ফনেটিক ইউনিজয়
কেন্দ্রীয়ভাবে চালু হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা
এম ডি হোসাইন

অবশেষে মেডিকেলের মতোই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা চালু করছে সরকার। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য এক শহর থেকে আরেক শহর, এক প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবেন ভর্তি-ইচ্ছুক পরীক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকেরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদ্ধতি চালু করা হবে। ধারাবাহিকভাবে সাধারণ, ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এই পদ্ধতির আওতায় আনা হবে বলেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে। যদিও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের এমন সিদ্ধান্তের ঘোরতর বিরোধী। এ বছরের চলমান ভর্তি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনায় বসা হবে। সেখান থেকেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে। তবে এরই মধ্যে আলাদাভাবে সব কটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, তারা একটি মাত্র ভর্তি পরীক্ষার পক্ষে। ফলে ২০১৮-১৯ সালে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি মাত্র ভর্তি পরীক্ষা হবে বলে কমিশনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। কমিশন সূত্রে আরও জানা গেছে, দেশের প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। যদিও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সব প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো কমিশনকে তাদের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেনি। তবে প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিগগিরই একটি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কয়েক বছর ধরেই কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের দাবি তুলেছেন অনেকে। ২০১০ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা সমন্বিতভাবে নেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়। কিন্তু বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তীব্র বিরোধিতার কারণে শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য ও রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একত্রে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের সঙ্গে একান্ত বৈঠকেও রাষ্ট্রপতি (আচার্য) তাঁদের এই আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে এবার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদনে (২০১৬) সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার সুপারিশ করা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধের বিশেষ নজরদারির কথাও বলা হয় প্রতিবেদনে। সুপারিশে বলা হয়, সারা দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা চালু করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রাথমিকভাবে মেডিকেলে ভর্তির অনুরূপ বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে।
এ বিষয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, ‘গুচ্ছ পদ্ধতি না থাকায় ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হয় শিক্ষার্থীরা। তাদের কষ্ট লাঘবে অনেক আগে থেকেই গুচ্ছ পদ্ধতির কথা বলে আসছি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই ভালো কথাটি কানে তুলছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘গুচ্ছভিত্তিক ভর্তির ব্যাপারে আমরা সব সময় প্রস্তুত। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিলে আমরা বাস্তবায়ন করতে প্রস্তুত।’
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের মধ্যে এক অভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি নিতে সম্মত হয়েছে। আশা করি, আগামী ভর্তি মৌসুমে এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে কমন অনুষদগুলোর গুচ্ছভর্তি চালু করা জন্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় পৃথক করে ভর্তির জন্য সুপারিশ ছিল ইউজিসির। এ বিষয়ে আবদুল মান্নান জানান, ব্যবসা অনুষদে ভর্তির বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. মীজানুর রহমান ইতিবাচক মত দিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ধীরে ধীরে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছভর্তির প্রক্রিয়ার মধ্যে আনা হবে।
গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি বাস্তবায়নে ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান বাধা ছিল। বিভিন্ন কারণে এবার তারা একমত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় জোর করে কিছু চাপিয়ে দিতে পারে না। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’ আগামী মাসে ভিসিদের সঙ্গে  বৈঠকে কেন্দ্রীয়ভাবে ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জানা যায়, ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষেও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিতে একটি কেন্দ্রীয় পরীক্ষার মাধ্যমে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু এ প্রক্রিয়া আর এগোতে পারেনি। এতে মত দেননি কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি সূত্রমতে, ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। পরীক্ষার আয়ের যে অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডে জমা দেওয়ার কথা, সেটিও দেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে অনেক সময় একটি আসনের জন্য শতাধিক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রতিযোগিতায় টিকতে শিক্ষার্থীরা কোচিংয়ে ভর্তি হন। কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে পরীক্ষার আয়োজন করা হলে একটি আসনের জন্য প্রতিযোগীর সংখ্যা পাঁচ-ছয়জনে নেমে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।

Disconnect