ফনেটিক ইউনিজয়
বি শে ষ প্র তি বে দ ন পর্ব-০৩
অনিয়ম দুর্নীতির বেপরোয়া বিস্তার
ইমদাদ হক

একাত্তরের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির এগিয়ে চলা শুরু মূলত আশির দশক থেকে। নব্বইয়ের দশকে তা গতি পায় শিল্পে ভর করে। বাড়তে থাকে আর্থিক কর্মকাণ্ড, বাড়তে থাকে ব্যাংকিং কার্যক্রমও। গেল দুই যুগে অর্থনীতির আকার বেড়েছে আরও। বেড়েছে ব্যাংকের সংখ্যা। সবশেষ তথ্যমতে, দেশে তফসিলভুক্ত ব্যাংকের সংখ্যা ৫৭। আরও তিনটি ব্যাংক বাজারে আসার গুঞ্জনও চলছে জোরেশোরেই। দেশের ব্যাংকিং খাতের হালহকিকত নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন

নিয়মনীতির তোয়াক্কাই নেই লোকবল নিয়োগ ও ব্যাংক পরিচালনায়। অর্থ আত্মসাৎ, মুদ্রা পাচার, ভুয়া অ্যাকাউন্টে লেনদেন, দুর্নীতির প্রমাণ না রাখতে নথি ধ্বংসÑএসবই এখন দেশের ব্যাংকিং খাতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বেশির ভাগ ব্যাংকেই অনিয়ম, জালিয়াতি আর দুর্নীতির ঘটনায় নেওয়া হয়নি কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। গত কয়েক বছরে সব মিলিয়ে ৪০৫ ধরনের অনিয়ম দেখা গেছে কেবল সোনালী ব্যাংকেই। এমন সব তথ্য জানা গেছে ব্যাংকেটির কেন্দ্রীয় শাখার এক প্রতিবেদনে।
সোনালী ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ওই প্রতিবেদনটি বলছে, দরপত্র ছাড়াই কোর ব্যাংকিং চালুর জন্য ২০১০ সালে এসপিএফটিএল নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয় সোনালী ব্যাংক যুক্তরাজ্য শাখা। কাজ শেষ না করেই প্রতিষ্ঠানটি বাগিয়ে নেয় শূন্য দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার, যা মোট ব্যয়ের ৮৫ শতাংশ। পরে চুক্তি বাতিল হলেও ফেরত আসেনি কোনো অর্থ। লোকবলের প্রশিক্ষণের নামে কেবল ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পেছনেই ব্যয় হয়েছে প্রশিক্ষণের ৫২ শতাংশ। ডেপুটি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নামে পদ সৃষ্টি করা হয়েছে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন ছাড়াই। কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া করা হয়, যা ব্যাংকিং রীতির ঠিক উল্টো। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন লঙ্ঘনের দায়ে ব্যাংকটিকে ৩ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছে যুক্তরাজ্যের ফাইন্যান্সিয়াল কনডাক্ট অথরিটি (এফসিএ)। ব্যাংকটিকে টেনে নিতে অতিরিক্ত ১৭ দশমিক ০৭ মিলিয়ন ডলার মূলধন জোগান দেয় সরকার। তবে তা তছরুপেও কুশলী ছিলেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
সোনালী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘লাগাম টানা হয়েছে সোনালী ব্যাংকের যাবতীয় অনিয়মের। এর সঙ্গে জড়িত কয়েকজন কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আশা করছি, অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়াবে ব্যাংকটি।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) প্রভাষ চন্দ্র মল্লিক ১৫টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৮৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। এর মধ্যে ১১টি ব্যাংকের ৫৩ লাখ ৩৯ হাজার ৫৮৬ টাকা এখন মন্দমানের খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। আরও তিনটি ব্যাংকের ১০ লাখ ১১ হাজার টাকা সন্দেহজনক মানে শ্রেণিকৃত রয়েছে। বাকি ঋণ নিয়মিত রয়েছে। ব্যাংক পরিচালনায় যুক্ত এমন অনেক পদস্থ কর্মকর্তা আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। দুর্নীতির অভিযোগে প্রায়ই দুদকের অভিযানে গ্রেপ্তারও হচ্ছেন ব্যাংকাররা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাদিহির বড় একটা ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। ক্ষুদ্র পরিসরে তো ঘটছেই, বড় পরিসরেও মোটা অঙ্কের আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা সাধারণ গ্রাহকদের মাঝে আতঙ্ক তৈরি করে দিয়েছে। এসব ঘটনায় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও জড়িত, যা নিরাশার বড় কারণ। তাঁরা এখনো প্রতারণামূলক ঋণ বিতরণ করছেন। নানা ফাঁকফোকর খুঁজে কুঋণ বিতরণের ধারা এখনো অব্যাহত আছে। এর লাগাম না টানলে ভবিষ্যতে ভালো খবর পাওয়া দুষ্কর হবে।
