ফনেটিক ইউনিজয়
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
নিরাপত্তাঝুঁকি ও আর্থিক দায় জনগণের কাঁধে
মারুফ আহমেদ

বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্বপ্ন স্বাধীনতারও আগে থেকে। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান আমলে ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পাবনার রূপপুরে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালে প্রকল্পটি করাচিতে স্থানান্তর করে নিয়ে যায় তখনকার পাকিস্তানি সরকার। অর্ধশতকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশ সরকার একই স্থানে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে বিশ্বপ্রযুক্তিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন জ্বালানি এগিয়ে আসছে দ্রুতগতিতে। ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলো কয়লার পাশাপাশি পারমাণবিক বিদ্যুৎও বর্জনের পথে হাঁটছে। পারমাণবিক বিদ্যুতের নতুন কোনো প্রকল্প তারা গ্রহণ করছে না।
এ অবস্থায় বাংলাদেশে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আর্থিক উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন এবং পরিবেশ ও মানবজীবনের ওপর এর সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়গুলোয় গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, পাকিস্তান আমলে যে পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল, সেই পরিবেশ এখন আর নেই। কেন্দ্রটি স্থানীয় পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সাশ্রয়ী বিদ্যুৎও পাওয়া যাবে না। বরং বড় ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে বড় ঝুঁকি মাথায় চেপে বসছে জনগণের।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্তত ৩০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ ধরে নিরাপত্তা অঞ্চল নির্ধারণ করা হয়। নিরাপত্তা অঞ্চলে সাধারণ স্থাপনা নির্মাণ করা যায় না। কিন্তু রূপপুর কেন্দ্রটির নিরাপত্তা অঞ্চলের ভেতরে পড়েছে পাবনা জেলার বেশির ভাগ অঞ্চল, কুষ্টিয়া জেলার একাংশ এবং নাটোর জেলার একাংশ। এই এলাকার জনসংখ্যা ৩০ লাখের বেশি। পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যেই পড়ে ঈশ্বরদী শহর। এমনকি রূপপুরের একেবারে লাগোয়া লালন শাহ সেতু এবং ইপিজেড রয়েছে। দেশের লিচু উৎপাদনের, সবজি উৎপাদনের একটা বড় অংশ আসে এই অঞ্চল থেকে। এ রকম জনবহুল এবং প্রাণচঞ্চল এলাকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিশ্চিতভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা জানান, রূপপুরে দৈনিক ৪৫৫ হাজার জিপিএম পানির প্রয়োজন হবে। আর গত ১২ বছরে পদ্মার পানির প্রবাহের গড় হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ১৫৫ হাজার জিপিএম পানি নদী থেকে নেওয়া যাবে। গত বছর পানিপ্রবাহ কমেছিল এবং এটি আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সে ক্ষেত্রে মজুত করে পদ্মার পানি ধরে রাখতে চাইলে তা পদ্মার প্রবাহ কমিয়ে দেবে। আর ওই অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ইতিমধ্যেই নেমে গেছে। ফলে সেই পানি ব্যবহারেরও সুযোগ নেই। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুলিং টাওয়ার করে পানির সমস্যা দূর এবং নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে। কিন্তু কুলিং টাওয়ারের ফিড ওয়াটারে তেজস্ক্রিয় পদার্থ কী পরিমাণ থাকবে, তা নিয়ন্ত্রণ করার উপায় আছে কি না তা পরিষ্কার করে বলতে পারছেন না কেউই।
২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ভিভিইআর-১০০০ প্রযুক্তির পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লি স্থাপন করা হবে। প্রথম ইউনিটটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এবং দ্বিতীয় ইউনিটটি ২০২৫ সালের জুনে উৎপাদন শুরু করবে বলে জানানো হয়েছে। কেন্দ্রটির জীবনসীমা ৫০ বছর। তবে ৮০ বছর পর্যন্ত বর্ধনযোগ্য।
দুটি পর্যায়ে রূপপুর কেন্দ্রটি নির্মিত হবে। প্রথম পর্যায়ের প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৮৭ কোটি ৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা (৬১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার প্রায়)। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ১ হাজার ৮৭ কোটি ৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা। রাশিয়া ঋণ হিসেবে দিয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা। মূল পর্যায়ে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হয় ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর। এ প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকার দিবে ২২ হাজার ৫২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। বাকি ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেবে রাশিয়া। সব মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ১১ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে রাশিয়া। ঋণকৃত অর্থের বিপরীতে সুদের হার ১ দশমিক ৭৫ শতাংশের বেশি এবং ৪ শতাংশের বেশি নয়। রেয়াতকালীন ১০ বছরসহ ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশ সময় পাবে ৩০ বছর।
সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে স্বপ্ন দেখিয়ে প্রকল্পটি সরকার গ্রহণ করেছিল, তাও এখন সুদূর পরাহত। বিপুল খরচের কারণে দেশের সবচেয়ে বড় আর্থিক প্রকল্পটি সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ আর সরবরাহ করতে পারবে না। শুরুর দিকে এতে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম দেড় টাকার মতো পড়বে বলে জানানো হলেও গত বছর প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি কর্মসূচি সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ জানান, প্রতি ইউনিটের উৎপাদন খরচ পড়বে সাড়ে ৩ টাকা। কিন্তু প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, এ দাম অন্তত ৭ টাকায় পৌঁছাবে। অথচ দেশে বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ৬ টাকার বেশি নয়।
এ বিষয়ে হিসাব কষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, চুক্তির মধ্যেই রূপপুর প্রকল্পের খরচ দফায় দফায় বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই সব মিলিয়ে ৮৫ হাজার কোটি টাকায় এর নির্মাণ শেষ করা কথা থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। ইতিমধ্যে মূল পর্যায়ের কাজের জন্যই ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা বাজেট করা হয়েছে। আবার রূপপুরে ভারী যন্ত্রপাতি পরিবহনে নৌপথ তৈরিতে ড্রেজিংয়ের জন্য অনুমোদন পেয়েছে ৯৫৬ কোটি টাকার প্রকল্প। তিনি বলেন, নির্মাণ খরচ, জ্বালানির খরচ, রক্ষণাবেক্ষণসহ নানা খরচ যোগ করলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে সাড়ে ৭ থেকে ৮ টাকা। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা শেষ হয়ে যাওয়ার পর তাকে ডিকমিশনিং করতে হয়, তারও খরচ আছে। রূপপুর প্রকল্পে এই ব্যয় ধরা হয়নি। এটি হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম আরও বাড়বে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ সম্পর্কে এর প্রকল্প পরিচালক বলেন, কেন্দ্রটি নির্মাণে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এতে ব্যবহৃতব্য জেনারেশন-৩ প্লাস ভিভিইআর চুল্লি পাঁচ স্তরের নিরাপত্তাবেষ্টনী সংবলিত। চুল্লি চালু থাকা অবস্থায় কোনো সমস্যা দেখা দিলে এটি স্বয়ক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। এ ছাড়া কোনো কারণে রিঅ্যাক্টর কোর গলে গেলে তা চুল্লির নিচে অবস্থিত কোর ক্যাচারে আটকে যাবে। তাই যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে রিঅ্যাক্টর কোর বিপর্যয়ের আশঙ্কা নেই বললেই চলে। এ ধরনের চুল্লির কোর বিপর্যয়ের সম্ভাব্য হার প্রতি ৩০ লাখ বছরে একবার। আর্থিক খরচ সম্পর্কে তিনি বলেন, এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা আমাদের আগে ছিল না। তাই শুরুর দিকের প্রাক্কলন থেকে খরচ বেড়েছে। এরপরও এ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের চেয়ে কম পড়বে।
তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে এবং এ-সংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদনে অস্বচ্ছতার বিষয়ে দেশের নাগরিক সমাজ বারবার উদ্বেগ জানালেও তা অগ্রাহ্য করে সরকার রূপপুরে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে। কোনো রকম জনমত যাচাই না করে সরকার এ প্রকল্পের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও স্থান নির্বাচন এবং চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। স্বাক্ষরিত চুক্তি এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। এত বড় ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্প এভাবে বাস্তবায়ন হতে পারে না। বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আশীর্বাদের পরিবর্তে অভিশাপ হয়ে উঠতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ১৩ মে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও রাশিয়ার স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি করপোরেশনের (রোসাটোম) মধ্যে ‘পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার’ বিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর কেন্দ্র স্থাপনের (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর আনুষ্ঠানিকভাবে স্থাপন এবং ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর এটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট এবং পরমাণু শক্তি কমিশনের মধ্যে সাধারণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৭ সালে ভারতের ‘গ্লোবাল সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার এনার্জি পার্টনারশিপকে (জিসিএনইপি) রূপপুর প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগ দেয় সরকার। গত ৩০ নভেম্বর কেন্দ্রটির প্রথম চুল্লির ঢালাইকাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে ৩২তম দেশ হিসেবে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ।

Disconnect