলে যাঁরা এমপি আছেন, তাঁরা সরকারের সব সুযোগ-সুবিধা নিয়েই নির্বাচনী প্রচারণায় নামবেন। আর যাঁরা এমপি নন, তাঁরা প্রচারণায় পিছিয়ে যাবেন। তাই নির্বাচনে ‘সকলের জন্য সমান সুযোগ’ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) থাকবে না। এ জন্য সংসদ ভেঙে দেওয়া দরকার। নির্বাচনে ইসি দৃঢ় ভূমিকা পালন করবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী ‘স্ট্যান্ডিং ফোর্স’ হিসেবে থাকবে। প্রয়োজনে তাদের সীমিত আকারে মেজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে।
 
ব্রিটিশ আমল থেকে এ দেশে বামপন্থীরা সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনেই ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এখন বামদের ভূমিকা নিয়েই অনেকে প্রশ্ন তুলছেন?
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানের ২৩ বছরের স্বাধীনতার আন্দোলনে বিপ্লবী বামপন্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন-শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বামপন্থীরা আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যেও অনেক বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে বামপন্থীদের নানা মাত্রায় বিভ্রান্তি দূর হয়নি। আওয়ামী লীগকে জাতীয় বুর্জোয়া, দেশীয় বুর্জোয়া, উদারনৈতিক দল ইত্যাদি বলে অনেক বামপন্থী আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ঢুকে পড়েছে। বিএনপি ও জাতীয় পার্টিতেও বামরা রয়েছে। এটা তাদের চরম আদর্শগত অধঃপতন। আসলে বামপন্থীদের মধ্যে ভাঙন তৈরি হয়েছে। এতে তাদের মধ্যে হতাশাও তৈরি হয়েছে। হতাশা থেকেই তাদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টিতে বিলীন হয়েছে। এটা বাম আন্দোলনকে দুর্বল করেছে। আসলে যখনই বামদের মধ্যে কোনো সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তখনই বুর্জোয়া দলগুলো আমাদের শিবিরে ভাঙন ধরাতে পেরেছে।

আর কোনো সমস্যা কি নেই?
সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয় হলে এখানকার বামপন্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও বড় ধরনের অনৈক্য তৈরি হয়। নেতিবাচক প্রভাবও দেখা দেয়। বাংলাদেশের সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও ঐতিহ্য, মাটি, মানুষ, সামাজিক সমন্বয় এবং এমনকি ধর্মকে উপযুক্তভাবে ধরতে না পারা, বুঝতে না পারাই এখানকার জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তা ছাড়া অন্যের অনুকরণে বিপ্লব হয় না। প্রতিটি দেশের বিপ্লবী আন্দোলন তাদের নিজস্ব অনন্য বৈশিষ্ট্য নিয়েই গড়ে উঠেছে। মস্কোতে বা চীনে বৃষ্টি হলে ঢাকায় আমরা ছাতা ধরেছি। কেতাবি বিপ্লবী তত্ত্বের বাইরে বাংলাদেশের মতো করে বিপ্লবী তত্ত্ব তৈরি ছিল না, ঘাটতি ছিল বলেই লক্ষ করেছি।

তাহলে কি কোনো আশা দেখছেন না?
সামগ্রিকভাবে রাজনীতির যে দুবৃত্তায়ন, তাদের যে সীমাহীন দৌরাত্ম্যÑএর মধ্যে আদর্শনিষ্ঠ দলের বেরিয়ে আসা কঠিন। তবে আমরা আশাহত নই। অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষ উদ্যাপন করতে গিয়ে দেখেছি, মানুষের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা। এ থেকে বোঝা যায়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরেও পরিবর্তন সম্ভব। বাম হঠকারিতা, আপসকামিতার রাজনীতি আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এ থেকে আমরা শিক্ষা নিয়েছি। গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, সিপিবি-বাসদের বাম ঐক্যের ৫ দফা দাবির ভিত্তিতে আন্দোলনের জোট গড়ে তুলেছি। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে রাজপথের কর্মসূচিভিত্তিক কৌশলগত ঐক্য গড়ে তোলা অব্যাহত রেখেছি। এটা ধরে রাখতে পারলে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে একটা কার্যকর ধারা গড়ে উঠবে।
২০২১ সালে ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক শ বছর পূর্তি হবে। এই সুবর্ণজয়ন্তী সামনে রেখে স্বপ্ন দেখতে চাই, এখানে বামপন্থীরা আরও ঐক্যবদ্ধ হবে। বিপ্লবী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উত্থান ঘটবে। গুণগত উল্লম্ফন ঘটবে আমাদের বিশ্বাস। এ লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।

এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসা যাক। রোহিঙ্গা সংকটে আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি কী?
রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘমেয়াদি। এর আশু কোনো সমাধান দেখছি না। সরকার এ সমস্যার সমাধানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। নিতে পারছে না। সরকারের দুর্বল পররাষ্ট্রনীতি, দুর্বল দৃষ্টিভঙ্গি ও দুর্বল অবস্থান মিয়ানমার কাজে লাগিয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সামাজিক, মানবিক ও সংস্কৃতিবিষয়ক ফোরাম থার্ড কমিটিতে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে যে সম্প্রতি ভোটাভুটি হয়, তাতে চীন ও রাশিয়া বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। আর আমাদের বড় মিত্র ভারত, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা ভোটদানে বিরত ছিল। অথচ বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় দেশ, যেখান থেকে ভারত রেমিট্যান্স পায়। ভারতকে বাংলাদেশ উজাড় করে দিয়েছে সবকিছ–। তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে এসে যা বলে গেছেন, তা গলাবাজি ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা নিকটতম প্রতিবেশীদের সমর্থন পাইনি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী চীন, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশ সফর করা তো দূরের কথা কোনো কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়নি, যেটা ১৯৭১ সালে ইন্দিরা গান্ধী আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় করেছিলেন। মিয়ানমারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠিয়ে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে না। জাতিসংঘের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর অবরোধ আরোপ করা গেলে এ সংকটের সমাধান হতে পারে।

Disconnect