ফনেটিক ইউনিজয়
ঝুলে আছে রাইড শেয়ারিং নীতিমালা
‘ফ্রি’ ব্যবসা করছে উবার, পাঠাও
আনছার আহমেদ

খসড়া প্রণয়নের ছয় মাসেও চূড়ান্ত হয়নি অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবাকে বৈধতা দিতে ‘রাইড শেয়ারিং নীতিমালায়-২০১৭’। নীতিমালা কার্যকর না হওয়ায় আইনি বৈধতা পায়নি ‘উবার’, ‘পাঠও’র মতো অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবা। বৈধতা না পেলেও রাজধানীতে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে এ ধরনের পরিবহনসেবা। প্রতিদিন ভাড়া বাবদ কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হচ্ছে এসব পরিবহনে। কিন্তু নীতিমালা না হওয়ায় সরকার কিছুই পাচ্ছে না। কোনো ধরনের শুল্ক না দিয়ে ভাড়ার ২০ শতাংশের পুরোটাই পাচ্ছে অ্যাপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
উবারের হিসাবেই ঢাকায় প্রতিদিন ১০ হাজার রাইড রিকোয়েস্ট আসে। যার মধ্যে ৪ হাজার তারা গ্রহণ করতে পারে। প্রতিটা রাইড গড়ে ২৫০ টাকা হলে শুধু উবারে ভাড়া লেনদেন হয় ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২ লাখ টাকা পায় উবার। গত রোববার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে উবার কর্তৃপক্ষ জানায় প্রতি মাসে ৯ হাজার চালক যুক্ত হচ্ছেন তাদের অ্যাপে।
এর বাইরে রয়েছে ‘উবারমটো’, ‘পাঠাও’ ‘স্যাম’, ‘ইজিগো’ ‘লেটসগো’ ‘গোসিএনজি’ ‘হ্যালো’সহ আরও অন্তত ১৫টি অ্যাপ। যাত্রী কল্যাণ সমিতি নামের একটি সংগঠনের হিসাবে এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে দৈনিক ভাড়ার লেনদেন ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। সংখ্যাটি দিন দিন বাড়ছে। অ্যাপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ভাড়ার ২০ শতাংশ অর্থাৎ দিনে ২৪ লাখ টাকা আয় করে। কিন্তু নীতিমালা না হওয়ায় সরকার এক টাকাও পাচ্ছে না দেনদেন করা ভাড়া থেকে।
‘ফ্রি’ ব্যবসা করার বিষয়ে জানতে চাইলে উবারের মুখপাত্র জুলকার নাইন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। রোববার সংবাদ সম্মেলনেও প্রশ্নের জবাব দেননি উবারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
২০১৫ সালের অক্টোবরে ঢাকায় আসে ‘স্যাম’। এ অ্যাপের মাধ্যমে মোটরসাইকেল ভাড়া করা যায়। গত বছরের ২২ নভেম্বর ঢাকায় সেবা চালু করে বহুজাতিক কোম্পানি ‘উবার’। গণপরিবহন-সংকটে নাকাল ঢাকায় প্রথম দিন থেকেই জনপ্রিয়তা পায় উবার। সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক-মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা ও উচ্চ ভাড়ায় অতিষ্ঠ যাত্রীরা উবারে আকৃষ্ট হয়। সহজেই গাড়ি পাওয়ার নিশ্চয়তা ও প্রাইভেট কারে আরামদায়ক যাত্রার সুবিধায় জনপ্রিয়তা লাভ করে অ্যাপের মাধ্যমে পরিবহনসেবা। চলতি বছরের শুরুতে মোটরসাইকেল ভাড়ার অ্যাপ ‘পাঠাও’ বাজারে আসার পর ঢাকার পরিবহনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। অটোরিকশার অর্ধেক ভাড়ায় যানজট এড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছার নিশ্চয়তা পাওয়ায় যাত্রীরা এখন মোটরসাইকেলে ঝুঁকেছেন। উবারও চালু করেছে মোটরসাইকেল ভাড়ার অ্যাপ ‘উবারমটো’।
