ফনেটিক ইউনিজয়
পোপ ফ্রান্সিসের বাংলাদেশ সফর : ‘রোহিঙ্গা’ নিয়ে বিতর্ক
এম ডি হোসাইন

রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যখন মিয়ানমারের হামলা-হত্যা-নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে, তখনই বাংলাদেশ-মিয়ানমান সফর করলেন ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস। তবে মিয়ানমার সফরে তিনি একবারও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ না করা এবং বাংলাদেশ সফরে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করা নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে শরণার্থীদের অধিকারের প্রশ্নে এবং তাদের দুর্দশা লাঘবে সরব হওয়া পোপ ফ্রান্সিস মিয়ানমার সফরে রোহিঙ্গাদের বিষয়েও তাঁর দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরবেন বলে অধিকার সংগঠনগুলোর প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু মিয়ানমার সফরে একবারও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ না করায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো উচ্চকণ্ঠ হয়েছিল পোপ ফ্রান্সিসের বিরুদ্ধে। এদিকে বাংলাদেশ সফরকালে পোপ ফ্রান্সিস ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করায় মিয়ানমারে সামাজিক  যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার জন্ম হয়।
অং সো লিন নামের এক ব্যক্তি ফেসবুকে মন্তব্য করেছেন, ‘তিনি হচ্ছেন একটা গিরগিটির মতো, আবহাওয়ার কারণে যার গায়ের রং বদলে গেছে।’ সোয়ে সোয়ে নামের আরেকজন ফেসবুক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, ‘তার একজন সেলসম্যান বা দালাল হওয়া উচিত। একজন ধর্মীয় নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন।’ ইয়ে লং মিন পোস্ট করেছেন, ‘পোপ একজন পবিত্র মানুষ। কিন্তু তিনি মিয়ানমারে এক কথা বললেন, আবার অন্য একটি দেশে গিয়ে অন্য কথা বললেন। তিনি যদি সত্যকে ভালোবাসেন, তাহলে তাঁর সবখানে একই কথা বলা উচিত ছিল।’
অন্যদিকে মিয়ানমারের একটি রাজনৈতিক দলের নেতা মং থোয়ে চুন পোপের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, মানবাধিকার গ্রুপের চাপ সত্ত্বেও মিয়ানমারে তিনি ‘রোহিঙ্গা’ বলেননি। তার অর্থ তিনি মিয়ানমারের লোকজনকে ভালোবাসেন। এই শব্দটি তিনি বাংলাদেশে বহুবার উচ্চারণ করেননি। মাত্র একবারই এটা বলেছেন। আমার মনে হয়, মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে সন্তুষ্ট করার জন্য তিনি এ কাজ করেছেন।
জানা যায়, বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারের রোমান ক্যাথলিক চার্চ সফরের আগেই পোপকে অনুরোধ জানিয়েছিল, তিনি যেন তাঁর বক্তৃতায় ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার না করেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, পোপের মুখ থেকে ওই শব্দটি এলে মিয়ানমারের খ্রিস্টান ও অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর নতুন করে সহিংসতা শুরু হতে পারে। পোপ ফ্রান্সিস যখন মিয়ানমারে ভাষণ দেন, তখন তিনি তাতে ঐক্য, ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে সম্মান জানানোর কথা বললেও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি একবারের জন্যও উচ্চারণ করেননি।
তিন দিনের ঢাকা সফর শেষে গত শনিবার রোমের পথে বাংলাদেশ ছাড়ার পর বিমানে তিনি সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের কাছে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ না করার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘মিয়ানমার সফরে রোহিঙ্গা শব্দটি এড়িয়ে গেলেও আলোচনার পথ বন্ধ করে না দিয়ে দেশটির সরকার ও সামরিক বাহিনীর কাছে আসল বার্তাটি ঠিকই পৌঁছে দিয়েছি।’ মিয়ানমারের সেনা নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারের প্রতি সম্মান জানানোর বিষয়টি দৃঢ়তার সঙ্গেই তুলে ধরেছেন বলে উল্লেখ করেন রোমান ক্যাথলিকদের এই সর্বোচ্চ ধর্মগুরু। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকায় রোহিঙ্গাদের তিনটি পরিবারের কাছ থেকে তাদের দুর্দশার কথা শুনতে শুনতে চোখ ভিজে আসার কথাও তিনি সাংবাদিকদের বলেন। ওই অনুষ্ঠানেই পোপ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সফরে প্রথমবারের মতো ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, ঈশ্বরের উপস্থিতি রোহিঙ্গাদের মধ্যেও বিরাজ করছে।