শরিয়াহভিত্তিক সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) কোটি কোটি টাকা তছরুপ করার অভিযোগ রয়েছে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মেজর (অব.) ডা. মুহাম্মদ রেজাউল হকের বিরুদ্ধে। রয়েছে ব্যাংকের কয়েকটি শাখার মাধ্যমে ২ হাজার ১৫১ কোটি টাকার ঋণ অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ। ব্যাংকটির প্রিন্সিপাল শাখায় ৫৫০ কোটি, গুলশান শাখায় ৫৭৮ কোটি, বাবুবাজার শাখায় ২২৩ কোটি, খাতুনগঞ্জ শাখায় ১৬৫ কোটি, গাউছিয়া শাখায় ১৪০ কোটি, মাধবদী শাখায় ৫৫ কোটি, আগ্রাবাদ শাখায় ৪৪০ কোটি টাকা ঋণ অনিয়মে চেয়ারম্যান সরাসরি যুক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা চুরি হয়। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্কতার কারণে অল্পের জন্য রক্ষা পায় আরও প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা। রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি ছিল বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং খাতে আলোচিত। প্রায় এক মাস পর ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা ছুটে আসেন বাংলাদেশ ব্যাংকে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের আস্থার সংকট দেখা দেয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান পদত্যাগ করেন। সরকার অব্যাহতি দেয় দুই ডেপুটি গভর্নরকে। এ ঘটনার পর সরকার একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে। তবে চুরি যাওয়া অর্থের একাংশই শুধু উদ্ধার করা গেছে ফিলিপাইন থেকে।
দেশের শেয়ারবাজারে অপ্রত্যাশিত ধস নেমে আসে ২০১০ সালে। এর কিছুদিন পরই আলোচনায় নতুন ঝড় তোলে হলমার্ক কেলেঙ্কারি। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখাসহ একাধিক শাখার মাধ্যমে হলমার্ক নামের অখ্যাত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী হাতিয়ে নেয় প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। ওই ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়ূন কবিরসহ অনেকেই জড়িত ছিলেন এই ঘটনায়। মার্ক গ্রুপের এমডি তানভীর মাহমুদ ও জিএম তুষার আহমেদ এখন কারাগারে রয়েছেন। তবে নির্বিঘ্নে দেশ ছেড়েছেন ব্যাংকটির সেই সময়কার এমডি হুমায়ূন কবিরসহ একাধিক কর্মকর্তা।
বছর চারেক আগে আলোচনায় আসে বিসমিল্লাহ গ্রুপ। পাঁচটি ব্যাংক থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় এই গ্রুপটি। গ্রুপটির এমডি খাজা সোলায়মান চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী এবং গ্রুপের চেয়ারম্যান নওরিন হাবিব ব্যাংক লুটের টাকা দিয়ে বর্তমানে দুবাইয়ে হোটেল ব্যবসা করছেন। এ ঘটনায় গ্রুপের ১৩ জন ও পাঁচটি ব্যাংকের ৪১ জন ব্যাংকারকে আসামি করে ১২টি মামলা করে দুদক। আসামিদের মধ্যে রয়েছেন জনতা ব্যাংকের তিন শাখার ১২ জন, বেসরকারি খাতের প্রাইম ব্যাংকের নয়জন, প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাতজন, যমুনা ব্যাংকের পাঁচজন ও শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের আটজন ব্যাংকার।
কাছাকাছি সময়েই অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে বেসিক ব্যাংকে। ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখা থেকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ঋণ অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণের অভিযোগ ওঠার পর তদন্তে নামে দুদক। ঋণপত্র যাচাই না করে জামানত ছাড়া, জাল দলিলে ভুয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়াসহ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বিধিবহির্ভূতভাবে ঋণ অনুমোদনের অভিযোগ ওঠে ব্যাংকটির তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধান শেষে এ অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনায় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ১২৯ জনকে আসামি করে ৫৬টি মামলা করে দুদক। আসামিদের মধ্যে ২৬ জন ব্যাংক কর্মকর্তা এবং বাকিরা ঋণগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক জরিপ প্রতিষ্ঠানে যুক্ত। ঋণ জালিয়াতি, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় ডজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করেছে বেসিক ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ‘আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। যাচাই-বাছাই না করে বড় ঋণ প্রদানের হারও কমিয়ে আনতে হবে। এ জন্য বড় ধরনের ঋণ না দিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মাঝে ঋণ বিতরণ করতে হবে। ব্যাংকিং কার্যক্রমকে ছড়িয়ে দিতে হবে। এ লক্ষ্যে সব ব্যাংককে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আর, বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িতের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতেও তদারকি বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

Disconnect