দিন দিন যাত্রী বাড়লেও এখনো বৈধতা পায়নি অ্যাপভিত্তিক এ পরিবহনসেবা। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, এখনো ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নিবন্ধিত প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ। গত বছরের নভেম্বরে উবার চালুর পর, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানিয়ে দেয়, ব্যক্তিগত গাড়িতে যাত্রী পরিবহন করা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অ্যাপভিত্তিক পরিবহনের যাত্রীদের সমালোচনার মুখে এ অবস্থান থেকে পিছু হটে বিআরটিএ। যাত্রীদের অভিযোগ, সরকার কখনো অটোরিকশা ও বাসে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। যাত্রীসেবাও নিশ্চিত করতে পারেনি। তাই তাঁরা অ্যাপভিত্তিক সেবার বৈধতা চান। বিআরটিএর ওয়েবসাইটে এসব মতামত আসে।
এর পরপরই সরকার ঘোষণা দেয়, বৈধতা দেওয়া হবে ‘উবার’, ‘পাঠাও’র মতো গাড়ি ভাড়ার অ্যাপকে। নীতিমালা প্রণয়নে বিআরটিএর পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) নাজমুল আহসান মজুমদারকে প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়। গত ৬ জুন কমিটি খসড়া নীতিমালা সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।
এরপর গত ছয় মাসে আর কোনো অগ্রগতি নেই। এদিকে উবার, পাঠাওয়ের কারণে যাত্রী হারিয়ে আয় কমেছে এত দিন যথেচ্ছ ভাড়া আদায় করা পরিবহন মালিক-চালকদের। তাঁরা চাপ দিচ্ছেন অ্যাপভিত্তিক সেবা বন্ধ করতে। আন্দোলনে নেমেছে চালক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ নামের একটি সংগঠন।
তাদের চাপের কারণে ‘রাইড শেয়ারিং নীতিমালা’ ঝুলে আছে, এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান। তিনি বলেন, বিআরটিএ দ্রুততার সঙ্গে নীতিমালার খসড়া প্রণয়ন করেছে। এখন বাকি প্রক্রিয়া মন্ত্রণালয়ের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, ‘খসড়া প্রণয়নের পর সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মতামত চাওয়া হয়েছিল। ১৭টি সংস্থার মতামত পাওয়া গেছে। সেগুলো এখন সমন্বয় করা হচ্ছে। মতামত সমন্বয় করে নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে। তারপর তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে।’ তবে কবে নাগাদ এ প্রক্রিয়া শেষ হবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি সচিব।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ঢাকার যান সংকট কাজে লাগিয়ে পাশের দেশগুলোর তুলনায় বেশি ভাড়া নিচ্ছে অ্যাপগুলো। আবার নীতিমালা না থাকায় অ্যাপ পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোকে এক টাকাও ট্যাক্স দিতে হয় না। পৃথিবীর কোনো দেশে এভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান ‘ফ্রি’ ব্যবসা করতে পারে না।
খসড়া নীতিমালায় এক লাখ টাকা ফি দিয়ে অ্যাপের মাধ্যমে গাড়ি পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে। লাইসেন্স নবায়নে বছরে দিতে হবে ১০ হাজার টাকা। অনুমোদন পেতে কমপক্ষে ২০০ গাড়ির নিবন্ধন থাকতে হবে আগ্রহী কোম্পানির নিয়ন্ত্রিত অ্যাপে। প্রতি গাড়িতে বছরে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং মোটরসাইকেলে ৮০০ টাকা নিবন্ধন ফি দিতে হবে। এ শর্তের বিরোধিতা করছে দেশীয় অ্যাপগুলো। তাদের দাবি, এতে উবারের মতো বিদেশি কোম্পানিগুলো লাভবান হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাঁরা উবার, পাঠাওয়ের মতো অ্যাপে যাত্রী পরিবহন করেন, তাঁরা পেশাদার চালক নন। তাঁরা নিবন্ধন করতে চাইবেন না। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত ভাড়ার একটি অংশ ট্যাক্স হিসেবে নেওয়া। কোম্পানিগুলো ২০ শতাংশ পরিচালনা ফি নিচ্ছে। সরকার সেখান থেকে একটি অংশ নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রেও এ পদ্ধতি রয়েছে।

Disconnect