রোমে ফেরার পথে পোপ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হলো বার্তাটি ঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া, একবারে একটি বিষয়ে কথা বলা এবং অন্যপক্ষের জবাব শোনা। আমি যদি বক্তৃতায় ওই শব্দটি (রোহিঙ্গা) ব্যবহার করতাম, তারা হয়তো আলোচনার পথ আমার মুখের ওপরই বন্ধ করে দিত। প্রকাশ্যে বক্তৃতায় আমি পরিস্থিতিটা তুলে ধরেছি, অধিকারের বিষয়গুলো সামনে এনেছি। বলেছি, নাগরিকত্বের অধিকার থেকে কাউকেই বঞ্চিত করা উচিত নয়। এটা করতে হয়েছে, যাতে একান্ত বৈঠকে আমি আরও কিছু বলতে পারি।’
গত ২৮ নভেম্বর ইয়াঙ্গুনে পৌঁছানোর পরপরই মিয়ানমারের সেনাপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় পোপ ফ্রান্সিসের। ওই বৈঠক গত বৃহস্পতিবার হওয়ার কথা থাকলেও সেনাবাহিনী শেষ মুহূর্তে বৈঠকের সময় এগিয়ে আনে। ফলে পোপ বেসামরিক নেতাদের সঙ্গে বসার আগেই তাঁকে সেনাবাহিনীর মনোভাব জানিয়ে দেওয়ার সুযোগ হয় তাঁদের। ওই বৈঠকের বিষয়ে পোপ সাংবাদিকদের বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর ‘ভালো’ আলোচনা হয়েছে এবং সত্য প্রকাশে সমঝোতার কোনো সুযোগ নেই।
রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিপীড়ন বন্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে ব্যর্থ হওয়ায় সু চির সমালোচনা করে আসছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। পোপ অবশ্য বিষয়টিকে সেভাবে দেখছেন না। মিয়ানমারের নেতা অং সান সু চির সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক প্রসঙ্গে পোপ ফ্রান্সিস বলেন, রূপান্তরের মধ্য দিয়ে মিয়ানমার রাজনৈতিকভাবে বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে। সুতরাং সেই চোখ দিয়েই বিষয়গুলো দেখতে হবে। রাষ্ট্রগঠনের কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য মিয়ানমারকে ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখেই এগোতে হবে।
তিন দিনের সফরে গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দর থেকে তিনি সরাসরি সাভারে যান। বিকালে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনের পর বঙ্গভবনে যান পোপ। সেখানে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে একান্ত বৈঠকের পর দরবার হলে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ও কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে তিনি বক্তব্য দেন।
সফরের দ্বিতীয় দিন সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হাজারো ভক্তের প্রার্থনাসভায় পৌরহিত্য করেন পোপ। বিকালে বারিধারায় ভ্যাটিকান দূতাবাসে তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর পোপ বিশপদের সঙ্গে বৈঠক করতে রমনার সেইন্ট মেরিস ক্যাথিড্রালে যান। আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি সভায় যোগ দেন এবং বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গার কাছ থেকে তাদের করুণ অভিজ্ঞতা শোনেন তিনি। এ ছাড়া রাজধানীর তেজগাঁও রেলওয়ে জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসায় যান তিনি। সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সফরের শেষ দিন শনিবার সকালে তেজগাঁওয়ে মাদার টেরিজা হাউস পরিদর্শন করেন পোপ। এরপর তেজগাঁও হলি রোজারিও চার্চে খ্রিস্টান যাজক, ধর্মগুরু ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে চার্চের কবরস্থান পরিদর্শন করেন। দুপুরে ঢাকায় নটর ডেম কলেজে তরুণদের সঙ্গে মতবিনিময়ও করেন। বিকাল ৫টায় শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে রোমের উদ্দেশে ফিরে যান এই ক্যাথলিক ধর্মগুরু। তাঁকে বিদায় জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ ভ্যাটিকানের ২৬৬তম পোপ নির্বাচিত হন ফ্রান্সিস। রোমের বিশপ হিসেবে তিনি বিশ্বব্যাপী ক্যাথলিক চার্চ ও সার্বভৌম ভ্যাটিকান সিটির প্রধান। ১৯৩৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসে এক গরিব পরিবারে তাঁর জন্ম। ইতালীয় বাবা বুয়েনস এইরেসে রেলশ্রমিকের কাজ করতেন, মা ছিলেন গৃহিণী।

Disconnect