ফনেটিক ইউনিজয়
পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২০ বছর
আজও সম্পন্ন হয়নি ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীদের পুনর্বাসন
সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি

খাগড়াছড়ির দীঘিনালার জামতলী এলাকায় সর্বশেষ ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাসিন্দা বিমলেন্দু চাকমা। ১১ সদস্যের পরিবার নিয়ে তিনি বসবাস করেন এ পুনর্বাসন কেন্দ্রে। ১৯৮৬ সালে পার্বত্য এলাকার তৎকালীন বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে দীঘিনালা ছেড়ে শরণার্থী হিসেবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে ঠাকুমবাড়ি এলাকায় আশ্রয় নেন তাঁরা। কিন্তু তাঁদের পুনর্বাসন এখনো সম্পন্ন হয়নি। শুধু এক বিমেলেন্দু চাকমার পরিবার নয়, পাহাড়ের হাজারো পরিবার আজও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি পূরণের আশায় আছে।
১৯৯৭ সালের ৯ মার্চ শরণার্থীদের বাংলাদেশে প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত বাংলাদেশ সরকার ও ত্রিপুরা রাজ্যে বসবাসকারী পার্বত্য জেলা জুম্ম কল্যাণ সমিতির শরণার্থী নেতাদের সঙ্গে ২০ দফা যৌথ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তিচুক্তিতেও অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০ দফা চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ শুরু এবং যথাযথ যাচাইয়ের মাধ্যমে জায়গা-জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করে স্থানীয় জনগণের মালিকানা চূড়ান্ত করে ভূমি রেকর্ডভুক্ত করা এবং ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার কথা। এ ছাড়া পরিবারপ্রতি দুই একর জমি অথবা টিল জমির (গ্রেভল্যান্ড) ব্যবস্থা করা।    
২০ দফা যৌথ ঘোষণা অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালে ভারতের ফেনী সীমান্ত দিয়ে বিমলেন্দুর মতো ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থানরত ১২ হাজার ২২২ পরিবারের ৬৪ হাজার ৬১২ জন সরকারিভাবে বাংলাদেশে ফিরে আসে। বাংলাদেশে আসার পর সরকারি উদ্যোগে বিমলেন্দুর আশ্রয় হয় দীঘিনালার কাঁঠালতলী আবাসিক বিদ্যালয়ে। তার প্রায় এক দশক পর স্থায়ী আবাস হয় শরণার্থীবিষয়ক টাস্কফোর্সের উদ্যোগে নির্মিত পুনর্বাসন কেন্দ্রে। দেশে ফিরে আসার ১৯ বছর পরও নিজের জায়গা-জমি ফিরে পাননি তাঁরা। এভাবেই মানবেতর দিন কাটছে বিমলেন্দুর মতো প্রায় লক্ষাধিক ভারত প্রত্যাগত ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু শরণার্থীদের। পার্বত্য শান্তি চুক্তির বিশ বছর পেরিয়ে গেলেও শরণার্থী পুনর্বাসনে ২০ দফা প্যাকেজ আজও বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দারা।
ফিরে আসা পাহাড়িদের দুই একর করে জায়গা দেওয়ার কথা থাকলেও তা পাননি তাঁরা। পুনর্বাসিত অনেক পরিবার বসতবাড়িসহ মাত্র ৫ শতক জায়গা পেয়েছে। তৎকালীন ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ৬০ বছর বয়সী লক্ষ্মী রাম চাকমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকার যে চুক্তি করেছে, তা নিজেই মানেনি। শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দারা দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে। নিজের বাস্তুভিটা হারিয়ে তারা এখন মাত্র ৫ শতক জায়গায় বসবাস করছে। দেশে ফিরে আসার পর আমাদের জায়গা-জমি ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। এত বছর পরও নিজের ভূমিতে ফিরতে পারিনি।’ পুনর্বাসন কেন্দ্রের কমল বিকাশ চাকমা, স্মৃতি দেবী চাকমা, গুলছবি চাকমাও জানান, তাঁরা নিজেদের জায়গায় ফিরতে পারেননি।
২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ভারত প্রত্যাগত ১৮টি পরিবারকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে সরকারি উদ্যোগ বসতবাড়ি নির্মাণ করে দেওয়া হয়। যেখানে পরিবারপ্রতি ভূমির পরিমাণ মাত্র ৫ শতক। সরকারিভাবে ভারত প্রত্যাগতদের পুনর্বাসনে তিন কিস্তিতে ৩৮ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে প্রতি মাসে ২০ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। এর বেশি আর কিছুই পায়নি ওই বাস্তুচ্যুত মানুষগুলো।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম শরণার্থী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বকুল বলেন, ‘১৯৭৯ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত অশান্ত পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল। পাহাড়িরা জীবন বাঁচাতে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের ত্রিপুরায় আশ্রয় নেয়। তবে ১৯৯৭ সালের ৯ মার্চ ভারতের ত্রিপুরায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে শরণার্থীদের ২০ দফা চুক্তি হয়, পরবর্তী সময়ে একই বছরের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি হয়। শর্ত অনুযায়ী ভারত-ফেরত শরণার্থীদের জানমালের নিরাপত্তা প্রদান, জমিজমা ফেরত দেওয়া, ঋণ মওকুফ করা, সরকারি চাকরি দেওয়াসহ ২০ দফা  চুক্তি হলেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাস্তবায়নে এখনো তেমন অগ্রগতি হয়নি। চুক্তির পর দুই দশক পেরিয়ে গেলেও ভূমি কমিশন কার্যকর না হওয়ায় পাহাড়ের প্রধান বিরোধ ভূমি সমস্যা কাটছে না।’
তবে ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীবিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরার দাবি, ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের মতো শরণার্থীবিষয়ক টাস্কফোর্সের কার্যক্রমও একটি চলমান প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ সরকার ও ত্রিপুরা রাজ্যে বসবাসকারী পার্বত্য জেলা জুম্ম কল্যাণ সমিতির শরণার্থী নেতাদের সঙ্গে যে ২০ দফা চুক্তি হয়েছে, সেই আলোকে কাজ চলছে। চুক্তিতে উল্লিখিত মূল কাজগুলো হয়ে গেছে। অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের তালিকার কাজ এগিয়ে চলেছে।’ এই সরকারের আমলে চুক্তির যাবতীয় বিষয় সম্পন্ন হয়ে যাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

Disconnect