ফনেটিক ইউনিজয়
বিতর্কিত ৫৭ ধারার মোড়কেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন
বাছির জামাল

বিলুপ্ত হতে চলেছে বিতর্কিত ৫৭ ধারা। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সমালোচনার মুখে তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের এই ধারাটি বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অপরাধের দমন, প্রতিরোধ ও বিচারের জন্য ২০০৬ সালের আইসিটি আইন ২০১৩ সালে সংশোধন করে ৫৭ ধারা যুক্ত করা হয়। সম্প্রতি সার্বিকভাবে ডিজিটাল অপরাধগুলোর প্রতিকার, প্রতিরোধ, দমন ও বিচারের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়। এই আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইসিটি আইনটির ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৬৬ ধারা বিলুপ্ত হবে বলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে। কিন্তু নতুন আইনের অনেক ধারায় আইসিটি আইনের ৫৭ ধারারই প্রতিফলন দেখা গেছে।
আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন অথবা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়, তাহলে এ কাজ অপরাধ বলে গণ্য হবে। এই অপরাধে সর্বোচ্চ ১৪ বছর ও সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদ- এবং সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড দেওয়ার বিধান আছে।
অপরাধের এই সংজ্ঞা, আইনের অজামিনযোগ্য ধারা ও শাস্তির বিষয়গুলো আইনটিকে বিতর্কিত করে তোলে। এর অপব্যবহার এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা নেওয়ার আগে পুলিশ সদর দপ্তরের অনুমতি নিতে দেশের থানাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া আসামি সাংবাদিক হলে এ ধরনের মামলার বিষয়ে দলের সঙ্গে পরামর্শ করতে সরকারি দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ায় অপরাধের ধরনগুলো বিভিন্ন ধারায় অন্তর্ভুক্ত করে শাস্তির মাত্রা কমানো হয়েছে। খসড়ার ২৭ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করার ইচ্ছায় ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর আঘাত করে, তাহলে ওই ব্যক্তির সেই কাজ হবে অপরাধ। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড ভোগ করতে হবে। একই অপরাধ দ্বিতীয় বা তার বেশিবার করলে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে। এই ধারার অপরাধ আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য হবে।
আইনের খসড়ার ২৮ ধারায়ও বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে মানহানি-সংক্রান্ত দণ্ডবিধির (১৮৬০) সেকশন ৪৯৯-এ বর্ণিত অপরাধ সংঘটন করেন, তাহলে তাঁকে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড ভোগ করতে হবে। এই ধারার অপরাধ অ-আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আদালতের সম্মতি সাপেক্ষে আপসযোগ্য হবে।
৩০ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে, অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় বা ঘটানোর উপক্রম হয়, তাহলে ওই ব্যক্তির সেই কাজ হবে একটি অপরাধ। এ জন্য তিনি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর একই অপরাধ দ্বিতীয় বা তার বেশিবার করলে শাস্তি আরও বেশি হবে। এই ধারার অপরাধ আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, যে আইন অনুভূতিতে আঘাত দেওয়াকে অপরাধ বলে, অবশ্যই সেই আইনের সব সময় অপব্যবহার হবে। কোন কথা কার অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে, তা ব্যক্তিনির্ভর এবং তা সব সময় অপপ্রয়োগ হতে বাধ্য। এই ধরনের অপরাধে শাস্তির বিধান যদি রাখতেই হয়, তাহলে থানায় না গিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করার বিধান রাখতে হবে। প্রাথমিকভাবে ম্যাজিস্ট্রেট সন্তুষ্ট হলে অভিযোগটি থানায় পাঠাবেন তদন্তের জন্য।
বেসরকারি সংস্থা আর্টিকেল ১৯-এর বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক তাহমিনা রহমান বলেন, বাক্স্বাধীনতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি অধিকার। সেই অধিকারকে ক্রিমিনালাইজড (শাস্তিযোগ্য অপরাধ) করা উচিত নয়। কিন্তু ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের খসড়ায় দেখতে পাচ্ছি এখনো ৫৭ ধারার মতো ক্রিমিনালাইজড করা হচ্ছে। আবার ডেফিনেশনগুলো এখনো সুস্পষ্ট করে এখানে দেওয়া হয়নি, আর পেনাল কোডে যেসব সুরক্ষা রয়েছে, সেগুলো আমরা যে খসড়াগুলো দেখেছি, সেখানে এখানো আসেনি।
এ আইন সম্পর্কে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা যেভাবে আছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তা সেভাবে থাকছে না। বাক্স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য যেসব ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ দরকার, সেগুলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ছাড়াও সম্প্রচার আইনেও থাকবে।
এ ব্যাপারে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলক বলেন, ‘সাইবার জগৎটাকে নিরাপদ রাখার জন্য আমরা একদিকে যে রকম সব অপরাধীকেও আইনের আওতায় আনতে চাই, অন্যদিকে নিরপরাধ কোনো ব্যক্তি যেন কোনোভাবে হয়রানির শিকার না হন, সেটাকে নিশ্চিত করার জন্যই সব প্রচেষ্টা আমরা চালাচ্ছি।’
খসড়া চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে বৈঠকে উপস্থিত তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সাংবাদিকদের বলেন, ১৬ কোটি নাগরিকের নিরাপত্তার জন্য ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ করা হচ্ছে। সুতরাং, এখানে সাংবাদিক বলে আলাদা কিছু নেই। সম্প্রচার আইন যখন আসবে, তখন সাংবাদিক তথা গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হবে।
উল্লেখ্য, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং এ-সংক্রান্ত অপরাধের শাস্তির বিষয়ে নতুন আইন প্রণয়নের কাজ শুরু হয় ২০১৫ সালে। প্রথমে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০১৫’ নাম দেওয়া হলেও পরে এটিকে ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন, ২০১৬’ নাম দেওয়া হয়। আইনটি মন্ত্রিসভায় উত্থাপন হলে, নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে পর্যালোচনার জন্য এটিকে আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটির কাছে পাঠানো হয়। কমিটি ২৯ নভেম্বর খসড়াটি চূড়ান্ত করে।

Disconnect